টিভির লাইসেন্স বাতিল করতে পারবে সম্প্রচার কমিশন
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৮:৪৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
সম্প্রচার কমিশনের হাতে ডিজিটাল গণমাধ্যমের লাইসেন্স বাতিলের ক্ষমতা রেখে সম্প্রচার অধ্যাদেশের খসড়া প্রকাশ করেছে সরকার। এ অধ্যাদেশের মাধ্যমে একটি সম্প্রচার কমিশন গঠনের কথা বলা হয়েছে। কমিশনের নির্দেশনা অমান্য করলে বেসরকারি টেলিভিশন বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের লাইসেন্স বাতিল হতে পারে।
এ ধরনের বিধান রেখে গত মঙ্গলবার সম্প্রচার অধ্যাদেশের খসড়া ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেছে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়। আগামীকাল শনিবারের মধ্যে যে কেউ এ বিষয়ে ওয়েবসাইটে মতামত জানাতে পারবেন।
তবে এমন অধ্যাদেশের সমালোচনা করছেন সম্প্রচার ও গণমাধ্যমের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, গণমাধ্যমের অনেকে এটা জানেনও না। এমনকি সরকারের তরফে ওয়েবসাইটে দেওয়া ছাড়া কাউকে জানানোও হয়নি। এ অধ্যাদেশের মাধ্যমে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টারের (বিজেসি) সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস হোসেন সমকালকে বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন গঠন করল। তারা তৃণমূলের গণমাধ্যমকর্মীর সঙ্গে কথা বলে একটি প্রতিবেদন দিল। সেটা নিয়ে স্বয়ং প্রধান উপদেষ্টাও উৎসাহ দেখালেন। সেটা বাস্তবায়নের কোনো খবর দেখলাম না। হঠাৎ চার দিন সময় দিয়ে খসড়া ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হলো। আমরা গণমাধ্যম কমিশনের কাছে অনেক সুপারিশ দিয়েছিলাম। এর একটা ছিল এটাকে শিল্প হিসেবে ঘোষণা করা। সেটাও এখানে দেখছি না।
খসড়া অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, টেরিস্ট্রিয়াল টেলিভিশন, রেডিও, স্যাটেলাইট টেলিভিশন, কেবল টিভি, আইপি টিভি, আইপি রেডিও, ডিরেক্ট টু হোম (ডিটিএইচ), এফএম ও কমিউনিটি বেতার সম্প্রচার কার্যক্রম; ইনফোটেইনমেন্ট এবং এন্টারটেইনমেন্ট সংক্রান্ত ওটিটি, স্ট্রিমিং এবং ভিওডি সংক্রান্ত সম্প্রচার কার্যক্রম; পেশাদার এবং বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত অনলাইন ইনফোটেইনমেন্ট পোর্টাল, অ্যাপস বা ভিডিও স্ট্রিমিং কার্যক্রম এ অধ্যাদেশের অন্তর্ভুক্ত হবে। যারা এই সম্প্রচারের সঙ্গে যুক্ত থাকবেন তাদের একটি লাইসেন্স থাকতে হবে। তাদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য একটি সম্প্রচার কমিশন থাকবে। কমিশনের প্রধান হবেন চেয়ারম্যান, সঙ্গে থাকবেন চারজন সদস্য। সম্প্রচার কমিশন গঠনের জন্য এ অধ্যাদেশ জারির পর সরকার গেজেট প্রকাশ করবে। সম্প্রচার কমিশন নামে একটি কমিশন গঠনের জন্য একটি বাছাই কমিটি গঠন করা হবে। কমিটির প্রধান হবেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। সম্প্রচারে ১৫ বছর অভিজ্ঞতাসম্পন্ন দুজন থাকবেন সদস্য।
এ ছাড়া তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিব ও একজন অতিরিক্ত সচিব এ কমিটিতে যুক্ত থাকবেন। তারা কমিশনের চেয়ারম্যান ও চার কমিশনার নিয়োগের জন্য প্রতিটি পদের বিপরীতে দুজন ব্যক্তির নাম সুপারিশ করবেন। সরকার চূড়ান্ত করবে কমিশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের। তাদের মেয়াদ হবে চার বছর।
প্রয়োজনীয় কারিগরি অবকাঠামো স্থাপন, তরঙ্গ বরাদ্দ, ট্রান্সমিশন এবং নেটওয়ার্ক অপারেশন বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন অনুযায়ী বিটিআরসি নিয়ন্ত্রিত হবে এবং ওই নেটওয়ার্ক বা প্ল্যাটফর্মে প্রচারিত বিষয়বস্তু, সম্পাদকীয় মান এবং সম্প্রচার সংশ্লিষ্ট আচরণবিধি তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ করবে কমিশন।
এই অধ্যাদেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কমিশন সম্প্রচার নির্দেশিকা প্রণয়ন করবে। প্রদত্ত নির্দেশ প্রতিপালনে ব্যর্থ সম্প্রচারকারীর বিরুদ্ধে জরিমানা, সংশোধিত প্রচারের নির্দেশ, লাইসেন্স বাতিলসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবে কমিশন।
