ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ঔষধ প্রশাসন

অবৈধভাবে দেশে আসছে পুষ্টি-পরিপূরক

অবৈধভাবে দেশে আসছে পুষ্টি-পরিপূরক
×

ফাইল ছবি

 তবিবুর রহমান

প্রকাশ: ১৪ মার্চ ২০২৬ | ০৮:৩৩ | আপডেট: ১৪ মার্চ ২০২৬ | ০৮:৪৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

ডায়েটারি ও হারবাল সাপ্লিমেন্ট বা পুষ্টি পরিপূরককে ওষুধ হিসেবে গণ্য করে নিবন্ধন ছাড়া আমদানি ও বিক্রি নিষিদ্ধ করেছে সরকার। কিন্তু সেই নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের কারসাজিতে অনুমোদনহীন পুষ্টি পরিপূরক দেশে ঢুকছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

নিয়ম অনুযায়ী, জরুরি পরিস্থিতি ছাড়া এসব সাপ্লিমেন্ট আমদানির জন্য কোনো ছাড়পত্র (এনওসি) দেওয়ার বিধান নেই। তবে নিয়ম ভেঙে অন্তত দুটি প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে কিছু নথি সমকালের হাতে এসেছে। 

গত ২৪ ডিসেম্বর ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, ঔষধ ও কসমেটিকস আইন-২০২৩ অনুযায়ী ডায়েটারি সাপ্লিমেন্ট, হারবাল সাপ্লিমেন্ট, নিউট্রিশনাল সাপ্লিমেন্ট, মেডিকেল বা থেরাপিউটিক নিউট্রিশন এবং খাদ্যপথ্যজাত পণ্য নিবন্ধন ছাড়া আমদানি, উৎপাদন, মজুত, বিপণন বা প্রদর্শন করা যাবে না। এসব পণ্য এখন আইনের চোখে ‘ওষুধ’ হিসেবে বিবেচিত হবে এবং আইন লঙ্ঘন করলে তা দণ্ডনীয় অপরাধ। তবে আইন কার্যকর হলেও গত তিন বছরেও এসব পণ্যের জন্য প্রয়োজনীয় বিধিমালা প্রস্তুত করতে পারেনি ঔষধ প্রশাসন। ফলে নিবন্ধন ছাড়া এসব পুষ্টি পরিপূরক আমদানি কার্যত অবৈধ।

তবে ওই বিজ্ঞপ্তি জারির পর ৬ জানুয়ারি বায়োসাইট হেলথকেয়ার লিমিটেডকে ১৯ হাজার ৭২৭ পিস পুষ্টি পরিপূরক আমদানির ছাড়পত্র দেওয়া হয়। এসব পণ্য ভারত থেকে আনা হচ্ছে। অনুমোদিত পণ্যগুলোর মধ্যে বিভিন্ন ধরনের প্রোটিন ও পুষ্টি সম্পূরক পণ্য রয়েছে। এসব পুষ্টি সম্পূরক পণ্য বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে বিক্রি, বিতরণ বা সরবরাহ করা যাবে না। তবে এভারকেয়ার, আসগর আলী, ইউনাইটেড, স্কয়ার, ল্যাবএইড হাসপাতাল ও ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে সরবরাহ করা হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে চিঠিতে। একই ধরনের ছাড়পত্র পেয়েছে জাস করপোরেশন লিমিটেডও।

সাধারণত আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রোগীর পুষ্টি পরিপূরক নিশ্চিত করে রোগের জটিলতা কমাতে ব্যবহার করা হয়। এগুলো ভিন্ন ভিন্ন ফর্মুলেশন রোগীর বয়স, স্বাস্থ্য পরিস্থিতি ও নির্দিষ্ট চাহিদা অনুযায়ী ব্যবহার করা হয়। এগুলো অনেক ব্যয়বহুল।

যেমন– প্রোটিকেয়ার নামক পুষ্টি পরিপূরক কিডনির রোগীদের পুষ্টি চাহিদা অনুযায়ী বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে। কিডনি রোগে পুষ্টি সমর্থন রোগীর সুস্থতা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ ছাড়া প্রোটিকেয়ার রেগুলার সাধারণ রোগীদের জন্য সার্বিক পুষ্টি সমর্থন। প্রোটিকেয়ার ডিএম ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক। প্রোটিকেয়ার কিড শিশুদের জন্য বিশেষ পুষ্টি সম্পূরক। প্রোটিকেয়ার মোম অন্তঃসত্ত্বা ও সন্তান পালক মায়েদের পুষ্টি চাহিদা পূরণে উপযোগী। প্রোটিকেয়ার স্লিম ওজন নিয়ন্ত্রণ ও ফ্যাট ম্যানেজমেন্টে সহায়ক। প্রোটিকেয়ার ন্যানোলাইট ইলেক্ট্রোলাইট ও খনিজের সমন্বিত সম্পূরক। প্রোটিকেয়ার অ্যালবুমিন প্রোটিন চাহিদা পূরণের জন্য কার্যকর। প্রোটিকেয়ার ইমিউনোম্যাক্স রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি ও শরীরের প্রতিরক্ষা শক্তি জোরদার করতে সহায়ক।

