সংসদ নির্বাচন
আগ্রহ থাকলেও ভোটের মাঠে তৎপর নয় অনেক দল
আওয়ামী লীগের শরিক ও মিত্র ৯টি দল নিষ্ক্রিয়
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৮:১৪ | আপডেট: ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৯:৪৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
আগের জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়া উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দল আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে দ্বিধায় রয়েছে। ভোটে অংশ নেওয়ার আগ্রহ থাকলেও দলগুলো মাঠে সেভাবে সক্রিয় হয়নি। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের শরিক ও মিত্র ৯টি দল এবারের নির্বাচনে নিষ্ক্রিয়। আরও ১৪টি দলের তৎপরতা নেই ভোটের মাঠে।
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক দলগুলো ভোটের মাঠে তৎপর না থাকলেও নির্বাচনে অংশ নিতে চায়। আওয়ামী লীগকে ছাড়াই তারা নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে অংশ নেওয়া ২৭ দলের ১৯টি ইতোমধ্যে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। গত তিন সংসদে প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসা জাতীয় পার্টি (জাপা) এককভাবে ভোটে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের শরিক জাতীয় পার্টি (জেপি) ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে অংশ নিতে যাচ্ছে ৭ জানুয়ারির ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা আরও পাঁচটি নিবন্ধিত দলকে নিয়ে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা কয়েক মাস ধরে ভোটের মাঠ চষে বেড়ালেও এই দলগুলোর দৃশ্যমান তৎপরতা
ছিল না।
গত ১১ ডিসেম্বর ঘোষিত তপশিল অনুযায়ী আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। ১২ ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র কেনা ও জমা শুরু হয়েছে। ২৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রার্থী হওয়া যাবে। নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন কার্যকর রয়েছে– এমন দলের সংখ্যা বর্তমানে ৫৬। এর মধ্যে গত বছর ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ২৮টি দল অংশ নিয়েছিল। অবশ্য সে সময়ে নিবন্ধন ছিল ৪২টি দলের। বিএনপিসহ ১৪ দল ‘ডামি নির্বাচন’ বর্জন করেছিল। এই ১৪টি দল, নিবন্ধন ফিরে পাওয়া জামায়াত এবং ৫ আগস্টের পর নতুন নিবন্ধন পাওয়া ১৪টি দল এবারের নির্বাচনে অংশ নিতে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যানুযায়ী, ৪৭টি দল আসন্ন নির্বাচনে অংশ নিতে পারে।
এদিকে জাপা ও ১৪ দলের শরিকদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার বিরুদ্ধে জামায়াত, এনসিপিসহ কয়েকটি দল। ‘ডামি নির্বাচনে’ অংশ নেওয়া প্রার্থীদের অযোগ্য ঘোষণা করতে নির্বাচন কমিশনে গতকাল বুধবার আইনি নোটিশ দিয়েছে জুলাই অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন।
নৌকার ৯ শরিক-মিত্র নিষ্ক্রিয়
১৪ দলের শরিক নিবন্ধিত ছয় দল বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ), বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল (এমএল), ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ), গণতন্ত্রী পার্টি ও বাংলাদেশ তরীকত ফেডারেশন জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয়। দলগুলোর নেতারা হয় কারাগারে, নয়তো আত্মগোপনে।
২০১৮ সালে বিএনপির সঙ্গে জোট করে নির্বাচন করা আবদুল কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তমের নেতৃত্বাধীন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ গত নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। বিএনপি বর্জন করলেও এ দলটি ২০২৪ সালের নির্বাচনে ৩০ আসনে প্রার্থী দিয়েছিল। দলটি এবারের নির্বাচনে অংশ নেবে কিনা, তা অনিশ্চিত। কাদের সিদ্দিকী জানিয়েছেন, পরিবেশ পরিস্থিতির অপেক্ষায় রয়েছেন।
