ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

জিয়া উদ্যান থেকে স্মৃতিসৌধ পর্যন্ত জনতার ঢল

বাবার কবরের পাশে আবেগে আপ্লুত তারেক রহমান

তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন রাজনৈতিক অঙ্গনে আশার সঞ্চার মির্জা ফখরুল

বাবার কবরের পাশে আবেগে আপ্লুত তারেক রহমান
×

যুক্তরাজ্যে ১৭ বছর নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে দেশে ফেরার পরদিন জিয়াউর রহমানের কবর জিয়ারত করলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গতকাল শুক্রবার বিকেলে কেন্দ্রীয় নেতাদের নিয়ে দলের প্রতিষ্ঠাতার প্রতি ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর পর মোনাজাত করেন তিনি -সমকাল

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৮:৩৩ | আপডেট: ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৯:২০

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে ফেরার দ্বিতীয় দিনে বাবা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবর জিয়ারত করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। প্রায় ১৯ বছর পর গতকাল শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর জিয়া উদ্যানে বিএনপি প্রতিষ্ঠাতার কবর জিয়ারত করেন তিনি। দলের স্থায়ী কমিটিসহ শীর্ষ নেতাদের নিয়ে প্রথমে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে তিনি আপ্লুত হয়ে পড়েন। 

পরে দোয়া ও মোনাজাত করেন তিনি। এ সময় জিয়া উদ্যানসহ আশপাশের এলাকায় জনতার ঢল নামে। তারেক রহমান ২০০৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সর্বশেষ জিয়াউর রহমানের মাজার জিয়ারত করেছিলেন।

দীর্ঘ ১৭ বছর লন্ডনে নির্বাসিত থাকার পর গত বৃহস্পতিবার দেশে ফেরেন তারেক রহমান। পূর্বঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে শুক্রবার বিকেল ৪টা ৪২ মিনিটে বাবার মাজার জিয়ারত করেন তিনি। সেখানে ১০ মিনিটের মতো অবস্থান করেন তারেক রহমান। বাবার সমাধির সামনে যখন তিনি দাঁড়ান, তখন তাঁর চোখ অশ্রুতে ছলছল করে। 

প্রথমে মা বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সুস্থতা ও চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের আত্মার শান্তি কামনা করে দোয়া করা হয়। পরে অশ্রুভেজা চোখে দুই হাত তুলে মোনাজাত করেন তারেক রহমান। তিনি কিছুক্ষণ একা নীরবে দাঁড়িয়ে সুরা ফাতেহা ও দরুদ পাঠ করেন। মোনাজাতের সময় তাঁকে আবেগপ্রবণ হতে দেখা যায় এবং মোনাজাত শেষে রুমাল দিয়ে চোখ মোছেন।

বিকেল ৩টার একটু আগে তারেক রহমান গুলশানের বাসভবন থেকে জিয়া উদ্যানের দিকে রওনা হন। লাল-সবুজ রঙে সাজানো বাসে চড়েই তিনি মাজার জিয়ারত করতে যান। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে বাস থেকে নেমে হেঁটে মাজারস্থলে যান। এ সময় নেতাকর্মীদের সামাল দিতে নিরাপত্তা বাহিনীকে বেশ বেগ পেতে হয়। এরপর তিনি সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের উদ্দেশে রওনা হন।

এর আগে শ্রদ্ধা নিবেদনের সময়ে তারেক রহমানের পাশে ছিলেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমেদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, সেলিমা রহমান, হাফিজ উদ্দিন আহমদ প্রমুখ।

মাজার জিয়ারত শেষে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তারেক রহমানের দেশে ফেরা বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের বার্তা নিয়ে এসেছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, এই প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। ২০০৬ সালের পর দীর্ঘ সময় নির্বাসিত থাকার পর তাঁর এই প্রত্যাবর্তন ছিল রাজকীয় ও অভূতপূর্ব। দেশের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাঁকে সংবর্ধনা জানিয়েছে এবং আনন্দ-উচ্ছ্বাসে অংশ নিয়েছে। 

বিএনপির মহাসচিব বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে খুব কম নেতার পক্ষেই এমন স্বতঃস্ফূর্ত জনসমর্থন ও গণঅভ্যর্থনা পাওয়া সম্ভব হয়েছে। তরুণ ও সম্ভাবনাময় নেতৃত্ব হিসেবে তারেক রহমানকে আজ দেশের মানুষ শুধু নয়, বিশ্ব গণমাধ্যমও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখছে।
দেশের রাজনৈতিক আকাশে এখন সুবাতাস বইতে শুরু করেছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, তারেক রহমানের দেশে ফেরার মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও জনগণের প্রত্যাশা বাস্তবায়নের পথ আরও সুগম হবে।

