বিশেষ লেখা
নতুন বছরে মূল চ্যালেঞ্জ কাঠামোগত সংস্কার
ড. জাহিদ হোসেন
ড. জাহিদ হোসেন
প্রকাশ: ০১ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৮:৪৪ | আপডেট: ০১ জানুয়ারি ২০২৬ | ১৮:৩৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
নতুন বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ এবং করণীয় বিষয়ে মতামতের ক্ষেত্রে সদ্য সমাপ্ত বছরের পরিস্থিতি পর্যালোচনা গুরুত্বপূর্ণ। গত অর্থবছরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দুর্বল ছিল। প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ শতাংশের কম। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। ২০২৫ সালের প্রথম ৭ মাস গড় মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের বেশি ছিল। সর্বশেষ নভেম্বর মাসে তা কমে ৯ শতাংশের কাছাকাছি। রপ্তানি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে ধীরগতি দেখা গেছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে চাঞ্চল্য তৈরি হয়নি।
বর্তমানে একটি আলোচনা আছে– বাংলাদেশে ‘স্ট্যাগফ্লেশন’ (অর্থনীতিতে স্থবিরতা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির যুগপৎ অবস্থা) চলছে কিনা। স্ট্যাগফ্লেশনের টেক্সটবুক সংজ্ঞা হলো, প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি থাকবে। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশে স্বাভাবিকভাবে কিছু প্রবৃদ্ধি হয়, যাকে ‘ক্যাচআপ গ্রোথ’ বলা হয়। সে ক্ষেত্রে স্ট্যাগফ্লেশনের সংজ্ঞাও একটু বদলায়। যদি প্রবৃদ্ধি নিম্নগামী থাকে এবং মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকে তাহলে ‘স্ট্যাগফ্লেশন’-এর একটি সংকেত দেয়। কভিডের পর থেকে আমরা দেখেছি, মূল্যস্ফীতি হুহু করে বেড়েছে এবং প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে কমেছে। বিবিএসের ত্রৈমাসিক জিডিপি প্রবৃদ্ধির হিসাব পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, একটি নিম্নগতির প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি সিঙ্গেল ডিজিটে নামলেও তা এখনও উচ্চ অঙ্কের। ফলে বাংলাদেশ একটি পরিমিত স্ট্যাগফ্লেশনের মধ্যে রয়েছে।
আমরা কীভাবে এ পরিস্থিতি মোকাবেলা করব? প্রথমে দেখতে হবে, অর্থনীতি যে মাটির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, সেই মাটি শক্ত, নাকি চোরাবালি? নাকি কাদা? এই মাটি হলো রাজনৈতিক ভারসাম্য। কাজেই স্ট্যাগফ্লেশন বা ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি বা ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি– সব আলোচনা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায় যদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না থাকে। মাটি যখন চোরাবালির মতো হয়, তখন একজন মানুষ যতই সুস্থ থাকুক না কেন, দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। আর মাটি যদি কর্দমাক্ত হয়, তাহলে দৌড়াতে পারে না। এর মানে, রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে অর্থনীতি এগোতে থাকবে।
ধরে নিলাম, নির্বাচনের পর আমরা একটি রাজনৈতিক স্থিতিশীল অবস্থায় পৌঁছাতে পারব। তারপর কী হবে? বাংলাদেশ কত শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনে সক্ষম? বর্তমানে যে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, যে ধরনের বিনিয়োগ এবং যে ধরনের জনমিতিক পরিস্থিতি আছে, তাতে প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনার একটা হিসাব বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ করে। সেখানে সাড়ে ৬ শতাংশের বেশি সম্ভাবনা নেই। তবে বড় ধরনের সংস্কার হলে প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা বাড়বে। উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হতে হলে আমাদের প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশে নিতে হবে এবং ২০৩৫ সাল পর্যন্ত তা টেকসই রাখতে হবে, যা খুবই উচ্চাভিলাষী। কিন্তু ৮ শতাংশ না পারলেও আমরা যদি সাড়ে ৬ শতাংশেও উঠতে চাই, তাহলে অর্থনৈতিক পূর্বসত্য হলো, সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ধারাবাহিকভাবে থাকতে হবে।
সামষ্টিক অর্থনীতির ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। একটি হলো মূল্যস্ফীতি, দ্বিতীয় হলো বহির্বাণিজ্যে লেনদেনের ভারসাম্য, তৃতীয়টি আর্থিক খাতের সুস্থতা। মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে ইদানীং আমরা বিতর্ক করছি, কোন কোন বিষয় মূল্যস্ফীতিকে নির্ধারণ করে। ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত মাসিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে আমার কাছে মনে হয়েছে, মূল ফ্যাক্টর দুটি। একটি হলো টাকা-ডলার বিনিময় হার। ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমলে একটা পর্যায়ে তা মূল্যস্ফীতিকে প্রভাবিত করে। ডলারের দাম যদি এক টাকা বাড়ে তাহলে মূল্যস্ফীতি যে গতিতে উঠবে, এক টাকা কমলে সেই গতিতে কমবে না।
