বিজয়ের মাস
ঢাকার আশপাশে সেনা ও রাজাকারের হত্যাযজ্ঞ
সাদিকুর রহমান
প্রকাশ: ০২ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৮:০৭ | আপডেট: ০২ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১৩:২৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ঢাকায় অবস্থান করছিলেন বিভিন্ন বিদেশি গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা। মার্কিন গণমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস ও সিবিএসের সাংবাদিকরা ঘুরেছেন ঢাকার আশপাশের এলাকায়। তাদের লেখায় উঠে আসে হত্যাযজ্ঞের বর্ণনা।
ডিসেম্বরের শুরুতে গেরিলা বাহিনীর আক্রমণের মুখে ঢাকার আশপাশে বেশ কোণঠাসা হয়ে পড়ে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকাররা। নিউইয়র্ক টাইমস তাদের প্রতিবেদনে জানায়, ক্ষিপ্ত সেনা ও রাজাকাররা গ্রামবাসীদের খুন ও বাড়ি জ্বালিয়ে দিচ্ছে। বুড়িগঙ্গার পাশে জিনজিরা এলাকায় পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে ব্যাপক তল্লাশি চালায়। আটক করে অর্ধশতাধিক লোককে, যাদের মধ্যে অধিকাংশ তরুণ ও নারী। পরে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে তাদের হত্যা করে। সিবিএস-এর সংবাদদাতা লিখেন, বুড়িগঙ্গা দিয়ে ভেসে যাচ্ছে অগণিত মৃতদেহ।
ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতে তখন মুক্তিবাহিনীর আধিপত্য। তাদের বরাত দিয়ে ৩ ডিসেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে আনন্দবাজার পত্রিকা জানায়, আগের দিন যশোর, কুষ্টিয়া, দিনাজপুর জেলার আরও কয়েকটি থানা দখলে নেওয়া হয়েছে। গেরিলা আক্রমণে পর্যদুস্ত হয়ে পাকিস্তানি বাহিনী নবম ডিভিশনের সদরদপ্তর যশোর থেকে সরিয়ে মাগুরায় নিতে বাধ্য হয়েছে।
লালমনিরহাট বিমানবন্দর ঘেরাও
সিলেট বিমানঘাঁটি ১ ডিসেম্বর দখলে নেয় গেরিলা বাহিনী। ২ ডিসেম্বর তারা ঘিরে ফেলে লালমনিরহাট বিমানবন্দর। রংপুরের নাগেশ্বরী থানা (বর্তমানে কুড়িগ্রামের উপজেলা) দখলের পর তারা এই বিমানবন্দরের দিকে এগিয়ে যায়। চারদিক থেকে ঘিরে ফেলায় গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরটির সঙ্গে পাকিস্তানি বাহিনীর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
উত্তরের আরেক জেলা বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে ২২ পাকিস্তানি সেনাকে হত্যা করে মুক্তিবাহিনী। দুই সেনা পালাতে না পেরে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। এদিন রংপুরের ধরলা নদীর উত্তরে শক্তি সংহত করে মুক্তিবাহিনী এগিয়ে যায় দক্ষিণের দিকে।
সাতক্ষীরা অবরুদ্ধ, চট্টগ্রামে বিস্ফোরণ
২ ডিসেম্বরের ঘটনাগুলোর বর্ণনায় আনন্দবাজার লিখে, খুলনা জেলার সাতক্ষীরা শহরটি অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। শহরের চারদিকে মুক্তিবাহিনী। সাতক্ষীরা শহর থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে ভোমরা-সাতক্ষীরা রোডে হানাদারদের সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর জোর লড়াই চলছে। কুষ্টিয়া জেলার জীবননগর থানার (বর্তমানে চুয়াডাঙ্গার উপজেলা) উত্তর-পূর্বের একটি এলাকা এখন মুক্তিবাহিনীর দখলে। চুয়াডাঙ্গা থানার দখল নিয়েও উভয় পক্ষের জোর লড়াই চলছে।
এপিপির বরাত দিয়ে এদিন দৈনিক ইত্তেফাক জানায়, চট্টগ্রাম বন্দরে পরপর কয়েকটি বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে। সেখানকার পাঁচটি বিদ্যুৎ সাব-স্টেশন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আধা ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ওই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।
