ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

১৭ মার্চ থেকে বিশেষ লঞ্চ সার্ভিস

নৌপথে ঈদযাত্রায় বাধা হতে পারে তেল সংকট

ডিজেলের চাহিদা আড়াই লাখ লিটার, সরবরাহ ৭০ হাজার

নৌপথে ঈদযাত্রায় বাধা হতে পারে তেল সংকট
×

রাজধানীর পেট্রোল পাম্পগুলোয় গতকাল বৃহস্পতিবারও জ্বালানির জন্য দেখা গেছে গাড়ি ও মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি। অনেক পাম্পে পেট্রোল ও অকটেনের সরবরাহ বন্ধ থাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে গ্রাহকদের। আরামবাগ পেট্রোল পাম্প থেকে তোলা - সমকাল

অমরেশ রায় 

প্রকাশ: ১৩ মার্চ ২০২৬ | ০৮:০৯ | আপডেট: ১৩ মার্চ ২০২৬ | ১০:৫১

| প্রিন্ট সংস্করণ

পদ্মা সেতু নির্মাণসহ সড়কপথে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের কারণে এমনিতেই সব সময় নৌপথে যাত্রী খরা চলে। তবে দুই ঈদে ঘরমুখী যাত্রীর চাপ বাড়লে সেই ক্ষতি কিছুটা পোষানোর চেষ্টা করেন যাত্রীবাহী লঞ্চের মালিকরা। তবে এবার মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি তেলের চরম সংকট দেখা দেওয়ায় আসছে ঈদে নৌপথে লঞ্চ চলাচল স্বাভাবিক রাখা নিয়েই শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে নৌপথে ঈদযাত্রার সরকারি প্রস্তুতি জোরেশোরে চলছে। নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় এবং এর অধীন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) নিয়েছে নানা উদ্যোগ। আগামী ১৭ মার্চ থেকে শুরু হচ্ছে বিশেষ লঞ্চ সার্ভিস। ঈদের আগের দিন পর্যন্ত ৯টি লঞ্চ ও একটি স্টিমার দিয়ে চলবে এই বিশেষ সার্ভিস। 

এদিকে, ঈদে ঘরমুখো যাত্রীদের আনা-নেওয়া ও ঢাকার সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালের ওপর চাপ কমাতে এবার দুটি নতুন ঘাট তৈরি করেছে বিআইডব্লিউটিএ। ঢাকার মোহাম্মদপুরের বছিলায় একটি লঞ্চঘাট এবং নারায়ণগঞ্জের পূর্বাচল কাঞ্চন ব্রিজ-সংলগ্ন শিমুলিয়ায় একটি ট্যুরিস্ট ঘাট তৈরি করা হয়েছে। এই দুটি ঘাট দিয়ে আশপাশের এলাকার যাত্রী বহন করে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া হবে।

বছিলা লঞ্চঘাট থেকে যাত্রীরা সদরঘাট হয়ে গন্তব্যে পৌঁছাবেন। আর কাঞ্চন, পূর্বাচল ও ৩০০ ফুটসহ আশপাশের এলাকার যাত্রীরা শিমুলিয়া টুরিস্ট ঘাট থেকে লঞ্চে উঠে গন্তব্যে চলে যাবেন। তাদের উল্টোপথে সদরঘাট আসতে হবে না। ফলে বরাবরের মতো এবার ঈদে পুরোনো ঢাকার সদরঘাটমুখী সড়কে প্রচণ্ড যানজট কিছুটা হলেও কমবে। যাত্রীর চাহিদা থাকলে ঈদের পরও এই দুটি ঘাট চালু রাখা হবে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।         

ঈদযাত্রায় বাধা তেল সংকট 
লঞ্চ মালিকরা জানান, ঢাকা নদীবন্দরের সদরঘাট টার্মিনাল থেকে দেশের ৩৮ নৌপথে যাওয়া-আসা মিলিয়ে নিয়মিত ৮৫টির মতো লঞ্চ চলাচল করে। তবে ঈদ উপলক্ষে লঞ্চ দ্বিগুণ বাড়ানো হয়েছে। ঈদের আগে-পরের প্রায় ১৫ দিন ছোট-বড় মিলিয়ে ১৭০টি লঞ্চ যাতায়াত করবে। ১৭ মার্চ থেকে ঈদের আগের দিন পর্যন্ত চলবে ঈদযাত্রা। আর ২৭ মার্চ থেকে শুরু হবে ফিরতি যাত্রা, চলবে পরের পাঁচ দিন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে দেশে জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দেওয়ায় এর প্রভাব নৌপথেও পড়েছে। সদরঘাট থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ৩৮ রুটে চলাচলকারী যাত্রীবাহী লঞ্চের জন্য স্বাভাবিক সময় প্রতিদিন ডিজেলের চাহিদা রয়েছে আড়াই লাখ লিটার। সেখানে এখন পেট্রোবাংলার ডিপো থেকে প্রতিদিন ৬০ থেকে ৭০ হাজার লিটারের বেশি ডিজেল সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। ঈদের সময় তেলের এই চাহিদা দ্বিগুণ বাড়বে। ফলে ঈদের আগে তেল সংকট না কাটলে নৌপথে ঈদযাত্রা চালু রাখা যাবে কিনা, সেটা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।        