অনুমোদনপত্রে মহাপরিচালকের পক্ষে স্বাক্ষর করেছেন ঔষধ প্রশাসনের পরিচালক (প্রশাসন) আসরাফ হোসেন। অথচ বাণিজ্যিকভাবে এ ধরনের এনওসি দেওয়ার বিধান নেই বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এতে অন্য কোম্পানিগুলো বৈষম্যের শিকার হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

এ বিষয়ে পরিচালক আসরাফ হোসেন বলেন, পুষ্টি পরিপূরক আমদানির ছাড়পত্র দেওয়ার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা হজে থাকায় মহাপরিচালকের অনুমতি নিয়ে বায়োসাইট হেলথকেয়ার লিমিটেডকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। তবে জরুরি পরিস্থিতি না থাকলেও কেন অনুমোদন দেওয়া হলো– এ প্রশ্নে তিনি মন্তব্য করতে চাননি।

বায়োসাইট হেলথকেয়ারের পরিচালক আহমেদ হোসেন বলেন, আমরা অবৈধভাবে কিছু করিনি। ঔষধ প্রশাসনের ছাড়পত্র নিয়েই পণ্য এনেছি। এই ছাড়পত্র দিতে সাবেক স্বাস্থ্য সচিব সাইদুর রহমান সুপারিশ করেছেন। আমাদের এই এনওসি পাওয়ার পর একাধিক ব্যবসায়ীরা অনুমোদন নিতে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন।

অন্যদিকে, জাস করপোরেশন লিমিটেডের নির্বাহী কর্মকর্তা রাশেদ সুলতান বলেন, পুষ্টি পরিপূরক আমদানির জন্য তারা একাধিকবার আবেদন করেও অনুমোদন পাননি। এ কারণে তাদের পণ্য চট্টগ্রাম বন্দরে পড়ে আছে। অনুমোদন ছাড়া কেন পণ্য আনা হয়েছে– এ প্রশ্নে তিনি স্পষ্ট কোনো উত্তর দেননি।

গত বছর ঔষধ প্রশাসনের জারি করা বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ডায়েটারি ও হারবাল সাপ্লিমেন্ট-সংক্রান্ত সব আবেদন এখন ঔষধ নিয়ন্ত্রণ কমিটিতে পাঠানো হবে। তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হবে। নিবন্ধনের ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সুইজারল্যান্ড, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর ও রাশিয়াকে রেফারেন্স দেশ ধরা হবে। তবে সংশ্লিষ্ট পণ্যটি এসব দেশে একই ব্র্যান্ড নামে নিবন্ধিত থাকতে হবে।

আমদানির জন্য আমদানিকারকের আবেদন, উৎপাদনকারীর অনুমোদনপত্র, উৎপাদনকারী দেশের বাণিজ্যিক প্রত্যয়নপত্র, রপ্তানিকারক দেশের নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের অনুমোদন, উপাদান নিরাপত্তা তথ্যপত্র, মান পরীক্ষার সনদ, ছয় মাসের স্থায়িত্ব পরীক্ষার প্রতিবেদন ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের জিএমপি সনদসহ বিভিন্ন নথি জমা দিতে হবে। দেশে উৎপাদিত ডায়েটারি বা সমজাতীয় পণ্যের নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও প্রচলিত ওষুধ নিবন্ধন প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আলাদা কোনো শিথিলতা রাখা হয়নি।

ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের (ইউল্যাব) মিডিয়া স্টাডিজ অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগের সিনিয়র লেকচারার ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম বলেন, সীমিত কয়েকজন ব্যবসায়ীর স্বার্থ রক্ষায় সাপ্লিমেন্টের বাজার নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে, যা নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেন, সাপ্লিমেন্টকে ওষুধ হিসেবে ঘোষণা করা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য ইতিবাচক দৃষ্টান্ত নয়। তবে অনিয়ন্ত্রিত বাজারে শৃঙ্খলা আনতে এ সিদ্ধান্তের ইতিবাচক দিকও রয়েছে। কঠোর নিয়মের কারণে আমদানি ও উৎপাদন ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।

এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, নীতিমালা হলে তা সবার জন্য উন্মুক্ত করতে হবে। না হলে দ্রুত নিবন্ধনের আওতায় আনতে হবে। ওষুধ খাতে দুর্নীতি বন্ধে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। নকল ওষুধ প্রস্তুতকারক ও বিক্রেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে ওষুধ বিক্রির ক্ষেত্রে কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন ও প্রয়োগ জরুরি।

এ বিষয়ে জানতে ঔষধ প্রশাসনের মহাপরিচালক শামীম হায়দারকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল সমকালকে বলেন, অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হবে। প্রমাণ পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অনৈতিকভাবে কাউকে সুযোগ দেওয়া হবে না।

আরও পড়ুন

×