ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

প্রকৃতি

ঝোপাল চালতার কথা

ঝোপাল চালতার কথা
×

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ঝোপাল চালতার ফুল। ছবি: মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান

চয়ন বিকাশ ভদ্র

প্রকাশ: ২৪ নভেম্বর ২০২৫ | ১১:২২ | আপডেট: ২৪ নভেম্বর ২০২৫ | ১১:৩০

ময়মনসিংহে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রায় ২৪ একর জায়গাজুড়ে বোটানিক্যাল গার্ডেন। বিরল প্রজাতির উদ্ভিদের সংগ্রহ নিয়ে ১৯৬৩ সালে এটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। পুষ্প, বৃক্ষ, লতা ও গুল্মে সমৃদ্ধ এই বাগান। গত মে মাসে সেখানে গিয়েছিলাম। খুব গরম পড়েছিল সেদিন। তারপরও নতুন কোনো উদ্ভিদের সন্ধান পাই কিনা, কোনো উদ্ভিদে ফুল ফুটল কিনা, তা দেখার কৌতূহলের কারণে যাওয়া। 

বাগানের বিভিন্ন পথ দিয়ে হাঁটছিলাম আর দুপাশের উদ্ভিদ দেখছিলাম। এর মাঝেই বাম দিকের মাঠে চোখে পড়ল একসারিতে লাগানো ছোট ঝোপাল গাছ। পাতা চালতার মতো। ফুল বড়; পেয়ালা আকৃতির। পাপড়ি  হলুদ, পাঁচটি। এটাই ঝোপাল চালতা। এই উদ্ভিদ ইংরেজিতে শ্রাবি ডিলেনিয়া, সিম্পোহ, ইয়েলো সিম্পোহ ইত্যাদি নামে পরিচিত। এই উদ্ভিদের বৈজ্ঞানিক নাম Dillenia Suffruticosa, এটি Dilleniaceae পরিবারের গুল্ম বা মাঝারি আকৃতির বৃক্ষ। প্রজাতিক পদ সাফ্রুটিকোসা  লাতিন শব্দ। সাফু  অর্থ  আংশিক এবং ফ্রুটিকোসা  অর্থ ঝোপজাতীয়। 

গাছটির আদি নিবাস মালয়েশিয়া, বোর্নিও, সুমাত্রা, ফিলিপাইন। উদ্ভিদ  চিরসবুজ, ১০ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। বাঁধাকপির পাতার মতো এর পাতা দাঁতের মতো খাঁজ কাটা। কচিপাতা লালচে রংয়ের হয়। ফুল দৈর্ঘ্যে  ৪০-৫০ মিলিমিটার এবং প্রস্থ  ২৫-৩০ মিলিমিটার। ফুলগুলো অত্যন্ত সুগন্ধযুক্ত এবং প্রজাপতি ও হামিংবার্ডদের আকর্ষণ করে। ফলের স্বাদ মিষ্টি, টক এবং এটি ভোজ্য। রসালো বৃতি গর্ভাশয়কে ঘিরে ফলে পরিণত করে।

উদ্ভিদের পাতা খাবার মোড়ানোর জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। পাখিরা বাসা তৈরি করতে এগুলো  ব্যবহার করে। এর ফলের মণ্ড ব্রুনেইয়ে চুল ধোয়ার জন্য ব্যবহার করা হয়। রক্তক্ষরণ বন্ধ ও ক্ষত শুকানোতেও এই গাছের ব্যবহার রয়েছে। শুকনো পাতায় সিলিকা থাকায় শিরীষ কাগজ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। 

গাছটিতে ৩-৪ বছর বয়স পর্যন্ত ফুল ও ফল ধরে, প্রতি গাছে ১৫০টি পর্যন্ত ফল ধরে। পাকা ফল খাওয়ার অনেক উপকারিতা রয়েছে। এটি খেলে  হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি হ্রাস পায় এবং শরীর পায় ফাইবার ও খনিজ পদার্থ। এটি ভিটামিন সি, ফসফরাস, ক্যালসিয়াম এবং শরীরের সঠিক কার্যকারিতার জন্য অন্যান্য প্রয়োজনীয় খনিজের একটি ভালো উৎস।

মজার বিষয় হলো, রাত ৩টায় এর ফুল ফোটা শুরু হয়, আর সূর্যোদয়ের এক ঘণ্টা আগে পুরোপুরি প্রস্ফুটিত হয়। পরাগায়নের পর বিকেল ৪টার মধ্যে পাপড়িগুলো ঝরে যায়। রাতের মধ্যেই বৃন্তাংশগুলো ক্ষুদ্র ফলকে (যা দেখতে একেবারে ফুলের কুঁড়ির মতো) ঢেকে রাখার জন্য আবার ভাঁজযুক্ত হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বৃন্তাংশ লাল বর্ণের হয়। ফুল থেকে ফলে পরিণত হতে ৩৫ দিন সময় লাগে। 

গোলাপি তারকাকৃতির ফলটি সূর্যোদয়ের অনেক আগেই লাল বর্ণের বীজসহ পুরোপুরি খুলে যায়। এই ফলের বীজ পাখি বিশেষ করে বুলবুলি এবং বানরের খুব প্রিয়। এরা বীজ খেয়ে ফেলে বলে খোলা ফলে বীজ পাওয়া খুবই কঠিন । 

লেখক: অধ্যাপক, উদ্ভিদবিজ্ঞান ও প্রকৃতিবিষয়ক লেখক 

আরও পড়ুন

×