অতিবৃষ্টিতে দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে বন্যা
বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে নিম্নাঞ্চলের অনেক স্থান। বাড়িঘরে উঠেছে পানি। ঘরের উঠানে মাছ ধরছে দুই শিশু। মানিকগঞ্জের শিবালয়ের উথুলি এলাকার ছবি - মাহবুব হোসেন নবীন
জয়নাল আবেদীন
প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ১০ আগস্ট ২০২০ | ১৮:৫৩
উজানের পাশাপাশি এবার অতিবর্ষণে প্লাবিত হয়েছে ভাটির জনপদ। ফলে দ্বিতীয় দীর্ঘস্থায়ী বন্যার কবলে দেশ। উজানের দেশ ভারত, নেপাল ও চীনের পানির চাপ তো আছেই, সঙ্গে জুলাইয়ে বৃষ্টিপাতের রেকর্ড ভেঙে গতি এনেছে বন্যায়। এবার মূলত ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা অববাহিকায় দেখা গেছে বন্যার ভয়াবহতা। বানের পানি নেমে আসার সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যমান হচ্ছে ক্ষতচিহ্ন। নিশ্চিহ্ন হচ্ছে অনেক স্থাপনা অবকাঠামো। অতিবর্ষণে প্লাবিত জেলাগুলোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বেশি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের বৃষ্টিপাতের তথ্য বিশ্নেষণ করে দেখা গেছে, জুলাই মাসে দেশে স্বাভাবিকের চেয়ে ১০ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। তবে আলাদা করে তুলে ধরলে ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় এই হার ২৪ শতাংশ এবং মেঘনায় ২০। কোনো কোনো স্থানে ১১৮ শতাংশ পর্যন্ত বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে এবার।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিছু এলাকায় অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হয়েছে। বিশেষ করে বন্যাপ্রবণ এলাকাগুলোকে এবার অতিবৃষ্টির চাপ সইতে হয়েছে। উজানের পাহাড়ি ঢলের স্রোত তো ছিলই, তার সঙ্গে চাপ বাড়িয়েছে অতিবৃষ্টি। ফলে এবার বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। গতকাল সোমবার দেড় মাস পার করেছে চলতি বন্যা। আগস্টের শুরু থেকে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা কমে আসায় বন্যার পানি দ্রুত সরছে। তবে মাসের শেষে আবারও বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্নিষ্টরা।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, জুলাই মাসে ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা এবং গঙ্গা অববাহিকায় অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হয়েছে। ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় ১৩টি স্টেশনের মধ্যে নয়টিতে, গঙ্গায় ১৮টির মধ্যে ছয়টিতে এবং মেঘনায় ১৭টির মধ্যে নয়টি স্টেশনে বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। অন্যদিকে, গঙ্গা অববাহিকায় স্বাভাবিকের চেয়ে ৩ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে ফরিদপুরে ৮১ এবং রাজশাহীতে ৬৫ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়েছে। উল্টো চিত্র দক্ষিণ-পূর্ব পাহাড়ি অববাহিকায়। সেখানে বৃষ্টিপাত কমেছে ১৪ শতাংশ। সামগ্রিকভাবে এ অববাহিকায় বৃষ্টিপাত প্রবণতা কমলেও টেকনাফে স্বাভাবিকের চেয়ে ১৮৭ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
বন্যা পরিস্থিতি বিশ্নেষণ করে দেখা যায়, সোমবার পর্যন্ত দেশের ৩৩টি জেলা বন্যাদুর্গত হয়েছে। পানিবন্দি পরিবারের সংখ্যাও পৌনে ১০ লাখ। ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ৫৫ লাখ মানুষ। এখনও ৪০ হাজারের বেশি মানুষ অবস্থান করছেন আশ্রয়কেন্দ্রে। ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় কুড়িগ্রাম, জামালপুর, গাইবান্ধা, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, টাঙ্গাইলসহ অন্তত নয়টি জেলা বন্যার সর্বোচ্চ শিকার। গঙ্গা অববাহিকায় অতিবৃষ্টির ফলে বন্যাদুর্গত হতে হয়েছে ফরিদপুর, শরীয়তপুর, চাঁদপুর, রাজবাড়ী, মাদারীপুর, মুন্সীগঞ্জসহ অন্তত আটটি জেলাকে। অন্যদিকে মেঘনা অববাহিকায় সুনামগঞ্জ, সিলেটসহ আটটি জেলা বন্যায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত।
ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার নদনদীতে দীর্ঘদিন ধরে পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে বইছে। একই অবস্থা মেঘনা অববাহিকার নদনদীগুলোরও। এ দুটি রুটে ভারতসহ উজানের দেশগুলোর বর্ষার পানি দেশে প্রবেশ করে। তার ওপর এ বছর সিলেট সীমান্তবর্তী ভারতীয় অঞ্চলে স্বাভাবিকের চেয়ে অন্তত ২৫ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে বলে ভারতীয় আবহাওয়া দপ্তরের খবর। অন্তত ১৫ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে জলপাইগুড়ি, গুয়াহাটীসহ দেশের উত্তরাঞ্চলের সীমান্তবর্তী ভারতীয় অঞ্চলে।
আবহাওয়াবিদ আফতাব উদ্দিন এ বিষয়ে সমকালকে বলেন, জুলাই মাসে যে পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে, এ বছর সামগ্রিকভাবে বেশি হয়েছে। উজানের পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে এবার অতিবর্ষণ যোগ হওয়ায় বন্যা-দুর্ভোগ বেড়েছে। আপাতত দু-একদিন বৃষ্টিপাতের প্রবণতা কমে এলেও ১৫ আগস্ট থেকে টানা চার দিন দেশে অতিবর্ষণের পূর্বাভাস রয়েছে। ফলে নিচু এলাকাগুলো ফের তলিয়ে যেতে পারে।
- বিষয় :
- বন্যা
- অতিবৃষ্টি
- ব্রহ্মপুত্র
- মেঘনা