৭ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে বিএনপির জোট ছেড়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভিড়ে এমপি হওয়া মেজর জেনারেল (অব.) মুহাম্মদ ইবরাহিমের কল্যাণ পার্টিও নিষ্ক্রিয়। গত নির্বাচনের আগে কিংস পার্টির তকমা পাওয়া বিএসপির একই অবস্থা। আওয়ামী লীগের জোটে যাওয়ার কারণে অভ্যুত্থানের পর ক্ষমা চাওয়া দল বিকল্পধারা নির্বাচনে অংশ নেবে কিনা, এখনও স্পষ্ট করেনি।
কিছু দল নানা জোটে, তবে নিষ্প্রভ
৭ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ নেওয়া অন্য দলগুলোর মধ্যে ইসলামী ফ্রন্ট, ইসলামী ঐক্যজোট, গণফোরাম, জাকের পার্টি, তৃণমূল বিএনপি, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি), বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, বাংলাদেশ কংগ্রেস, খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (মতিন), বিএনএম, বিএনএফ, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট আগামী নির্বাচনেও অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত জানিয়েছে।
নেতৃত্ব পরিবর্তন হওয়া গণফোরাম এখন বিএনপির সঙ্গে রয়েছে। দলটি বিএনপির কাছে কিছু আসনে ছাড় চায়। ৫ আগস্টের পর নেতৃত্ব পরিবর্তন হওয়া খেলাফত আন্দোলন রয়েছে জামায়াতের সঙ্গে। শেখ হাসিনার দুই মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর জেপি এবং ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদের জাপার একাংশের নেতৃত্বাধীন জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক জোটে ভিড়েছে বিএনএম, সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট, গণফ্রন্ট, মুসলিম লীগ ও তৃণমূল বিএনপি।
আওয়ামী লীগের প্রকাশ্য শরিক ও মিত্রগুলোর মতো এই ১৪টি দলও নির্বাচনের মাঠে সক্রিয় নয়। এর মধ্যে বাংলাদেশ কংগ্রেস নির্বাচন স্থগিত চেয়ে রিটও করেছিল, যদিও তা খারিজ হয়ে গেছে।
একক নির্বাচনের সিদ্ধান্ত ‘ভগ্ন’ জাপার
এককভাবে ভোটে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে জি এম কাদেরের নেতৃত্বাধীন জাপা। গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয় দলটি। তপশিল ঘোষণার ছয় দিন পর গতকাল সন্ধ্যায় রাজধানীর কাকরাইলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলীয় মনোনয়ন ফরম বিক্রিও শুরু করে জাপা। চলবে আগামী ২১ ডিসেম্বর পর্যন্ত।
দল থেকে বহিষ্কৃত সাবেক মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গাকে ফিরিয়ে নিয়েছে জাপা। বুধবার কেন্দ্রীয় কমিটির সভার মঞ্চে দলীয় চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের পাশে ছিলেন তিনি। ২০০১ সালের নির্বাচনে রংপুর-৬ আসনে শেখ হাসিনাকে হারিয়ে চমক দেখানো নুর মোহাম্মদ মণ্ডলকেও দলে ফিরিয়ে নিয়েছে জাপা। তিনি ২০০৮ সালে বিএনপিতে যোগ দিয়েছিলেন। পরে যোগ দেন আওয়ামী লীগে।
নৌকা প্রতীকে উপজেলা চেয়ারম্যানও নির্বাচিত হন রংপুর-৬ আসনের তৎকালীন এমপি এবং আওয়ামী লীগ আমলের স্পিকার ড. শিরীন শারমিনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত নুর মণ্ডল। জাপা সূত্র জানিয়েছে, দলছুট অন্য নেতাদেরও ফেরানোর চেষ্টা চলছে।
গত তিন বিতর্কিত নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দল হয়েছিল জাপা। যোগ দিয়েছিল সরকারেও। প্রায় সব ইস্যুতে সরকারের সুরে কথা বলে গৃহপালিত বিরোধী দলের তকমা পাওয়া জাপা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর চাপে রয়েছে। একাধিকবার জাপা কার্যালয়ে হামলা হয়েছে। অভ্যুত্থানের ছাত্রনেতৃত্ব দলটিকে ফ্যাসিবাদের দোসর আখ্যা দেওয়ার পর সরকার, নির্বাচন কমিশন, সংস্কার কমিশনগুলো বৈঠকে ডাকছে না এ দলকে।
এমন পরিস্থিতিতে বুধবার কেন্দ্রীয় কমিটির সভাও হয় অনেকটা গোপনে। কমিটির অধিকাংশ সদস্যকে এতে ডাকা হয়নি। জাপা মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী সমকালকে বলেন, নির্দিষ্ট কিছু নেতাকে ডাকা হয়েছিল। নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি হিসেবে দলীয় মনোনয়ন ফরম বিক্রির সিদ্ধান্ত হয়েছে। আমরা পরিবেশ-পরিস্থিতি দেখব। যদি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকে; জাপা বরাবরের মতোই নির্বাচনে অংশ নেবে।
