জুলাই হত্যায় শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড
ওয়াকিল আহমেদ হিরন
প্রকাশ: ১৮ নভেম্বর ২০২৫ | ০৮:১২
| প্রিন্ট সংস্করণ
পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গতকাল সোমবার এক রায়ে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। একই মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়। অপর আসামি মামলার রাজসাক্ষী পুলিশের সাবেক আইজি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ হিসেবে দায় প্রমাণিত হওয়ায় শেখ হাসিনাকে এই সাজা দেওয়া হয় বলে ট্রাইব্যুনাল রায়ে জানান।
বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ আসামিদের দোষী সাব্যস্ত করে এ রায় দেন। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
সাজার পাশাপাশি হাসিনা ও আসাদুজ্জামান কামালের দেশে থাকা সব সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। দুই আসামিই বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। অপর আসামি আবদুল্লাহ আল-মামুন রায় ঘোষণার সময় ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত ছিলেন। ৪৫৩ পৃষ্ঠার রায়ে ছয়টি অংশ ছিল। রায় ঘোষণার কার্যক্রম ট্রাইব্যুনাল থেকে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।
রায়ে যা বলা হয়
ট্রাইব্যুনাল রায়ে বলেন, আমরা ঐকমত্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত দিচ্ছি, আসামিরা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় নির্বিচারে ও নৃশংসভাবে মানুষ হত্যা করে যে ঘৃণিত অপরাধ করেছে, তাতে তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি না দিলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে না।
রায়ে বলা হয়, ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের ২০ (৩) ধারা অনুযায়ী, প্রচলিত রেওয়াজ মাফিক রায় কার্যকর করা হবে। দেশের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, বেসামরিক আদালতের রায়ে আসামিকে আমৃত্যু ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
ট্রাইব্যুনাল জানান, এই রায়ের বিরুদ্ধে আসামিরা আপিল করার সুযোগ পাবেন। তবে পলাতক থাকায় আপিল করতে চাইলে তাদের আত্মসমর্পণ করে এক মাসের মধ্যে আপিল করতে হবে। রায়টিকে ঐতিহাসিক অভিহিত করে জনগণকে শান্ত, সংযত ও দায়িত্বশীল থাকার আহ্বান জানিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।
টানা ১৫ বছর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশ শাসন করা শেখ হাসিনা গত বছর ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। দেশে রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালনকারীদের মধ্যে শেখ হাসিনাই প্রথম মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত হলেন। এর আগে (২ জুলাই) ট্রাইাব্যুনাল আদালত অবমাননার দায়ে তাঁকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দিয়েছিলেন।
এই মামলার আসামি সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন দোষ স্বীকার করে রাজসাক্ষী হলেও অপরাধের গভীরতা বিবেচনা করে তাঁকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রায় ঘোষণার সময় ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত থাকলেও তিনি কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি।
পাঁচ অভিযোগে বিচার ও রায়
গত ১০ জুলাই সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটিসহ পাঁচটি অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে মামলার বিচার শুরু হয়। অভিযোগগুলো হলো–
১. উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে ছাত্র-জনতাকে হত্যায় প্ররোচনা, সহায়তা, সম্পৃক্ততা, অপরাধ সংঘটন প্রতিরোধে ব্যর্থতা। ট্রাইব্যুনাল এর জন্য শেখ হাসিনাকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন।
২. হেলিকপ্টার, ড্রোন ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের হত্যার ঘটনায় সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি প্রমাণিত হয় বলে জানান ট্রাইব্যুনাল।
৩. রংপুরে শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
৪. চানখাঁরপুলে ছয় হত্যা এবং
৫. আশুলিয়ায় ছয়জনকে হত্যা ও লাশ পোড়ানো।
এর মধ্যে ২, ৪ ও ৫ নম্বর অভিযোগে শেখ হাসিনাকে সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটির দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। চানখাঁরপুলে ছয় হত্যা এবং আশুলিয়ায় ছয়জনকে হত্যা ও লাশ পোড়ানোর ঘটনায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং সাবেক আইজিপি আবদুল্লাহ আল-মামুনকে দোষী সাব্যস্ত করেছেন ট্রাইব্যুনাল। তাদের মধ্যে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অপরাধ এক হওয়ায় সাবেক আইজিপি মামুনের সাজাও মৃত্যুদণ্ড। তবে রাজসাক্ষী হিসেবে তথ্য দিয়ে অপরাধ প্রমাণে সহযোগিতা করায় তাঁকে লঘুদণ্ড হিসেবে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল।
শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে সর্বোচ্চ সাজা দেওয়ার পাশাপাশি দেশে তাদের সম্পদ রাষ্ট্রের অনুকূলে জব্দের নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। পাশাপাশি জুলাই আন্দোলনে নিহতদের পরিবার এবং আহতদের জন্য ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয়।
ট্রাইব্যুনালের চিত্র
গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টায় ট্রাইব্যুনাল-১ বসেন। অন্য দুটি মামলার শুনানি পেছানোর পর চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম মামলার রায় সরাসরি সম্প্রচার করতে অনুমতি চাইলে ট্রাইব্যুনাল তা মঞ্জুর করেন। এর পর চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদার বলেন, রায়টি ৪৫৩ পৃষ্ঠার। ১২টা ৪৫ মিনিট থেকে পড়া শুরু হয়।
প্রথমে ট্রাইব্যুনালের তৃতীয় সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী এবং দ্বিতীয় সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ রায়ের দুটি অংশ পড়ে শোনান। সবশেষে ২টা ৫০ মিনিটে আসামিদের সাজার বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত রায় জানান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার।
এজলাস কক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল, চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামসহ প্রসিকিউটর, অন্যান্য আইন কর্মকর্তা, জুলাই শহীদ পরিবারের স্বজন, দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমের কর্মীরা উপস্থিতি ছিলেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোরও নজর ছিল গতকালের এই রায়ের দিকে।
শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করলে এজলাসে উপস্থিত স্বজনের কয়েকজন হাততালি দেন। এ সময় অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান সবাইকে ট্রাইব্যুনালের সুষ্ঠু পরিবেশ বজার রাখার অনুরোধ করেন।
চিফ প্রসিকিউটরের প্রতিক্রিয়া
রায়ের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, এই রায় দৃষ্টান্তমূলক। রায় প্রমাণ করেছে– অপরাধী যত বড় হোক, যত ক্ষমতাশালী হোক সে আইনের ঊর্ধ্বে নয়। বাংলাদেশ এমন একটি রাষ্ট্র যেখানে যত বড় অপরাধীই হোক, অপরাধের জন্য তাকে জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে এবং তার প্রাপ্য শাস্তি পেতে হবে। তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি, এই রায়টি অতীতের কোনো ধরনের (ঘটনার) প্রতিশোধ নয়। এটি হচ্ছে জাতির প্রতিজ্ঞা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন।’
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে এ মামলার বাদী চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। তিনি এই ট্রাইব্যুনালে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের আইনজীবী ছিলেন। ট্রাইব্যুনালে শীর্ষ সাত নেতার মুত্যৃদণ্ডসহ বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়। এর মধ্যে পাঁচজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে আওয়ামী লীগ সরকার।
অ্যাটর্নি জেনারেলের প্রতিক্রিয়া
রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, জুলাই-আগস্ট শহীদদের প্রতি, দেশ ও মানুষের প্রতি, গণতন্ত্র ও সংবিধানের প্রতি এবং আইনের শাসন ও আগামী প্রজন্মের প্রতি দায়বদ্ধতা পরিশোধের স্বার্থে এটি যুগান্তকারী রায়। এ রায় প্রশান্তি আনবে, ভবিষ্যতের প্রতি একটা বার্তা দেবে, দেশে ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনের মাইলফলক হয়ে থাকবে।’
আসামিদের জন্য সরকার নিযুক্ত আইনজীবীর প্রতিক্রিয়া
শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান কামালের পক্ষে রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী ছিলেন আমির হোসেন। তিনি বলেন, ‘রায়ে আমি ব্যক্তিগতভাবে কষ্ট পেয়েছি। রায়টা আমার পক্ষে যায়নি, বিপক্ষে গেছে। এ জন্য আমি ক্ষুব্ধ।’
বিচার যেভাবে শুরু
গত বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করতে আন্তর্জতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। ১৪ আগস্ট শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়। পরোয়ানা জারি হয় ১৭ অক্টোবর। চলতি বছরের ১৬ মার্চ আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয় সাবেক আইজিপি চৌধুরী মামুনকে। ১২ মে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামালকে অন্তর্ভুক্ত করে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়। ১ জুন অভিযোগ দাখিল এবং ১০ জুলাই অভিযোগ গঠন হয়। সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয় ৩ আগস্ট। ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ৫৪ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়। ১২ অক্টোবর থেকে যুক্তিতর্ক শুরু হয়ে ২৩ অক্টোবর শেষ হয়। ১৩ নভেম্বর ট্রাইব্যুনাল জানান, রায় ঘোষণা হবে ১৭ নভেম্বর।
জুলাই হত্যাকাণ্ডের প্রথম মামলার রায় হলো গতকাল। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আরও চারটি মামলা এই ট্রাইব্যুনালে তদন্তাধীন। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন আদালত তাঁর বিরুদ্ধে ৫৮৬টি মামলা আছে।
নিরাপত্তা
রায় ঘোষণা উপলক্ষে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সামাজিক মাধ্যমে গত দুদিন সারাদেশে শাটডাউন কর্মসূচির ডাক দেয়। ফলে গতকাল সকাল থেকে রাজধানীতে সেনা, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও আনসারের সমন্বয়ে কঠোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়। পুরোনো হাইকোর্ট এলাকায় স্থাপিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এলাকা ঘিরে ছিল নিরাপত্তাবলয়। আইনজীবীদের পাশাপাশি জুলাই অভ্যুত্থানে আহত এবং নিহতদের পরিবারের অনেক সদস্য রায় শুনতে ট্রাইব্যুনালে এসেছিলেন।
- বিষয় :
- হাসিনার পতন
- বিচার ব্যবস্থা