জিয়া উদ্যান থেকে স্মৃতিসৌধ পর্যন্ত জনতার ঢল
বৃহস্পতিবারের মতো শুক্রবারও তারেক রহমানের কর্মসূচি ঘিরে জনতার ঢল নামে। এদিন দুপুরে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে বুলেটপ্রুফ বাসে গুলশানের বাড়ি থেকে জিয়া উদ্যানের উদ্দেশে যাত্রা করেন তিনি। 

জুমার নামাজের পর তারেক রহমান মাজারে যাবেন এমন খবরে সকাল থেকেই জিয়া উদ্যান সংলগ্ন রাস্তাগুলোতে জনসমাগম বাড়তে থাকে। তাঁকে বহনকারী বাসটি বিজয় সরণি পৌঁছালে কর্মী-সমর্থকদের প্রচণ্ড ভিড়ে থমকে যায়। এ সময় চারপাশের নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেঙে যায়। সড়কে যেমন জনতার ভিড় ছিল, তেমনি আশপাশের বাড়িঘরের দরজা-জানালার পাশে ও ছাদে নারী-পুরুষের উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। তারা হাত নেড়ে তাঁকে শুভেচ্ছা জানান। জবাবে তারেক রহমানও বাসের ভেতরে থেকে হাত নাড়িয়ে সালামসহ শুভেচ্ছা জানান। 

বিজয় সরণি থেকে মাজার পর্যন্ত নানা কারণে আধা কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে লেগে যায় পৌনে দুই ঘণ্টা। নেতাকর্মীরা বিজয় সরণি থেকে ক্রিসেন্ট লেকের সড়কের দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে তাদের নেতাকে অভিনন্দন জানান। বিকেল ৪টা ৩৬ মিনিটে বাস থেকে নেমে তিনি সমাধিস্থলে যান। 

সেখান থেকে তিনি সাভার স্মৃতিসৌধের উদ্দেশে রওনা হন। তবে পথিমধ্যে নেতাকর্মীদের কারণে খুব ধীরগতিতে এগোতে থাকে তাঁর গাড়িবহর। এ সময় তাঁকে একনজর দেখার জন্য রাস্তার দুই ধারে নেতাকর্মী ছাড়াও সাধারণ মানুষ উপস্থিত হয়। 

রাত সাড়ে ৯টার দিকে তারেক রহমানের গাড়িবহর সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ড অতিক্রম করে। রাত ১০টার কিছু পর তিনি জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। ১০টা ৩৭ মিনিটে বাসে বসে স্মৃতিসৌধের পরিদর্শন বইয়ে স্বাক্ষর করেন তিনি।

তারেক রহমানের পক্ষে স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন
বিপুল জনসমাগমের কারণে নিয়ম অনুযায়ী সূর্যাস্তের আগে জাতীয় স্মৃতিসৌধের বেদিতে পৌঁছানো সম্ভব না হওয়ায় তারেক রহমানের পক্ষে সে সময় মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন দলটির শীর্ষ নেতারা। তারা পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান।

এ সময় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় সাংবাদিকদের বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবর জিয়ারত শেষে তারেক রহমান স্মৃতিসৌধের উদ্দেশে রওনা দেন। তবে স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণের নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী সূর্যাস্তের আগেই শ্রদ্ধা নিবেদন করতে হয়। সে কারণে বিকেল ৫টা ৬ মিনিটে তারেক রহমানের পক্ষ থেকে আমরা পুষ্পস্তবক অর্পণ করেছি।

শ্রদ্ধা নিবেদনকালে আরও উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান, বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমান উল্লাহ আমান ও লুৎফুজ্জামান বাবর। এ ছাড়া ঢাকা জেলা বিএনপির সভাপতি খন্দকার আবু আশফাক ও সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নিপুণ রায় চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।

সড়কে মানুষের ঢল, যানজট
তারেক রহমান জাতীয় স্মৃতিসৌধে যাবেন এ খবরে সাভার, আশুলিয়া, ধামরাইসহ বিভিন্ন এলাকার মানুষের ঢল নামে সড়কে। তাঁকে একনজর দেখার জন্য সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে ভিড় করে লোকজন। হাতে জাতীয় পতাকা, দলীয় পতাকা, ব্যানার ও ফেস্টুন নিয়ে রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল অসংখ্য মানুষ। কোথাও কোথাও শৃঙ্খলাবদ্ধ সারি থাকলেও অনেক স্থানে উচ্ছ্বাসে রাস্তায় অবস্থান নেন তারা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে সার্বক্ষণিক সতর্ক থাকলেও সৃষ্টি হয় যানজট। নবীনগর থেকে আমিনবাজার পর্যন্ত দূরপাল্লার গাড়ি চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছিল। 

আরও পড়ুন

×