ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ধীরে ধীরে বেহাত ওয়াক্ফ জমি

ধীরে ধীরে বেহাত ওয়াক্ফ জমি
×

বগুড়া সার্কিট হাউস এলাকার নবাব এস্টেটের প্রথম ছবিটি বছর দুয়েক আগের। একই জায়গায় এখন ফাঁকা মাঠ সমকাল

লিমন বাসার, উত্তরাঞ্চল

প্রকাশ: ১৫ নভেম্বর ২০২৫ | ০৭:১৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

বগুড়া ও জয়পুরহাটে ওয়াক্ফ এস্টেটের নামে নিবন্ধিত বিপুল সরকারি জমি বেদখল হয়ে গেছে। ওয়াক্ফ প্রশাসনের নীরবতা, রাজনৈতিক ছত্রছায়া আর দুর্বল নজরদারির কারণে জাল দলিল তৈরি, অবৈধ বিক্রি ও দখল থেমে নেই। 
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এ দুই জেলায় এক হাজার ১৮৮টি এস্টেটের মধ্যে অন্তত দুই হাজার একরের বেশি জমি বেহাত হয়ে গেছে। টাকার অঙ্কে যা ২০০ কোটির চেয়ে বেশি। দিনের পর দিন ধরে এ অপতৎপরতা চললেও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষ নির্বিকার।
বগুড়া শহরের সাতমাথার পূর্বদিকে ঐতিহাসিক নওয়াব এস্টেটের বিশাল বাড়িটি এখন নেই। এটি আগেই ভেঙে ফেলা হয়েছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রভাবশালী এক আওয়ামী লীগ নেতা এ জমি কিনে সেখানে হাউজিং প্রকল্প চালুরও প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। যদিও ওয়াক্ফ এস্টেট বলছে, এখনও কাগজে-কলমে জমিটির মালিক তারা।

ওয়াক্ফ আইন অনুযায়ী, দেশের সব ওয়াক্‌ফ সম্পত্তির মালিক সরকার। দেখভালের দায়িত্ব ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অধীন ওয়াক্ফ প্রশাসনের। বৃহত্তর বগুড়া অঞ্চলে মাত্র একজন পরিদর্শক এ বিশাল সম্পদের দেখাশোনা করেন। সরকারি নথি অনুযায়ী, এখানকার প্রায় ৩৫ হাজার একর জমি প্রজাবিলি, বাকি সাত হাজার একর ধর্মীয়, সামাজিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক ওয়াক্ফ।

নবাব এস্টেট বেহাত 
বগুড়া সার্কিট হাউসের পাশের নবাববাড়ি মোড়ে ছিল ১৩০ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী নবাব এস্টেট। প্রায় পৌনে চার একর জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা এই একটি সম্পত্তির দাম শতকোটি টাকারও বেশি। তবে এ সম্পদ ওয়াক্ফের দখলে নেই। ২০১৬ সাল পর্যন্ত ধাপে ধাপে জালিয়াতি করে জায়গাটি বিক্রি করা হয়েছে। পুরো জমিটি এখন প্রভাবশালীর দখলে।

সর্বশেষ জেলা আওয়ামী লীগের অর্থ সম্পাদক মাসুদুর রহমান মিলনের নেতৃত্বে তিন ব্যবসায়ী একসঙ্গে ওই এস্টেটের ১.৫৫ একর জমি কিনে নেন। সেখানে বাণিজ্যিক নগরী গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছিলেন মিলন। পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী সৈয়দ মোহাম্মদ আলী চৌধুরীর প্যালেস ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে গোপনে ভাঙা শুরু হয়। অভিযোগ রয়েছে, জেলা প্রশাসনের ভূমি ও রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তারাও এ জালিয়াতিতে জড়িত।
ইতিহাস গবেষকরা বলছেন, সৈয়দ মোহাম্মদ আলী চৌধুরীর স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহ্যের সাক্ষী নবাব প্যালেস। একদিকে এটি ওয়াক্ফ সম্পত্তি, অন্যদিকে প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বও বহন করে। সে কারণে এ সম্পত্তি হস্তান্তরযোগ্য নয়। 
গত ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগ নেতা মাসুদুর রহমান মিলন আত্মগোপনে চলে যান। সমকাল তাঁর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেও পারিনি। তাঁর আরেক অংশীদার হাজি আব্দুল গফুরও ফোন ধরেননি। তবে গফুরের মেয়ের জামাই শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘নবাব প্যালেসের ভবন ভাঙার পর এখন সেটি ফাঁকা ফেলে রাখা হয়েছে। আমার শ্বশুরসহ তিনজন এ জায়গার বর্তমান মালিক।’