ডিজিটাল গণতন্ত্র বিশেষজ্ঞ এএইচএম বজলুর রহমান বলেন, সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এসব অধ্যাদেশ বাস্তবায়ন করবে কে? জনগণের মতামত গ্রহণের দ্রুততার বিষয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন উঠছে, কেন এত কম সময় নির্ধারণ করা হলো? আজকের ডিজিটাল যুগে সম্প্রচার খাত অনেক বড় একটি বিষয়। সম্প্রচার অধ্যাদেশ তৈরি করতে হলে এ খাতের উদীয়মান সমস্যাগুলোর বিষয়ও বিবেচনায় রাখতে হবে। তা না হলে আইনটি কার্যকর হবে না। এটা তৈরি করার সময় দেশের ডিজিটাল পরিবেশ এবং পুরো সম্প্রচার ও ডিজিটাল খাতের প্রয়োজনীয়তাগুলো গভীরভাবে বিবেচনা করতে হবে।
অধ্যাদেশের খসড়ার ২১ ধারায় অপরাধ ও দণ্ড বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে। কোনো সম্প্রচারকারী এ আইনের ধারা ১৩(১) ও ১৩(৯) লঙ্ঘন করে সম্প্রচার কার্যক্রম পরিচালনা করলে এ প্রচারের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেককে অনধিক তিন বছরের কারাদণ্ড অথবা কমপক্ষে ১০ লাখ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। কোনো সম্প্রচারকারী জাতীয় ইস্যুতে ও জনস্বার্থে সরকারের দেওয়া নির্দেশনা প্রতিপালনে ব্যর্থ হলে ব্যর্থতার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেককে অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা হবে।
খসড়ায় বলা হয়েছে, সম্প্রচার সংক্রান্ত অপরাধের বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল হবে, যেখানে ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলার নিষ্পত্তি করতে হবে। সম্প্রচারকদের জন্য বাধ্যতামূলক ‘আচরণবিধি’ থাকবে। নির্দেশ অমান্য করলে লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিলের ক্ষমতা থাকবে কমিশনের হাতে।
কমিশনের কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রতিবছর ১ মার্চের মধ্যে পূর্ববর্তী বছরের বিস্তারিত কার্যক্রম সম্পর্কে সরকারের কাছে একটি বার্ষিক প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে। প্রতিবেদনটি পাওয়ার পর সরকার তা উপদেষ্টা পরিষদ বা মন্ত্রিপরিষদের সভায় উপস্থাপনের ব্যবস্থা নেবে।
কমিশনের সিদ্ধান্ত বা নির্দেশনায় কোনো সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠান সংক্ষুব্ধ হলে বিধি অনুযায়ী সরকারের কাছে আপিল করার সুযোগ থাকবে। তবে এই আপিলের বিপরীতে সরকারের দেওয়া সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।
বিশেষ প্রয়োজনে বা জনস্বার্থে কোনো জরুরি তথ্য প্রচারের ক্ষেত্রে কমিশন সম্প্রচারকারীদের সরাসরি নির্দেশনা দিতে পারবে। এ নির্দেশনা পালন করা সব সম্প্রচারকারীর জন্য বাধ্যতামূলক।
মাছরাঙা টেলিভিশনোর প্রধান সম্পাদক রেজোয়ানুল হক বলেন, খসড়া অধ্যাদেশে জনস্বার্থবিরোধী, বিদ্বেষমূলক এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকির মতো অস্পষ্ট শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। যে কারণে যে কোনো সমালোচনামূলক বিষয়কে সহজেই অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। টেলিভিশন-রেডিওর লাইসেন্স স্থগিত ও বাতিলের ধারাগুলো এমনভাবে তৈরি করা, তাতে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তেই কোনো গণমাধ্যম বন্ধ করে দেওয়া যাবে।
জাতীয় ইস্যু ও জনস্বার্থে সরকারের নির্দেশনা মানতে ব্যর্থ হলে সম্প্রচার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে, যে বিধানের অপপ্রয়োগের শঙ্কা আছে। খসড়া অধ্যাদেশের আরও বেশ কয়েকটি ধারায় এমন কিছু বিধান প্রস্তাব করা হয়েছে যেখানে সরকার এবং আমলাতন্ত্রকে সম্প্রচার গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ এবং শাসন করার সুযোগ রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, সাংবাদিকদের বেতন-ভাতা, নায্য সুযোগ-সুবিধা, বঞ্চনার প্রতিকার আমরা সব সময় চেয়ে এসেছি। এই খসড়ায় এর কোনো উল্লেখ নেই। এই আইনটি করার দায়িত্ব নির্বাচিত সরকারের জন্যই রেখে দেওয়া সংগত।
ইংরেজি দৈনিক টাইমস অব বাংলাদেশ-এর এডিটর স্পেশাল অ্যাফেয়ার্স এম আবুল কালাম আজাদ বলেন, এটা তাড়াহুড়ো করে করা হয়েছে। এখানেই সবচেয়ে বড় সন্দেহ। মনে হয়েছে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণের সুযোগ আছে, যা সংবিধানের ৩৯ অনু্চ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
- বিষয় :
- টিভি সম্প্রচার
