পুষ্প
পারস্য সুন্দরী সাইক্লামেন
সাভারের একটি নার্সারিতে সাইক্লামেন ফুল। সম্প্রতি তোলা লেখক
মৃত্যুঞ্জয় রায়
প্রকাশ: ২২ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৮:৫৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
শীতের সকালে রোদের ছোঁয়া পাব বলে বেরিয়েছি প্রকৃতির কাছে। কিন্তু রোদ নেই, সকালেই আকাশটা ধূসর মেঘ-কুয়াশায় ঢাকা পড়েছে। ঠান্ডাটা কমেছে বটে, কিন্তু চারদিক কেমন যেন ঘোলাটে। কী আর করা! ভেবেছিলাম একটু দূরে যাব, মানিকগঞ্জে। বাসা থেকে বের হতেই দেরি হয়ে গেল। তাই সাভারে গেলাম।
একটা নার্সারি, কত যে তার গাছপালা! অদেখা অচেনা গাছও অনেক। ঘুরে ঘুরে গাছগুলো দেখছি, কোনো কোনো গাছের রূপে মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছি। একটা গাছ দেখে মনে হলো, কখনও তার সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। নাম তার সাইক্লামেন, এসেছে পারস্য থেকে। খুবই সুন্দরী। যেমন সুন্দর তার ফুল, তেমন সুন্দর তার পাতা!
১৬ জানুয়ারি ২০২৬, সাভার ব্যাংক টাউনে নেমে বরিশাল নার্সারির মধ্যে ঢুকে অনেক ছায়াতরুর দেখা পেলাম। একটা ছায়াঘরের মধ্যে গাছগুলো রাখা হয়েছে। ওপরে সবুজ নেটের ছাউনি, আংশিক আলো আসছে। সে আলোতেই গোলাপি জেমের মতো জ্বলজ্বল করছে একটা গাছের কয়েকটা ফুল। খুব ছোট সে গাছগুলো, গোড়ার দিকে মাটি ঢেকে ফেলেছে গোড়া থেকে ছড়িয়ে পড়া পাতাগুলো। এমন নকশাদার পাতা এর আগে কখনও চোখে পড়েনি। হৃদয়ের মতো আকারের পাতা, অনেকটা পানপাতার মতো। পাতার রং হালকা সবুজ। মনে হলো কোনো শিল্পী যেন পাতার ওপর রং দিয়ে আল্পনা এঁকে দিয়েছে। ভারী চমৎকার ও সুসামঞ্জস্যপূর্ণ সে নকশা।
পাতাগুলোর ফাঁক দিয়ে সরু নলাকার লম্বা তামাটে খয়েরি বোঁটার মাথায় ফুল ফুটে আছে, পাপড়িগুলো ঊর্ধ্বমুখী। ফুলগুলো দেখে খানিকটা টিউলিপ ফুলের মতো লাগছে, ফুলের কোনো ঘ্রাণ নেই, আছে অঢেল সৌন্দর্য। পাপড়ির রং ঘন ম্যাজেন্টা-বেগুনি, সবুজের জমিনে ফুলগুলোকে অসাধারণ লাগছে দেখতে। নার্সারির মালীরা বললেন, শীতেই এর ফুল ফোটে। ফুল ফুটতে থাকে মার্চ পর্যন্ত। গাছের নামটাও জানা গেল তাদের কাছ থেকে। কিন্তু কবে কোন দেশ থেকে এ দেশে এসেছে তা তাদের জানা নেই। তাদের ধারণা, গাছের চারাগুলো আনা হয়েছিল থাইল্যান্ড বা ভারত থেকে।
গাছটি সাইক্লামেন গণের, গোত্র প্রিমুলেসী। মাটির নিচে এ গাছে গোলাকার মোথা বা স্কন্ধের কারণে প্রাচীন লাতিন শব্দ cyclamenos থেকে এ গণের নামকরণ করা হয়েছে সাইক্লামেন। এ গণে সারাবিশ্বে প্রায় ২৫টি প্রজাতি রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে এটির প্রজাতি Cyclamen persicum, ইংরাজিতে এ গাছের নাম পার্সিয়ান সাইক্লামেন। সাইক্লামেন গণের গাছগুলোর সাধারণ নাম অবশ্য Sowbread বা Swinebread, তার মানে শূকরের রুটি। শূকররা এ গাছের মোথা খায় বলে এর এরূপ ইংরেজি নামকরণ।
এ গাছের আদি নিবাস দক্ষিণ-মধ্য তুরস্ক। সে দেশে সাধারণত পাথুরে পাহাড়ে এ গাছ জন্মে। তবে সেসব বুনো জাতের গাছ। বর্তমানে অনেক আকর্ষণীয় রঙের ফুলের ও চেহারার সুন্দর সুন্দর অনেক জাত উদ্ভাবিত হয়েছে। কয়েকটি জনপ্রিয় জাত হলো অ্যালিওস ভায়োলেট, হ্যালিওস হোয়াইট, লেজার রোজ, কনসার্টো অ্যাপোলো, সিয়েরা স্কারলেট, মিরাকল হোয়াইট ইত্যাদি।
সাইক্লামেন একটি স্কন্ধজাতীয় বীরুৎ প্রকৃতির বর্ষজীবী ছোট আকারের গাছ। গাছের গড় উচ্চতা ৩২ সেন্টিমিটার। মাটির নিচে থাকা অধিকাংশ গাছে শরৎকালে পাতা গজায়, শীতে ফুল ফোটে ও বসন্তে মরে যায়। পাতা হৃৎপিণ্ডাকার ও পুরু। মোথা মাটির নিচে সজীব ও গ্রীষ্মকালে সুপ্তাবস্থায় থাকে। মোথাই এ গাছের খাদ্যসঞ্চয়ক অঙ্গ বা খাদ্যভান্ডার। শিকড় বের হয় মোথার নিচ থেকে। মোথার ওপরে কেন্দ্রস্থল থেকে বের হয় কাষ্ঠল কাণ্ড। প্রতিটি কাণ্ডের শীর্ষে থাকে ফুল। জাতভেদে ফুলের রং ও পাপড়ির আকৃতি ভিন্ন হয়। এ প্রজাতির ফুলের পাপড়ির রং উজ্জ্বল ম্যাজেন্টা বা গাঢ় গোলাপি। বুনো আদি জাতের ফুলে মিষ্টি ঘ্রাণ ছিল, কিন্তু নতুন জাতগুলোর ফুলে ঘ্রাণ নেই। বাংলাদেশে একে নতুন বলেই মনে হচ্ছে। কেননা, দেশের উদ্ভিদ তালিকায় এর নাম নেই।
লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ
- বিষয় :
- ফুলচাষি