আগরতলায় আক্রমণ
২ ডিসেম্বর দুপুরে হঠাৎ পাকিস্তানি যুদ্ধবিমান ভারতের আগরতলা বিমানঘাঁটি এলাকার চারপাশে বোমা ফেলে। এদিনই প্রথমবারের মতো আগরতলায় আকাশ ও স্থলভাগে হামলা চালায় পশ্চিম পাকিস্তানের বাহিনী। একই দিন ভারতের তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জগজীবন রাম আগরতলায় থাকা ভারতীয় সেনাদের পাকিস্তানের ভেতরে ঢোকার নির্দেশ দেন।
আগের দিন ওয়াশিংটনে এক ব্রিফিংয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র চার্লস ব্রে পূর্ব পাকিস্তান সীমান্তে জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক বাহিনী মোতায়েনের প্রস্তাবে সমর্থন জানিয়ে বক্তব্য দেন। ২ ডিসেম্বর তিনি বলেন, পূর্ব বাংলায় ভারতীয় সেনা প্রবেশকে যুক্তরাষ্ট্র ‘আক্রমণ’ হিসেবে অভিহিত করবে না। উত্তেজনা প্রশমিত হয়, আমেরিকা এমন ব্যবস্থাই নিতে চায়। ভারতকে আক্রমণকারী হিসেবে অভিহিত করলে তা উত্তেজনা প্রশমনে সহায়ক হবে না।
অখণ্ডতা রক্ষার দাবি
ইত্তেফাকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২ ডিসেম্বর পশ্চিম পাকিস্তানের পেশোয়ারে বৈঠকে বসেন পাকিস্তান পিপলস পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির নেতারা। সেখানে পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার জন্য জনগণের প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি ওঠে। পরে বলা হয়– পাকিস্তানবিরোধীদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হলে তা হবে ভারতের কাছে আত্মসমর্পণের শামিল।
একই দিন রাওয়ালপিন্ডিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে বিদেশি সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে পড়েন পাকিস্তান সরকারের এক মুখপাত্র। ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে ওই মুখপাত্রকে ‘জনৈক’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। মূলত, পশ্চিম পাকিস্তানে তখন সফর করছিলেন মার্কিন সিনেটর উইলিয়াম বি স্যাক্সবি। ২৫ মার্চ থেকে আটক থাকা শেখ মুজিবের সঙ্গে উইলিয়ামের সাক্ষাৎ হয়েছে কিনা– সে বিষয়ে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন। জবাবে জনৈক মুখপাত্র নেতিবাচক উত্তর দেন। একই সময় তিনি বলেন, পাকিস্তানে কোয়ালিশন বা জোট সরকার গঠন বিষয়ে এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি।
থমকে যায় ত্রাণ কার্যক্রম
কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে নিউইয়র্ক টাইমস লিখে, পূর্ব পাকিস্তানে জাতিসংঘের ত্রাণ সংস্থার ১০ কোটি ডলারের কার্যক্রম প্রায় থমকে গেছে। চট্টগ্রামে লড়াই চলার কারণে আন্তর্জাতিক ত্রাণ তহবিলের অর্থে কেনা ১৬২টি নতুন ট্রাক ফেলে রাখা হয়েছে। সেগুলো যাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বা স্থানীয় বাঙালি গেরিলাদের হাতে না পড়ে, সে জন্য ইঞ্জিন বিকল করে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন স্থানে ত্রাণ কার্যক্রমে জড়িত জাতিসংঘের ৪৫ কর্মীকে নিরাপত্তার জন্য নেওয়া হয়েছে ঢাকায়।
টাইমস আরও লিখে, যুক্তরাষ্ট্রসহ ১৪টি আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার অনুদানে ১৯৭১ সালের জুন মাসে ১০ কোটি ডলারের কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট অর্থের মাত্র ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বিতরণ করা হয়।
আরও পড়ুন: রণাঙ্গনে তীব্র লড়াই, তৎপর কূটনীতিও
