ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

শিল্পের আলো অন্ধকারের কাছে যেন হার না মানে

নতুন সরকারের কাছে সাংস্কৃতিক যোদ্ধাদের প্রত্যাশা

শিল্পের আলো অন্ধকারের কাছে যেন হার না মানে
×

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় নবনিযুক্ত মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথবাক্য পাঠ করান। ছবি: পিআইডি

দ্রোহী তারা

প্রকাশ: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৮:২১ | আপডেট: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১৩:৫২

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেড় দশকের বেশি সময় ধরে চলা স্বৈরাচারী শাসনের পর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল মুক্ত পরিবেশ ও বাকস্বাধীনতার। তবে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে কালো ছায়া ঘনীভূত হয়েছে। শিল্পীরা বলছেন, ভাস্কর্য ভাঙচুর, নাটকের মঞ্চে অতর্কিত হানা, বাউল-সাধকদের ওপর বর্বরতা এবং ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা নতুন ধরনের উগ্রতাকে সামনে এনেছে। এই ‘অন্ধকার সময়কে’ পেছনে ফেলে শিল্পের আলোয় নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যাশা নিয়ে নতুন সরকারের দিকে তাকিয়ে আছে দেশের মানুষ।

হাজার বছরের অসাম্প্রদায়িক চেতনার ধারক বাউল ও সাধকদের ওপর শারীরিক ও মানসিক আঘাত স্তম্ভিত করেছে দেশের মানুষকে। বিভিন্ন প্রান্তে বাউলদের আখড়া ভাঙচুর করা হয়েছে, জোরপূর্বক তাদের কেশ কর্তন করা হয়েছে এবং গানবাজনাকে ‘নিষিদ্ধ’ করার মতো ফতোয়া দেওয়া হয়েছে।

গবেষক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মফিদুল হক এ পরিস্থিতিকে ‘ভয়াবহ’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, বিগত সময়ে সংস্কৃতি চর্চা কেবল রুদ্ধই হয়নি, শিল্পীদের ওপর প্রত্যক্ষ আঘাত এসেছে। তথাকথিত ধর্মান্ধ গোষ্ঠী বাউলদের গানের বিকৃত ব্যাখ্যা দিয়ে মানুষকে খেপিয়ে তুলেছে এবং প্রশাসনকে ব্যবহার করে শিল্পীদের কারারুদ্ধ করেছে। তারা চেয়েছিল সমাজ থেকে বৈচিত্র্য মুছে ফেলতে।

মফিদুল হক মনে করেন, জাতীয় নির্বাচনে জনগণ এই উগ্রতাকে প্রত্যাখ্যান করে সুস্পষ্ট রায় দিয়েছে। নতুন সরকারের কাছে তাঁর দাবি, বিগত সময়ে সংস্কৃতির ওপর হামলার একটি সঠিক ‘তথ্যপঞ্জি’ বা ডেটাবেজ তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি সংস্কৃতি খাতের বরাদ্দ বর্তমানের তুলনায় ২০ থেকে ৩০ গুণ বাড়িয়ে এ খাতে স্থবিরতা কাটানো প্রয়োজন।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সাংস্কৃতিক যোদ্ধাদের প্রতিবাদের যে ভাষা দেখা গিয়েছিল, পরে তা ‘মব সন্ত্রাসের’ মেঘে ঢাকা পড়ে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ঠিক পরমুহূর্তেই প্রথম আঘাতটি আসে দৃশ্যকলার (ভিজ্যুয়াল আর্ট) ওপর। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের আগে ও পরে রাজধানীসহ জেলা শহরগুলোতে একের পর এক ভাস্কর্য ধূলিসাৎ করা হয়। এর মধ্যে ছিল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের প্রতিকৃতি এবং একাত্তরের মহান বিজয়ের স্মারক।

২০২৪ সালের নভেম্বরে শিল্পকলা একাডেমিতে ‘নিত্যপুরাণ’ নাটকের প্রদর্শনী চলাকালে একদল উত্তেজিত জনতার চাপে নাটক বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনাটি ছিল নাট্যকর্মীদের জন্য চরম অপমানের। নাট্য নির্দেশক মাসুম রেজা এটিকে নজিরবিহীন বলে উল্লেখ করেন। তবে তিনি রাষ্ট্রের চেয়ে শিল্পীদের নিজস্ব সাংগঠনিক শক্তির ওপর বেশি আস্থা রাখেন। মাসুম রেজা বলেন, শিল্পকলা একাডেমি গত ১৮ মাসে নিজেদের দায়িত্ব পালনে চরমভাবে ব্যর্থ। সেখানে এক ধরনের স্বেচ্ছাচারিতা দেখা গেছে। 

গত বছরের শেষ দিকে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কার্যালয়ে আগুন এবং ছায়ানট ঘিরে বিদ্বেষমূলক প্রচারণা ও ভাঙচুরের ঘটনা সংস্কৃতি বোদ্ধাদের চিন্তিত করে তুলেছে। উদীচীর সাধারণ সম্পাদক অমিত রঞ্জন দে’র চাওয়া মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা উন্মুক্ত হোক। অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মনোজাগতিক পরিবর্তনও জরুরি বলে তিনি মনে করেন। সেই পরিবর্তনের প্রধান ‘হাতিয়ার’ হলো সংস্কৃতি। 

নির্বাচিত সরকার দেশের দায়িত্ব নেওয়ায় সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষদের চাওয়া- আবারও নাটক, গান আর শিল্প প্রদর্শনীতে মুখর হবে দেশের প্রতিটি প্রান্তর। চিত্রশিল্পী আবদুস শাকুরের প্রত্যাশা নতুন প্রধানমন্ত্রী উদার ও মুক্তমনা মানুষ হিসেবে দেশে প্রকৃত গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখবেন। আর তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি চিত্রশিল্পী শাহনাজ জাহান বলছেন, শিল্পীরা যেন নির্ভয়ে ছবি আঁকতে পারেন, গান গাইতে পারেন। রাষ্ট্রের কাজ কেবল সেই পরিবেশটুকু নিশ্চিত করা। 

‘আমরা এক অবরুদ্ধ ভয়ের সংস্কৃতির মধ্যে ছিলাম।’- বিগত দিনের ঘটনাগুলো স্মরণ করে এ কথা বলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ডিন রশীদ আমিন। এখন তিনি আশা করছেন, নতুন সরকারের আমলে চারুকলা, নাটক বা সংগীতের মতো বিভাগগুলো যে সংশয়ের মধ্যে পড়েছিল, তা কেটে যাবে। ছাত্রছাত্রীরা আবার স্বতঃস্ফূর্তভাবে শিল্পচর্চায় ফিরতে পারবে।

আরও পড়ুন

×