ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

চ্যাথাম হাউসের নিবন্ধ

বাংলাদেশে দরকার গণতান্ত্রিক নবযাত্রা, ভোটে কি তা হবে

বাংলাদেশে দরকার গণতান্ত্রিক নবযাত্রা, ভোটে কি তা হবে
×

জেমস ওর

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৮:০৫ | আপডেট: ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১১:৩১

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশে এই মুহূর্তে একটি গণতান্ত্রিক পুনঃস্থাপন দরকার। তবে আসন্ন সংসদ নির্বাচন তা দিতে পারবে কিনা, সেটি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ব্রিটিশ সাংবাদিক জেমস ওর। গত সোমবার যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের দরকার একটি গণতান্ত্রিক পুনঃস্থাপন: নির্বাচন কি তা দিতে পারবে’ শিরোনামের এক নিবন্ধে এ বিষয়ে আলোচনা করেন তিনি।   

নিবন্ধে বলা হয়, বাংলাদেশ আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে দেশটি কয়েক দশকের ‘প্রতিশোধের রাজনীতির’ অবসান ঘটিয়ে একটি গণতান্ত্রিক ধারায় ফেরার চেষ্টা করছে। ২০২৪ সালের আগস্টে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। আগামী ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি রমজান মাস শুরুর আগেই সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য তিনি চাপের মুখে ছিলেন।

দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে টানা কয়েক সপ্তাহের ছাত্র আন্দোলনের মুখে তিনবারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ফেব্রুয়ারির ভোটের সম্ভাব্য ফলাফল হতে পারে বিএনপির ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন। দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান; যিনি প্রায় দুই দশক ধরে লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন।

জুলাই সনদের ওপর গণভোট
২০২৫ সালের জুলাই সনদে ২৫টি দল দেশের নির্বাচনী, সাংবিধানিক এবং প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠনের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, নতুন নেতৃত্ব তা বাস্তবায়ন করতে পারবে কিনা– তা একটি বড় প্রশ্ন। এই সংস্কারগুলো অনুমোদনের জন্য জনসমর্থন যাচাই করা হবে ফেব্রুয়ারিতে একটি গণভোটের মাধ্যমে। চ্যাথাম হাউসের এশিয়া প্যাসিফিক প্রোগ্রামের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সিনিয়র রিসার্চ ফেলো চিটিগজ বাজপেয়ি বলেন, গত আগস্টে বাংলাদেশে তথাকথিত ‘বর্ষা বিপ্লব’ নামে যা ঘটেছে, তাকে দেশের দ্বিতীয় স্বাধীনতা হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। তবে আমি মনে করি, বাস্তবতা পরিবর্তনের চেয়ে ধারাবাহিকতার দিকেই বেশি যাবে। কারণ, বাংলাদেশের ইতিহাসে আমরা যে সহিংস প্রতিশোধের রাজনীতির চক্র দেখেছি, সেখানে প্রকৃত জাতীয় সমঝোতার দিকে কোনো আন্দোলন লক্ষ্য করা যায়নি। আমরা কেবল পেন্ডুলামকে এক চরম সীমা থেকে অন্য সীমায় দুলতে দেখছি।

জাতিসংঘের তথ্যানুযায়ী, গত বছরের বিক্ষোভে দমনপীড়নের সময় অন্তত এক হাজার ৪০০ মানুষ মারা গেছেন, যা ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর বাংলাদেশের সবচেয়ে ভয়াবহ সহিংসতা। রাজধানী ঢাকায় বিক্ষোভকারীরা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাসভবনে হামলা করার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে তিনি হেলিকপ্টারে ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। গত নভেম্বরে বাংলাদেশের একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল আদালত মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য শেখ হাসিনাকে তাঁর অনুপস্থিতিতেই মৃত্যুদণ্ড দেন। হাসিনা বর্তমানে ভারত সরকারের সুরক্ষায় নির্বাসনে রয়েছেন, যারা সম্ভবত তাঁকে প্রত্যর্পণ করতে রাজি হবে না।