এটি ছাড়াও নবাববাড়ির মোট সম্পত্তির অন্য জায়গার ওপর ক্রেতারা গড়ে তুলেছেন বহুতল ভবন টিএমএসএস মহিলা মার্কেট, শরীফ উদ্দিন সুপারমার্কেট, আল-আমিন কমপ্লেক্স, র‍্যাংগস ভবন, রানার প্লাজাসহ বহুতল বাণিজ্যিক ভবন। 
নথি পর্যালোচনা করে জানা যায়, নবাব ওয়াক্ফ এস্টেটের জন্ম ১৮৯০ সালে। ইসি ৩৬৭৫, ইসি ৩৬৭৫(এ) ও ইসি ৩৬৭৫(বি) এই তিন দলিলের মাধ্যমে কলকাতায় প্রথম তালিকাভুক্ত হয় এস্টেটটি। বাংলাদেশে আজও এ তালিকাভুক্তি বহাল আছে। বর্তমান মোতাওয়াল্লি সৈয়দ রায়হান হাসান আলী চৌধুরী ১৯৯৯ সাল থেকে এস্টেটটির দায়িত্বে থাকলেও বাস্তবে এস্টেটের কোনো জমিই এখন তাদের দখলে নেই। আর সর্বশেষ জমিটি বিক্রির মাধ্যমে এ রাজ্যর পতন ঘটে। বগুড়া ওয়াক্ফ পরিদর্শক কার্যালয়ের ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন, স্থানীয় ভূমি অফিসের সাবেক মোতাওয়াল্লি হুমায়ুন কবিরের বিরুদ্ধে দায়ের করা একটি গোপন প্রতিবেদনের কপি ও ওয়াক্ফ অফিসের পরিদর্শন প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য মিলেছে। 

দখলদার কারা
এরুলিয়ায় পীর আজিজুল্লাহ (রহ.) মাজার ওয়াক্ফ এস্টেটে শুধু মাজার ছাড়া তিনটি পুকুরসহ প্রায় ১৭ বিঘা জমি বেদখল হয়ে গেছে। স্থানীয় বিএনপি নেতা ঝন্টু মিয়া, ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন, আবদুল গনি, আবদুল গফুর, আকবর, জোব্বার, আমেনা খাতুন, আতাহার হোসেন, আলমগীর হোসেন ও আবদুল মনি দীর্ঘদিন ধরে সম্পত্তি দখলে রেখেছেন। ওয়াক্ফ পরিদর্শন প্রতিবেদন বলছে, এসব জমিতে গড়ে তোলা হয়েছে গ্যারেজ, দোকান ও ঘরবাড়ি। অভিযোগের বিষয়ে শহর বিএনপির কার্যকরী সদস্য ঝন্টু মিয়া বলেন, ‘এসব জমি একাধিকবার কেনাবেচা হয়ে গেছে। অন্যরা বিক্রি করেছে, তাই আমিও করেছি।’ ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘অনেকেই এসব জমি কিনে কাগজপত্র করে বাস করছে। তাই আমিও কিনেছি।’
দুপচাঁচিয়ার হিরঞ্জায়  দমশের তালুকদার ওয়াক্ফ এস্টেটের ৬৩ একর আয়তনের মধ্যে অন্তত ২৬ একর জমি বেদখল হয়েছে। দখল করেছেন স্থানীয় বিএনপি কর্মী ফারুক হোসেন এবং আওয়ামী লীগ নেতা শাহীন আলমের ভাই জাহাঙ্গীর আলম। অভিযোগ রয়েছে, এস্টেটের সাবেক মোতাওয়াল্লি বিনসেন তালুকদার নিজেই একাধিক দাতা সেজে জমি বিক্রির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ফারুক হোসেন ও শাহীন আলমের বক্তব্য নিতে তাদের খোঁজে গেলে বাড়ি  তালাবদ্ধ পাওয়া যায়। দখলকারীদের একজন সাবেক মোতাওয়াল্লি বিনসেন তালুকদারের ছেলে সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘আমার দখলে তিন বিঘা আছে। অন্যরা বাকি জমি নিজেদের দখলে রেখেছে।’