গতকাল জাপা কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, আট বিভাগের জন্য পৃথক বুথে মনোনয়ন ফরম বিক্রি শুরু হয়েছে। তবে মনোনয়নপ্রত্যাশীর ভিড় ছিল না। দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য রেজাউল ইসলাম ভূঁইয়া সমকালকে বলেন, ২১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মনোনয়ন ফরম বিক্রি হবে। এরপর মনোনয়ন বোর্ড প্রার্থী বাছাই করবে।
নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধে গত আগস্টে ভেঙেছে জাপা। শেখ হাসিনার আমলের মন্ত্রী এবং সর্বশেষ সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ একই নামে দল করেছেন। শেখ হাসিনার আমলে লাঙ্গলের মনোনয়নে এমপি-মন্ত্রী হওয়া নেতাদের অধিকাংশ জি এম কাদেরকে ছেড়ে এই দলে যোগ দিয়েছেন। জেপির সঙ্গে জোট করেছে দলটি। তাদের জোটও মনোনয়ন ফরম বিতরণ শুরু করেছে। জোটের মুখপাত্র রুহুল আমিন হাওলাদার বলেছেন, নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি চলছে।
আ.লীগকে ছাড়াই ভোটে রাজি ১৪ দলের শরিকরা
৫ আগস্টের অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকেই ১৪ দলের শরিকরা অস্তিত্বের সংকটে ভুগছে। ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু গ্রেপ্তার হয়ে গণহত্যার অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি। শরিক অন্য দলের শীর্ষ নেতারাসহ বেশির ভাগ নেতাকর্মী দেশ-বিদেশে আত্মগোপনে। সবশেষ গত ১১ নভেম্বর রাতে রাজধানীর তোপখানা রোডে ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয় দখলে নিয়ে ‘ফ্যাসিবাদী গবেষণা কেন্দ্র’ সাইনবোর্ড টানিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর আগে দিলীপ বড়ুয়ার নেতৃত্বাধীন সাম্যবাদী দলের তোপখানা রোডের কেন্দ্রীয় কার্যালয় দখলে নিয়েছে হারুন চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন দলের অন্য অংশটি।
তবে ভারপ্রাপ্ত নেতৃত্ব দিয়ে ওয়ার্কার্স পার্টি এবং কার্যকরী কমিটির ব্যানারে জাসদ ঘরোয়া কার্যক্রম চালাচ্ছে। তরীকত ফেডারেশন ও গণতন্ত্রী পার্টির তৎপরতা নেই।
ওয়ার্কার্স পার্টি নির্বাচন কমিশনের (ইসি) জ্যেষ্ঠ সচিবের সঙ্গে দেখা করে ১০ দফা দাবি জানিয়ে এসেছে। ইসি সচিবের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করছে জাসদও। দলগুলোর নেতারা জানাচ্ছেন, সুযোগ পেলে অবশ্যই আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে চান।
ওয়ার্কার্স পার্টির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নূর আহমেদ বকুল সমকালকে বলেন, ‘আমরা নির্বাচন করতে চাই। কিন্তু সেই পরিবেশ কোথায়? আমাদের দলীয় শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার ও হামলা-মামলা করা হয়েছে। সর্বশেষ এনসিপির ছাত্র সংগঠন ছাত্রশক্তির ১০-১২ জন কর্মী আমাদের কেন্দ্রীয় কার্যালয় দখল করে নিয়েছে। আমরা দলীয় অফিসেও যেতে পারি না। এ অবস্থায় আমরা নির্বাচনী কার্যক্রম চালাব কীভাবে?’
ন্যাপের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন বলেন, নির্বাচনে অংশগ্রহণ বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নেননি তারা।
জাসদের দপ্তর সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন বলেন, তাদের দল পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। শিগগিরই এ বিষয়ে তারা নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করবেন।
সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়ার মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও বন্ধ পাওয়া গেছে। তাঁর পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে গুরুতর অসুস্থ ১৪ দলের এ নেতা সব ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রম থেকে দূরে আছেন।
আর ভোটে অংশ নেওয়ার বিষয়ে কাদের সিদ্দিকী বলেন, ‘সার্বিকভাবে নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি হলে আমরা অবশ্যই নির্বাচন করব। কিন্তু পাতানো নির্বাচনে যাব না।’
- বিষয় :
- সংসদ নির্বাচন
- আওয়ামী লীগ
- ১৪ দল
- জাপা