মূল্যস্ফীতির আরেকটি ফ্যাক্টর হলো, খাদ্যের দাম বেড়ে গিয়ে অব্যাহত থাকা। আর খাদ্যের দাম বেড়ে গিয়ে না কমার কারণ চাহিদাজনিত নয়, বরং সরবরাহজনিত। সরবরাহ পর্যায়ে চাঁদাবাজির মতো বিষয় এক ধরনের ‘ট্যাক্স’ হিসেবে কাজ করে। আমার কাছে মনে হয়, বাংলাদেশে যারা পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থায় চাঁদাবাজিতে জড়িত, তারা মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশায় চাঁদার হার নির্ধারণ করে। এক ট্রাক থেকে তারা কত নেবে বা ঘাট থেকে কত নেবে বা বাজার থেকে দিনে কত টাকা তুলবে– এগুলো আগামীতে মূল্যস্ফীতির একটা ধারণার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় এবং চাঁদাবাজির ‘রেট’ বাড়লে পণ্যের দাম বেড়ে যায়। আবার চাল, পেঁয়াজ, ভোজ্যতেল বা চিনির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহকারী যারা বড় বড় খেলোয়াড়, তারা বাজারকে প্রভাবিত করতে পারে।
বিনিময় হারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের করণীয় হলো স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। গত এক বছরে এ ক্ষেত্রে দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে। এর পেছনে শক্তিশালী ভূমিকা রেখেছে রেমিট্যান্স। এর ফলে চলতি হিসাবের ভারসাম্যে উদ্বৃত্ত হয়েছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে। আমার কাছে মনে হয়, ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ চাঙ্গা হওয়ার বড় কারণ অর্থ পাচারে ভাটা। এই ভাটার প্রধান কারণ, যারা পাচার করত তাদের অনেকে নিজেরাই পাচার হয়ে গেছে। আবার অনেকে দেশে থাকলেও ক্ষমতার সঙ্গে তাদের সংযোগ নেই। নতুন বছরে যদি এ পরিস্থিতি টিকিয়ে রাখা যায় তাহলে রেমিট্যান্সের উচ্চ প্রবাহ বজায় থাকবে। বিনিময় হারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা গেলে মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে কমতে পারে। তবে বাজারের কাঠামোগত সমস্যার দিকে নজর দিতে হবে। চাঁদাবাজি বা সিন্ডিকেটের প্রবণতা হলো আইনশৃঙ্খলার সমস্যা। সুতরাং বাজারে যদি আইনের শাসন থাকে এবং প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা যায় তাহলে সরবরাহের দিকের সমস্যার উন্নতি হবে।
তৃতীয় বিষয় হলো আর্থিক খাতের দুর্দশা। এই দুর্দশাকে যদি আমরা খেলাপি ঋণ দিয়ে মাপি তাহলে ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো চিহ্ন আপাতত দেখা যাচ্ছে না। যদিও আর্থিক খাতে রেগুলেশন বা কাঠামোগত সংস্কার ইদানীংকালে কিছু হয়েছে। দুর্বল ব্যাংক একীভূতকরণের একটা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু ব্যাংক খাতের দুর্দশা এখনও কাটেনি। স্বস্তির জায়গা হলো, দুর্দশার গভীরতা আরও নিচের দিকে যাচ্ছে না। মানে যে তলানিতে গিয়েছিল, সেখান থেকে বের হওয়ার চেষ্টা রয়েছে।
প্রশ্ন হলো, সামষ্টিক অর্থনীতিতে যদি স্থিতিশীলতা থাকে, তারপর কী করতে হবে? সেখানে আগে আসে কাঠামোগাগত সংস্কারের কথা। এ সংস্কারের ক্ষেত্রে আমরা দুই ধরনের কথা বলি। একটা হলো, ব্যবসায় যখন কোনো সমস্যা হয় তখন তাৎক্ষণিক নীতি সহায়তা দেওয়া হয়। এটি প্যারাসিটামলের মতো। কিন্তু মাথায় রাখতে হবে, নীতি সহায়তা কিন্তু সংস্কার নয়। কাঠামোগত সংস্কার হলো প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা বিভিন্ন ধরনের। যেমন ব্যবসা করতে গেলে সময় বা খরচ অনেক বেশি। বন্দরে মাল আটকে থাকে। নীতি সহায়তার নামে ‘পেইন কিলার’ দেওয়ার মানে হলো, ব্যথা কমে গেলে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার তাগিদ কমে যাওয়া। সেই কারণে কাঠামোগত সংস্কারও ঝিমিয়ে পড়ে। বাংলাদেশে এটি একটা চক্রের মতো হয়ে গেছে।
সব শেষে বলব, নতুন বছরে কাঠামোগত সংস্কারে বেশি জোর দিতে হবে। গত ১৫ মাসে কাঠামোগত সংস্কারের মধ্যে এনবিআরের পৃথককরণ উল্লেখযোগ্য। এই সংস্কার যখন অধ্যাদেশ আকারে জারি হলো, তখন বড় ধরনের প্রতিরোধ আমরা দেখেছি। অবশ্য এটি অপ্রত্যাশিত ছিল না। অন্যদিকে চট্টগ্রাম বন্দরের দক্ষতা বাড়াতে বৈশ্বিকভাবে সুনাম থাকা কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করার ক্ষেত্রেও প্রতিরোধ এসেছে। কাঠামোগত সংস্কার করতে গেলে সুবিধাগ্রস্ত এবং ক্ষতিগ্রস্ত দুটি পক্ষ থাকবেই। সংস্কারের কারণে যারা বর্তমান অবস্থার সুবিধা পাচ্ছে, তারা তো ক্ষতিগ্রস্ত হবেই। ফলে সংস্কারের রাজনৈতিক অর্থনীতি ‘ম্যানেজ’ করতে না পারলে এক ধরনের ‘খারাপ ভারসাম্য’ তৈরি হতে থাকবে। এ কারণে নির্বাচন-পরবর্তী সরকারের জন্য কাঠামোগত সংস্কারই হবে মূল চ্যালেঞ্জ।
- বিষয় :
- ড. জাহিদ হোসেন
- অর্থনীতি