শেখ হাসিনার দণ্ডাদেশের কয়েক মাস আগেই তাঁর দল আওয়ামী লীগকে যারা ১৫ বছর ক্ষমতায় ছিল, তাদের আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে নিষিদ্ধ করা হয়। অনেকে আশঙ্কা করছেন, এই সিদ্ধান্ত নির্বাচনের বৈধতাকে ক্ষুণ্ন করতে পারে। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের এসওএএসের অধ্যাপক নাওমি হোসেন বলেন, সবচেয়ে সম্ভাব্য ফলাফল মনে হচ্ছে বিএনপি জিতবে এবং জামায়াতে ইসলামী প্রধান বিরোধী দল হবে। তবে বিএনপি জনগণের কাছে খুব একটা জনপ্রিয় নয়; মানুষ অনেকটা বাধ্য হয়েই তাদের ভোট দেবে। ২০০০ এর দশকের শুরুর দিকে যাদের তাদের কথা মনে আছে, তারা জানে দলটি কতটা সহিংস এবং দুর্নীতিগ্রস্ত ছিল।

গত বছর ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতি সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৫১তম। বিশেষজ্ঞদের মতে, হাসিনার শাসনের আগে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকর এবং নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা ছিল, কিন্তু এখন আর সেই পরিস্থিতি নেই।

প্রতিশোধের রাজনীতির চক্র
বর্তমানে বাংলাদেশের সিভিল সার্ভিস এবং একসময়ের স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো, যা একসময় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করত, সেগুলো গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে। সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং গণমাধ্যম মূলত আওয়ামী লীগের কর্তৃত্ববাদী মানসিকতার কবলে পড়েছিল। চিটিগজ বাজপেয়ি বলেন, হাসিনা সরকারের অধীনে আমরা বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর ওপর নির্যাতন দেখেছি। এখন আমরা আওয়ামী লীগের ওপর শুদ্ধি অভিযান দেখছি। প্রশ্ন হলো, এই চক্রটি আপনি কীভাবে ভাঙবেন? অন্তর্বর্তী সরকারের অনেক ইতিবাচক সদিচ্ছা থাকলেও তাদের কথা ও বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান রয়েছে। আশঙ্কার বিষয় হলো, পুরোনো রাজনৈতিক পরিবারতন্ত্র আবার ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠা পেলে মানুষ আরও হতাশ হয়ে পড়বে। আর রাজনীতি ফিরে যাবে আগের পথেই; যা জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মধ্যে কিছুটা দেখা যাচ্ছে।

অর্থনৈতিকভাবেও বাংলাদেশ বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে আছে। গত দুই দশকে জিডিপি বাড়লেও করোনা মহামারির পর থেকে প্রবৃদ্ধির হার কমেছে। দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ সীমিত এবং জ্বালানি চাহিদার পুরোটাই আমদানি করতে হয়। সম্প্রতি ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য কমিয়ে তারা চীন, পাকিস্তান এবং তুরস্কের সঙ্গে নতুন কৌশলগত জোটের দিকে ঝুঁকে পড়েছে, যা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

অধ্যাপক নওমি হোসেন বলেন, বাংলাদেশের সরকারগুলোর বৈধতা মূলত অর্থনৈতিক উন্নয়নের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু নতুন সরকারের সামনে দরিদ্রদের সাহায্য এবং অর্থনীতি পুনর্গঠনে খুব সামান্যই আর্থিক সুযোগ থাকবে। বিএনপি নির্বাচনে জিতে আওয়ামী লীগের মতো স্বজনপ্রীতির পুঁজিবাদী মডেল অনুসরণ করবে কিনা, তা আমরা জানি না। তবে তাদের ওপর একমাত্র লাগাম হতে পারে আরেকটি গণঅভ্যুত্থানের আশঙ্কা। এ ছাড়া আর কিছু নেই বললেই চলে।

 

আরও পড়ুন

×