সরকারি ব্যয়ের ৫৮ শতাংশই বেতন, সুদ ও ভর্তুকিতে
জাতীয় বাজেটের হালনাগাদ চিত্র
মেসবাহুল হক
প্রকাশ: ০৪ মার্চ ২০২৬ | ০৮:২৮ | আপডেট: ০৪ মার্চ ২০২৬ | ০৮:৪৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) পরিচালন ও উন্নয়ন বাজেট মিলিয়ে মোট ব্যয় হয়েছে দুই লাখ ৫৮ হাজার ১৮৬ কোটি টাকা।
এর মধ্যে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, অবসরপ্রাপ্তদের পেনশন, বিভিন্ন ভর্তুকি এবং ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হয়েছে এক লাখ ৫০ হাজার ৫৩৬ কোটি টাকা, যা মোট ব্যয়ের ৫৮ শতাংশের বেশি।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব তথ্য রয়েছে। নির্বাচিত সরকারকে অর্থবছরের বাকি সময়ে এই হিসাবের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অর্থবছরের ছয় মাসে সার্বিক বাজেট বাস্তবায়ন দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৬৮ শতাংশে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ হার ছিল প্রায় ২৮ শতাংশ। বাজেট বাস্তবায়নের হার বেড়েছে পরিচালন ব্যয়ের কারণে। উন্নয়ন ব্যয়ের হার খুবই কম।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গত অন্তর্বর্তী সরকার সাত লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের বাজেট ঘোষণা করে। বাজেটের দুটি অংশ— পরিচালন ও উন্নয়ন। প্রথম ছয় মাসে পরিচালন খাতে ব্যয় হয়েছে দুই লাখ ২০ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা, যা মোট ব্যয়ের ৮৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ এবং এ খাতে বরাদ্দের ৪১ দশমিক ১৮ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে পরিচালন ব্যয় ছিল এক লাখ ৮৭ হাজার ৯৯৯ কোটি টাকা। মোট ব্যয়ের মধ্যে যা ছিল ৮৩ শতাংশ এবং ছয় মাসে বাস্তবায়ন হার ছিল ৩৭ শতাংশ। চলতি বাজেটে পরিচালন খাতে মোট বরাদ্দ রয়েছে পাঁচ লাখ ৩৫ হাজার ৩১৭ কোটি টাকা।
উন্নয়ন খাতে ছয় মাসে ব্যয় হয়েছে ৩১ হাজার ৮৪১ কোটি টাকা, যা মোট ব্যয়ের ১২ দশমিক ৩৩ শতাংশ। এ খাতে মোট বরাদ্দ রয়েছে দুই লাখ ৪৫ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে উন্নয়ন ব্যয় ছিল ৩৯ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা, যা মোট ব্যয়ের ১৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ। অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের কারণে প্রকল্প স্থগিত, পুনর্মূল্যায়ন ও ব্যয় সাশ্রয়ী পদক্ষেপসহ নানা কারণে উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানো সম্ভব হয়নি।
দেশে বাজেটের আকার প্রতিবছরই বাড়ে। কিন্তু ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে আগের অর্থবছরের সাত হাজার কোটি টাকা কমিয়ে চলতি অর্থবছরে বাজেট ঘোষণা করা হয়। সরকারি ব্যয়ে লাগাম টানতে ব্যয় সাশ্রয়ী নির্দেশনা দিয়ে একাধিক প্রজ্ঞাপনও জারি করে অর্থ মন্ত্রণালয়। এ সত্ত্বেও পরিচালন বাজেটের আওতায় ধারাবাহিকভাবে ব্যয় বেড়েছে। সরকারের ব্যয়ে লাগাম টানা সম্ভব হয়নি।
রাজস্ব আয় ও পরিচালন ব্যয় প্রায় সমান
অন্তর্বর্তী সরকার বাজেট সংশোধন করে যা ১ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হয়েছে। পরিচালন ব্যয়ের চাপ বাড়ায় সংশোধিত বাজেটে কাটছাঁট হয়েছে মাত্র দুই হাজার কোটি টাকা। উন্নয়ন খাত থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে পরিচালন খাতে ২৮ হাজার কোটি টাকা পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বেতন-ভাতা বাবদ অতিরিক্ত ২২ হাজার কোটি টাকা রাখা হয়েছে। জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে পরিচালন ব্যয় দুই লাখ ২০ হাজার ৪৬১ কোটি টাকার বিপরীতে মোট রাজস্ব আয় হয়েছে দুই লাখ ২১ হাজার ৫৯১ কোটি টাকা।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে সাত লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকার বাজেটের বিপরীতে মোট ব্যয় দাঁড়ায় ছয় লাখ ২৮ হাজার ৫৪৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে পরিচালন ব্যয় ছিল চার লাখ ৭৪ হাজার ১৪৩ কোটি টাকা। অনুদানসহ মোট রাজস্ব আদায় হয় চার লাখ ৪৩ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা। ফলে রাজস্ব আয়ের তুলনায় পরিচালন ব্যয় প্রায় সাড়ে ৩৫ হাজার কোটি টাকা বেশি ছিল। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে রাজস্ব ও পরিচালন ব্যয় প্রায় সমান থাকলেও নব্বইয়ের দশকের পর এমন বড় ঘাটতি আর দেখা যায়নি।
বাজেট ঘাটতি ৩৬ হাজার কোটি টাকা
অর্থ বিভাগ সম্প্রতি সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে চিঠি দিয়ে বাজেট বাস্তবায়নে আরও মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, সরকারি আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য নেই। রাজস্ব আহরণ ও ব্যয়ে সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাবে আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না এবং সরকারকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিতে হচ্ছে, যার জন্য বড় অঙ্কের সুদ পরিশোধ করতে হয়।
