ঢাকায় নগর সংলাপ
সব দলের নির্বাচনী ইশতেহারে নগর সরকার অন্তর্ভুক্তের দাবি
গুলশানের একটি হোটেলে নগর উন্নয়ন সাংবাদিক ফোরাম এবং গুলশান সোসাইটি যৌথভাবে সংলাপটির আয়োজন করে। ছবি-সংগৃহীত
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ | ২১:৫৪
ঢাকাসহ দেশের সব নগরের দুরবস্থার অন্যতম কারণ সমন্বয়হীনতা ও মেয়রের অপর্যাপ্ত ক্ষমতা। তাই নগর সরকার গঠন করে সিটি করপোরেশনকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে সমস্যা সমাধান করা সম্ভব বলে মত দিয়েছেন নগর বিশেষজ্ঞ, রাজনীতিবিদসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ। এই পটভূমিতে আসন্ন সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে নগর সরকার গঠন এবং সমস্যা সমাধানে সুস্পষ্ট রূপরেখা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
সোমবার গুলশানের একটি হোটেলে নগর উন্নয়ন সাংবাদিক ফোরাম এবং গুলশান সোসাইটির যৌথ আয়োজনে ‘ঢাকা বাঁচানোর ইশতেহার’ শীর্ষক নগর সংলাপে বক্তারা এসব দাবি জানান। নগর উন্নয়ন সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি মতিন আব্দুল্লাহর সভাপতিত্বে সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন গুলশান সোসাইটির সভাপতি ব্যারিস্টার সাদাত ওমর।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের ক্ষমতা মূলত ময়লা পরিষ্কার আর বাতি লাগানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ। নিজস্ব পুলিশ বাহিনী না থাকায় উচ্ছেদ অভিযান টেকসই করা যাচ্ছে না। ডিএনসিসি এলাকায় ট্রাফিক আইন ভঙ্গের জরিমানা বাবদ মাসে ১৯ থেকে ২২ কোটি টাকা আদায় হয়। এই জরিমানার এক টাকাও সিটি করপোরেশন পায় না। এই বিশাল অঙ্কের অর্থ সরাসরি কেন্দ্রীয় ট্রেজারিতে চলে যায়। অথচ ট্রাফিক সিগন্যাল ও অবকাঠামো উন্নয়নে সিটি করপোরেশনকে শত শত কোটি টাকা খরচ করতে হয়।’
তাঁর মতে, ওয়াসা, রাজউক এবং পুলিশকে সিটি করপোরেশনের অধীনে এনে একটি পূর্ণাঙ্গ সিটি গভর্নমেন্ট প্রতিষ্ঠা না করলে নগরের আমূল পরিবর্তন সম্ভব নয়।
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আব্দুস সালাম বলেন, বর্তমানে রাজউক, সিটি করপোরেশন এবং অন্য সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নেই। রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য গত সরকার ঢাকা সিটিকে দুই ভাগ করেছিল। ১৭ বছরে দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে একটি শক্তিশালী ও নির্বাচিত সরকার প্রয়োজন।
তিনি বলেন, সিটি গভর্নমেন্ট ছাড়া মেয়রের পক্ষে অনেক কাজই করা সম্ভব নয়। কারণ বর্তমানে মেয়রের হাতে এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পুলিশি ক্ষমতাও নেই। ঢাকার মেয়রকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে না রেখে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর নিয়ন্ত্রণাধীন শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে আসা উচিত, যাতে তিনি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন। ঢাকার উন্নয়নে বিএনপির ১০টি মূল লক্ষ্য তুলে ধরেন তিনি।
ঢাকা-১৭ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. এস এম খালেদুজ্জামান বলেন, এমন জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করবেন না, যে কথা রাখে না। বুড়িগঙ্গা নদী নিয়ে আমাদের বাপ-দাদারা স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু নানা অব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক ভুল সিদ্ধান্তের কারণে ঢাকা বসবাসের অযোগ্য শহরে পৌঁছেছে। আমরা ঢাকার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেব। নগরবাসীকে আমাদের পাশে চাই।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক ড. মুসলেহ উদ্দীন হাসান বলেন, বর্তমানে শহরগুলোকে নাগরিকদের পরিবর্তে ‘সিটিস ফর কংক্রিট অ্যান্ড কার’ (কংক্রিট এবং গাড়ির শহর) হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা যেখানে শিশুরা দিনের বেলায় পড়ার টেবিলে প্রাকৃতিক আলোতে পড়াশোনা করতে পারবে। ঢাকায় বর্তমানে গণপরিসরের সংকট দেখা দিচ্ছে; এমনকি তেঁতুলঝড়া মাঠ, পাগল মাঠ এবং বনানী লেকের মতো জায়গাগুলোও হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। এই সমস্যা সমাধানে কমিউনিটি এনগেজমেন্ট এবং পাবলিক পার্টিসিপেশন (জনগণের অংশগ্রহণ) অত্যন্ত জরুরি।
মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুর রব বলেন, দেশে দূষিত এলাকায় বাস করে চার কোটি মানুষ। এই দূষণ রোধে এলাকাভিত্তিক উন্নয়নে জোর দিতে হবে। নদী, খাল, জলাশয় ক্রমান্বয়ে দখলের কবজায় চলে গেছে। এগুলো উদ্ধারের উদ্যোগ নিতে হবে।
মূল প্রবন্ধে ব্যারিস্টার ওমর সাদাত বলেন, বায়ুদূষণে ঢাকার ৯৮ শতাংশ শিশুর রক্তে সিসা। শিকাগো ইউনিভার্সিটির এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউট প্রকাশিত সর্বশেষ এয়ার কোয়ালিটি লাইফ ইনডেক্স অনুযায়ী বায়ুদূষণের কারণে ঢাকার গড় আয়ু কমছে সাত বছর সাত মাস। আর সারাদেশের গড় আয়ু কমছে প্রায় পাঁচ বছর চার মাস। তাহলে গড় আয়ু ৭২ বছর হলে ঢাকায় থাকলে আমরা বাঁচি মাত্র ৬৫ বছর।
সংলাপে আরও বক্তব্য দেন জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার, জাতীয় নাগরিক পার্টির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদিব, স্থপতি রফিক আজম, প্রকৌশলী মো. নুরুল্লাহ, গুলশান সোসাইটির সহসভাপতি সৈয়দ আলমাস কবির, নগর উন্নয়ন সাংবাদিক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক হাসান ইমন প্রমুখ।
- বিষয় :
- নগর পরিকল্পনা
- সংলাপ
