ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্য সংকটে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ: আইইএ

মধ্যপ্রাচ্য সংকটে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ: আইইএ
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬ | ১৬:৪৫ | আপডেট: ২৩ জুলাই ২০২৬ | ১৬:৫৭

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তৈরি হওয়া অস্থিরতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ওপর উচ্চ নির্ভরশীলতা এবং জ্বালানির দামের ওঠানামার প্রতি অর্থনীতির সংবেদনশীলতার কারণে বাংলাদেশকে জ্বালানি সাশ্রয়ের পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে দেশের বিদ্যুৎ ব্যবহারের ওপর।

বৃহস্পতিবার প্রকাশিত আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ)-এর ইলেকট্রিসিটি মিড-ইয়ার আপডেট ২০২৬ প্রতিবেদনে এ মূল্যায়ন তুলে ধরা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মতো উদীয়মান অর্থনীতিগুলো এলএনজি আমদানির ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। হরমুজ প্রণালি দিয়ে এলএনজি পরিবহনে বিঘ্ন ঘটায় এসব দেশ সরাসরি সংকটে পড়েছে। জ্বালানির সরবরাহে অনিশ্চয়তা এবং উচ্চমূল্যের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় বেড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে জ্বালানি সাশ্রয়ের উদ্যোগ নেওয়ায় বিদ্যুৎ ব্যবহারও কমেছে।

আইইএর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ কয়েক মাস ধরে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে অস্থির করে রেখেছে। এর ফলে বাংলাদেশকে আগের তুলনায় বেশি দামে এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে। সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, এ পরিস্থিতির কারণে চলতি বছরও দেশের বিদ্যুতের চাহিদা চাপের মধ্যে থাকতে পারে।

অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে বিদ্যুতের চাহিদা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। শিল্প উৎপাদনের সম্প্রসারণ, বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বৃদ্ধি, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের চাহিদা এবং ডেটা সেন্টারের দ্রুত বিস্তার এ প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকা শক্তি।

আইইএর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্বে বিদ্যুতের চাহিদা ৩ দশমিক ৬ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ বাড়বে। ২০২৫ সালে এ প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ শতাংশ। এর ফলে ২০২৭ সালে বিশ্বে মোট বিদ্যুৎ ব্যবহার বেড়ে ৩০ হাজার ৭০০ টেরাওয়াট-ঘণ্টায় পৌঁছাবে, যা ২০২৫ সালে ছিল ২৮ হাজার ৬০০ টেরাওয়াট-ঘণ্টা।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে এলএনজি পরিবহনে বিঘ্ন ঘটার পর এশিয়া ও ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম ২০২২-২৩ সালের জ্বালানি সংকটের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় বেড়েছে এবং কয়েকটি দেশে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জরুরি ব্যবস্থা নিতে হয়েছে।

যদিও উত্তর আমেরিকা অতিরিক্ত এলএনজি সরবরাহ বাজারের চাপ কিছুটা কমিয়েছে, তবু গ্যাসের উচ্চমূল্যের কারণে এশিয়া ও ইউরোপের কয়েকটি দেশ আবারও বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার ব্যবহার বাড়িয়েছে বলে জানায় আইইএ।

তবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ অব্যাহত রয়েছে। সংস্থাটির পূর্বাভাস, ২০২৬ সালেই নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎসে পরিণত হবে। ২০২৫ সালে কয়লার সমপর্যায়ে পৌঁছানোর পর এবার তা কয়লাকে ছাড়িয়ে যাবে। চলতি বছর নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ৮ শতাংশের বেশি বাড়বে। ফলে বৈশ্বিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে এর অংশ ২০২৫ সালের ৩৩ শতাংশ থেকে ২০২৭ সালে ৩৭ শতাংশে উন্নীত হবে।

সবচেয়ে দ্রুত সম্প্রসারণ হবে সৌরবিদ্যুতের। আইইএ জানিয়েছে, ২০২৬ সালে সৌর ফটোভোলটাইক (পিভি) উৎপাদন বায়ু বিদ্যুৎকে ছাড়িয়ে জলবিদ্যুতের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎসে পরিণত হবে। চলতি বছর সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় ৬০০ টেরাওয়াট-ঘণ্টা বাড়বে, যা ২০২৫ সালের রেকর্ড প্রবৃদ্ধির সমান।

প্রধান অর্থনীতিগুলোর মধ্যে চলতি বছর চীনের বিদ্যুতের চাহিদা ৫ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ভারতের ৭ শতাংশ বাড়বে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আইইএ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে এ প্রবৃদ্ধি প্রায় ২ শতাংশ থাকবে।

তবে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মতো এলএনজি-নির্ভর দেশগুলোতে জ্বালানির উচ্চমূল্য ও সরবরাহ-সংকটের কারণে বিদ্যুৎ ব্যবহার চাপের মধ্যেই থাকবে বলে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে।

আইইএ আরও বলেছে, জলবায়ু পরিস্থিতির পরিবর্তন সংকটকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। বছরের শেষ দিকে প্রত্যাশার চেয়ে শক্তিশালী এল নিনো দেখা দিলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার বাড়বে। একই সময়ে কিছু অঞ্চলে জলবিদ্যুৎ ও বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যেতে পারে। এতে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা আবারও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়লেও ২০২৬ সালে বিশ্বব্যাপী বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ প্রায় ১ শতাংশ বাড়বে। তবে ২০২৭ সালে তা স্থিতিশীল হতে পারে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এলএনজি বাজারের অস্থিরতার প্রভাব পাইকারি বিদ্যুতের বাজারেও পড়েছে। চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাপানে স্পট মার্কেটে বিদ্যুতের গড় পাইকারি মূল্য আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে দাম প্রায় স্থিতিশীল থাকলেও ভারতে ১০ শতাংশের কম বৃদ্ধি পেয়েছে।

আইইএর মতে, বড় অর্থনীতিগুলো বিকল্প উৎস থেকে এলএনজি সংগ্রহ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়িয়ে পরিস্থিতি অনেকটাই সামাল দিতে সক্ষম হয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি।

আরও পড়ুন

×