বাস্তব চিত্রেও এর প্রতিফলন রয়েছে। ছয় মাসে মোট ব্যয় দুই লাখ ৫৮ হাজার ১৮৬ কোটি টাকার বিপরীতে রাজস্ব এসেছে দুই লাখ ২১ হাজার ৫৯১ কোটি টাকা। বাজেট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৬ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা। এ ঘাটতি মেটাতে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ নিতে হয়েছে।
জুলাই-জানুয়ারি সময়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল দুই লাখ ৮৩ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা। আদায় হয়েছে দুই লাখ ২৩ হাজার ৬৩৮ কোটি টাকা। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আদায় ৬০ হাজার ১১৩ কোটি টাকা কম। এনবিআরবহির্ভূত রাজস্ব থেকেও আশানুরূপ সাড়া মেলেনি। এ খাত থেকে ছয় মাসে আয় হয়েছে মাত্র ৩৮ হাজার কোটি টাকা।
কম রাজস্ব আদায়কে অর্থনীতির বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে বিদায়ী অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ উত্তরাধিকার নোটে নতুন অর্থমন্ত্রীর প্রতি কর আদায় বাড়ানোর ওপর অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
সুদ পরিশোধেই ব্যয়ের ২৬ শতাংশ
ঋণের সুদ পরিশোধ বাজেটের একক বড় খাত হিসেবে দাঁড়িয়েছে। প্রথম ছয় মাসে মোট ব্যয়ের প্রায় ২৬ শতাংশ অর্থাৎ ৬৬ হাজার ২৪৪ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধে। এর মধ্যে দেশীয় ঋণের সুদে ৫৬ হাজার ৩১৭ কোটি টাকা এবং বিদেশি ঋণের সুদে ৯ হাজার ৯২৭ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে সুদ পরিশোধে ব্যয় ছিল ৬৪ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা।
আয়-ব্যয়ের ঘাটতি মেটাতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের পুরো সময় এবং চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাস মিলিয়ে ১৫ মাসে প্রায় দুই লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে। অর্থ বিভাগের সর্বশেষ ঋণ বুলেটিন অনুযায়ী, গত ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশি-বিদেশি মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ ৪৯ হাজার ৪৪ কোটি টাকা।
পরিচালন খাতের বড় ব্যয়ের মধ্যে রয়েছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা। এই খাতে ছয় মাসে ব্যয় হয়েছে ৩৪ হাজার ৬৪ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৩১ হাজার ৭৫২ কোটি টাকা। অবসরপ্রাপ্তদের পেনশনে ব্যয় হয়েছে ১৩ হাজার ৬১ কোটি টাকা। জ্বালানি, সারসহ বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি বাবদ ব্যয় হয়েছে ৩৭ হাজার ১৬৩ কোটি টাকা।
পরিস্থিতি উত্তরণে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ সমকালকে বলেন, সাধারণত রাজস্ব আয় দিয়ে পরিচালন ব্যয় মেটানো হয় এবং সেখান থেকে কিছু অর্থ উন্নয়ন ব্যয়েও ব্যবহার করা হয়। কিন্তু বর্তমানে রাজস্ব আয় দিয়ে পরিচালন ব্যয়ই ঠিকমতো মেটানো যাচ্ছে না, যা উদ্বেগজনক। নব্বইয়ের দশকের পর এমন পরিস্থিতি দেখা যায়নি। তাঁর মতে, সংশোধিত বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় কমিয়ে পরিচালন ব্যয় বাড়ানো যৌক্তিক নয়। পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করে উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানো এবং একই সঙ্গে রাজস্ব আয় বৃদ্ধির কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া উচিত। উন্নয়ন ব্যয় না বাড়লে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে না এবং নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সম্প্রতি এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম আয়োজিত ‘নতুন সরকারের সূচনাবিন্দু: অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে বলা হয়, নতুন সরকার বড় এক অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে দায়িত্ব নিয়েছে। বর্তমানে তিনটি প্রধান চ্যালেঞ্জ রয়েছে—সমষ্টিগত অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা দুর্বল, ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান অনিশ্চিত এবং সরকারের আর্থিক সক্ষমতা সীমিত। সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত বাজেট সংশোধন করে একটি বাস্তবসম্মত অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি করা। এরপর আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনায় ধাপে ধাপে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দিকে এগোতে হবে।
- বিষয় :
- বাজেট
- সরকার
- ব্যয় পরিশোধ