গাবতলীর গোড়াদহ ছমির উদ্দিন সরকার ওয়াক্ফ এস্টেটে ৬১ একরের সম্পত্তির মধ্যে ৪৫ একর দখলে করেছেন একাধিক ব্যক্তি। এর মধ্যে আলোচিত নাম উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি আশরাফুল হক জুয়েল। আরেক দখলদার সাহেব আলী। তিনি দখলি জমির ওপর একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুল চালু করেছেন। সূত্র জানায়, সাবেক মোতাওয়াল্লি ইউসুফ আলী নিজের মেয়ের নামে জমি রেজিস্ট্রি করে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। গাবতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার ২০২৩ সালের একটি তদন্ত প্রতিবেদন উঠে আসে এ তথ্য। আওয়ামী লীগ নেতা আশরাফুল হক জুয়েলের বাড়ি তালাবদ্ধ পেয়েছে সমকাল। তার নিকটাত্মীয় হাবিবুল হক বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আদালতে মামলা চলছে। আমরা বৈধ মালিকানা চেয়ে আবেদন করেছি।’ 
জয়পুরহাটের আক্কেলপুর মুকিমপুরে চৌধুরী ওয়াক্ফ এস্টেট অন্তত ৩২ বিঘা জমি বেদখল হয়ে গেছে। দখলে ছিলেন জেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম মিন্টু। তিনি সম্প্রতি মারা গেছেন। দখলদার আরও রয়েছেন আওয়ামী লীগপন্থি ইউপি সদস্য আমিরুল ইসলাম রাজু। অভিযোগ রয়েছে, ভূমি অফিসের একাধিক কর্মকর্তা তাদের জাল খতিয়ান তৈরিতে সহায়তা করেছেন। জয়পুরহাট ওয়াক্ফ পরিদর্শন প্রতিবেদন (২০২৩) ও আক্কেলপুর ভূমি অফিসের রেজিস্টার থেকে এ তথ্য মিলেছে। রফিকুল ইসলাম মিন্টুর মেয়ে তনিয়ারা বেগম বলেন, ‘ওয়াক্ফ জমি নিয়ে মাঝে মধ্যে দেনদরবার দেখেছি। অনেকের সঙ্গে আমার বাবার ঝামেলা হতো। সর্বশেষ কী অবস্থা, সেটি বলতে পারছি না।’

ওয়াক্ফ অফিস সূত্র বলছে, দখলদারদের সঙ্গে একশ্রেণির কর্মকর্তার সখ্য রয়েছে। তারা জানান, কীভাবে আইনের ফাঁক গলে জমি হাতানো যায়। অনেক সময় মোতাওয়াল্লিরাই জমি বিক্রি করে, আবার নিজেরাই দখল করেন। মামলা হলেও 
নিষ্পত্তি হয় না বরং অনেকে আবার উল্টো ওয়ারিশ দাবিদার হয়ে যায়।
আর ওয়াক্ফ এস্টেটের আয়ের ৫% রাজস্ব সরকারকে দেওয়ার কথা। কিন্তু দুই জেলায় কয়েক কোটি টাকা রাজস্ব বকেয়া রয়েছে। নোটিশ পাঠালেও অধিকাংশ মোতাওয়াল্লি তা আমলে নেন না। মামলা হলেও পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকে না। 
বৃহত্তর বগুড়া জেলা (বগুড়া-জয়পুরহাট) ওয়াক্ফ পরিদর্শক নুরুজ্জামান বলেন, নবাব এস্টেটের এনরোলমেন্ট (তালিকাভুক্তি) এখনও চালু আছে। প্রতিবছর চাঁদার টাকাও জমা হচ্ছে সরকারি কোষাগারে। এ ছাড়া ওয়াক্‌ফ নথিতে নবাবদের জমি-ঘরবাড়ির বিবরণ নথিভুক্ত রয়েছে। এতেই প্রমাণ হয়, সম্পত্তিগুলো ওয়াক্ফ। তিনি স্বীকার করেন, বিভিন্ন স্থানে সম্পত্তি বেদখল হলেও তাদের করার কিছুই থাকছে না।
সুশাসনের জন্য প্রচারাভিযান (সুপ্র) জেলা সম্পাদক কে জি এম ফারুক বলেন, ওয়াক্ফ প্রশাসনের দুর্বলতা, দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থাপনা এবং নজরদারির অভাবে এসব সম্পদ ঝুঁকিতে রয়েছে। এখনই পদক্ষেপ না নিলে ওয়াক্ফ নামে সম্পত্তিই আর থাকবে না। 

আরও পড়ুন

×