অভ্যন্তরীণ লঞ্চ মালিক সমিতির মহাসচিব সিদ্দিকুর রহমান পাটোয়ারী সমকালকে বলেন, পদ্মা সেতু নির্মাণ ও সড়ক যোগাযোগ খাতে ইতিবাচক পরিবর্তনের ফলে এমনিতেই নৌপথের যাত্রী সংখ্যা অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। ঈদের সময় যাত্রী কিছুটা বাড়ে। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে চাহিদা অনুযায়ী তেল না পাওয়ায় ঈদযাত্রা স্বাভাবিক রাখা যাবে কিনা, সেটা নিয়ে সংশয়ে আছি।

অবশ্য বরাবরের মতো এবারের ঈদেও নৌপথে বাড়তি ভাড়া নেওয়া হবে না বলে জানান সিদ্দিকুর রহমান পাটোয়ারী। তিনি বলেন, শত সমস্যার মধ্যেও লঞ্চ মালিকরা অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করবে না। নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়সহ সরকারি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সাম্প্রতিক ঈদযাত্রার প্রস্তুতি বৈঠকেও এমন আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।  

বিশেষ লঞ্চ ও স্টিমার সার্ভিস
সংশ্লিষ্টরা জানান, বিশেষ ব্যবস্থায় ঢাকার বছিলা লঞ্চঘাট এবং শিমুলিয়া ট্যুরিস্ট ঘাট থেকে নির্ধারিত বিভিন্ন রুটে লঞ্চ ও স্টিমার সার্ভিস চালু থাকবে। এ ব্যবস্থার আওতায় ঢাকার বছিলা ঘাট থেকে ছয়টি বিশেষ লঞ্চ বছিলা-সদরঘাট-মুন্সীগঞ্জ-চাঁদপুর-ঈদগা ফেরিঘাট হয়ে শরীয়তপুর-ইলিশা-হাকিমুদ্দিন-গলাচিপা নৌরুটে যাত্রী পরিবহন করবে। আর কাঞ্চন ব্রিজ-সংলগ্ন শিমুলিয়া ট্যুরিস্ট ঘাট থেকে তিনটি বিশেষ লঞ্চে শিমুলিয়া-ডেমরা-নারায়ণগঞ্জ-চাঁদপুর কালীগঞ্জ-হিজলা-বরিশাল নৌরুটে নৌযান চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ ছাড়া বিআইডব্লিউটিসির স্টিমার পিএস মাসউদ এই বিশেষ সার্ভিসে যুক্ত থাকবে।  

অন্যান্য উদ্যোগ
নৌপথে ঈদযাত্রা নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন রাখতে আরও কিছু উদ্যোগ নিয়েছে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়। এবার প্রথমবারের মতো সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে যাত্রীর মালপত্র পরিবহনের জন্য কুলি সার্ভিস সম্পূর্ণ ফ্রি করে দিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ। অসুস্থ, বৃদ্ধ ও চলাচলে অক্ষম যাত্রীকে টার্মিনাল থেকে লঞ্চে পৌঁছে দেওয়া হবে। লঞ্চ ও ফেরিঘাট থেকে দেশের অভ্যন্তরে যাত্রীদের যাতায়াত সহজ করতে বিআরটিসির পর্যাপ্ত ফিডার বাস সার্ভিস চালু করা হবে।

এ ছাড়া লঞ্চে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, যাত্রী ও মালপত্র বহন বন্ধ এবং লঞ্চের ছাদে যাত্রী ওঠানো নিষিদ্ধ করাসহ বরাবরের মতো কিছু নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে। লঞ্চের ডেকের যাত্রীর জন্য সরকার নির্ধারিত ভাড়ার ১০ শতাংশ কম নিতে সম্মত হয়েছেন মালিকরা। ১৫ রমজান থেকে ঈদের পর তৃতীয় দিন পর্যন্ত ঢাকার জিরো পয়েন্ট থেকে সদরঘাট পর্যন্ত সড়ক যানজটমুক্ত রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর ব্যবস্থা নিয়েছে। আর নৌপথে চলাচলকারী যাত্রীদের জরুরি প্রয়োজন ও সেবা-সংক্রান্ত বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএর হটলাইন নম্বরে (১৬১১৩) যোগাযোগ করতে অনুরোধ করা হয়েছে।

বিআইডব্লিউটিএর ঢাকা নদীবন্দরের যুগ্ম পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মোবারক হোসেন মজমুদার বলেন, বরাবরের মতো এবারও নৌপথে ঈদযাত্রা নিরাপদ করতে নানামুখী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। যাত্রীদের সার্বিক নিরাপত্তা রক্ষা করেই সুষ্ঠুভাবে এই ঈদযাত্রা সম্পন্ন করা যাবে বলে আমরা আশাবাদী। 

আরও পড়ুন

×