মাসুদ উদ্দিন রিমান্ডে, ময়লা পানি ও ডিম নিক্ষেপ
আদালত প্রাঙ্গণে গতকাল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর গায়ে ময়লা পানি ও ডিম ছোড়েন এক ব্যক্তি সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৫ মার্চ ২০২৬ | ০৮:৩২ | আপডেট: ২৫ মার্চ ২০২৬ | ১১:২৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
এক-এগারোর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ের আলোচিত সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে পল্টন থানার মানব পাচার মামলায় পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। অবসরপ্রাপ্ত এই লেফটেন্যান্ট জেনারেলকে সোমবার রাতে রাজধানীর বারিধারা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গতকাল মঙ্গলবার রিমান্ড শুনানি শেষে আদালতের হাজতখানায় নেওয়ার পথে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর গায়ে এক ব্যক্তি ময়লা পানি নিক্ষেপ করেন। এ সময় তাঁর দিকে কয়েকটি ডিমও ছুড়ে মারা হয়। পরে পুলিশ সদস্যরা দ্রুত তাঁকে হাজতখানার ভেতরে নিয়ে যান।
এই মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে ‘সিন্ডিকেট করে ২৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ’-এর অভিযোগ আনা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে ঢাকায় পাঁচটি ও ফেনীতে ছয়টি মামলা রয়েছে। তিনি ফেনী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য।
এক-এগারোর ‘অন্যতম কুশীলব’ হিসেবে পরিচিত মাসুদ উদ্দিনকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে জানাতে গতকাল দুপুরে রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে ডিবিপ্রধান অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, ফেনীর বিচারাধীন তিনটি হত্যা মামলায় মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে তিনটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আছে। তাঁর বিরুদ্ধে ফেনীতে আরও তিনটি এবং ঢাকায় পাঁচটিসহ আটটি মামলা তদন্তাধীন। ঢাকার পল্টন, বনানী, কোতোয়ালি, মিরপুর ও হাতিরঝিল থানায় হত্যা, হত্যাচেষ্টা, মানব পাচার ও মানি লন্ডারিংয়ের (অর্থ পাচার) অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
পল্টন থানায় করা মানব পাচার মামলায় মাসুদ উদ্দিন তিন নম্বর আসামি। এ মামলায় মোট আসামি ১০১ জন। এ ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) একাধিক অভিযোগের তদন্ত চলছে।
সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে ডিবিপ্রধান বলেন, মাসুদ উদ্দিনের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলো অনেক আগের। এমন নয় যে, এগুলো পুলিশ বাদী হয়ে করেছে। বেশির ভাগ মামলার বাদী সাধারণ মানুষ। তিনি বলেন, ‘আমরা কোনো ব্যক্তি বা কারও অবস্থান দেখি না; বরং তাঁর কৃতকর্ম বা অপরাধের বিষয়টিই গুরুত্বপূর্ণ।’
পুলিশ অর্থ ও মানব পাচারের মামলার কথা বললেও রাজনৈতিক কারণে কিংবা এক-এগারোর সরকারের সময়ের ভূমিকার জন্য মাসুদ উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে কিনা– এমন প্রশ্নে শফিকুল ইসলাম বলেন, যেসব মামলা আছে সেগুলোই তারা তদন্ত করছেন। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা ও সবার ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করাই তাদের লক্ষ্য।
মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী আটক হওয়ার পর থেকেই ক্ষমতাসীন বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থক থেকে শুরু করে অনেকে ‘ওয়ান-ইলেভেন’ ইস্যু সামনে এনে সামাজিক মাধ্যমে নানা মন্তব্য করছেন। তাদের অনেকে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ওই সময়ে আটক ও নির্যাতনের জন্য মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে অভিযুক্ত করছেন।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু মঙ্গলবার ফেসবুকে লিখেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ধন্যবাদ ১/১১-তে গণতন্ত্র হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার শুরু করার জন্য।’
আদালতে যা হলো
মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গতকাল মানব পাচার আইনের মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে হাজির করে পাঁচ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়। রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, ‘গ্রেপ্তারের পর মামলার ঘটনার বিষয়ে তাঁকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তিনি চালাক প্রকৃতির লোক হওয়ায় নিজেকে আড়াল করে মামলার বিষয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন। এ অবস্থায় মামলার মূল রহস্য উদ্ঘাটন, পলাতক আসামি গ্রেপ্তার, আত্মসাৎ ও চাঁদার টাকা উদ্ধার, মূল অপরাধী চক্র শনাক্তসহ অন্য আসামি গ্রেপ্তারে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যাবে। এ জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ড প্রয়োজন।’
রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগরের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী রিমান্ডের পক্ষে বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ‘তথাকথিত এক-এগারো সরকারের সময় এই আসামিসহ (জেনারেল মাসুদ) অন্যরা মিলে ট্রুথ কমিশন গঠন করে ব্যবসায়ীদের ধরে এনে নির্যাতন করত। তাদের ক্ষমা করে দেওয়ার কথা বলে তাদের কাছ থেকে টাকা আদায় করত। বিশেষ করে মাইনাস টু ফর্মুলার নামে জিয়া পরিবারকেই শেষ করে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু ভাগ্যের কী পরিহাস! যাকে (তারেক জিয়া) টর্চার করে হত্যা করতে চেয়েছিল, তিনিই এখন দেশের প্রধানমন্ত্রী।’
মাসুদ উদ্দিনের পক্ষে তাঁর আইনজীবীরা রিমান্ডের বিরোধিতা করে জামিন চান। শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদ পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
আদালত সূত্র জানায়, বিকেল সোয়া ৫টার দিকে তাঁকে ডিবির একটি মাইক্রোবাসে সিএমএম আদালতে আনা হয়। ১০ মিনিট পর তাঁকে এজলাসে তোলা হয়। সন্ধ্যা ৬টার দিকে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে হাজতখানায় নেওয়ার জন্য নবম তলা থেকে লিফটে নামানো হয়। নিচতলায় নেমে কিছুটা হেঁটে সামনে আসার পর পেছন থেকে এক ব্যক্তি তাঁর গায়ে ময়লা পানি ঢেলে দেন। ওই ব্যক্তি পলিথিনে ময়লা পানি নিয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। এ সময় মাসুদ উদ্দিনকে লক্ষ্য করে ডিম ছুড়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন ওই ব্যক্তি। এ ছাড়া আরও কয়েকজন বিভিন্ন স্লোগান দেন।
ডিম ছুড়ে মারা ব্যক্তি নিজেকে বিএনপির কর্মী বলে দাবি করেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার নেতাকে মারছিল বলে তাঁকে ডিম মারা হইছে কেবল। পরে আরও কিছু মারা হবে।’ ওই ব্যক্তি দাবি করেন, তাঁর বাড়িতে কয়েকটি নষ্ট ডিম ছিল; সেগুলো এবং রং মেশানো পানি ছুড়ে মারার জন্য এনেছিলেন।
কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যরা চেষ্টা করেও ওই ব্যক্তিকে থামাতে পারেননি। মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর হাতে, গায়ে থাকা বুলেটপ্রুফ জ্যাকেটে ময়লা পানি লাগে। পুলিশ সদস্যরা তাঁকে দ্রুত হাজতখানায় নিয়ে যান।
আরও মামলা
এর আগে গত বছরের আগস্টে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীসহ ৩৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে রাজধানীর বনানী থানায় ওই মামলা করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। অভিযুক্তদের মধ্যে মাসুদ উদ্দিন ছাড়াও তাঁর স্ত্রী জেসমিন মাসুদ ও মেয়ে তাসনিয়া মাসুদকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, মাসুদ উদ্দিন তাঁর জনশক্তি রপ্তানি প্রতিষ্ঠান ফাইভ এম ইন্টারন্যাশনাল এবং অন্য আসামিদের সঙ্গে যোগসাজশ করে প্রতারণার মাধ্যমে ২০১৬ সালের ১৮ আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের ৩০ মে পর্যন্ত মোট ৯ হাজার ৩৭২ কর্মীকে মালয়েশিয়ায় পাঠান।
এক-এগারোর ভূমিকা এবং...
‘এক-এগারো’ নামে পরিচিত ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারি এবং ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ছিলেন মাসুদ উদ্দিন। ওই সময় সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশনের জিওসির দায়িত্বে থাকা মাসুদ তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তিনি তখন গুরুতর অপরাধ দমন-সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটির প্রধান হন। মেজর জেনারেল থেকে পদোন্নতি দিয়ে তাঁকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল করা হয়। ওই কমিটির অধীনে তখন চালানো হয় দুর্নীতিবিরোধী অভিযান। সেই অভিযানের ধারাবাহিকতায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। বন্দি অবস্থায় তারেক রহমানকে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে।
২০০৮ সালে মাসুদ উদ্দিনকে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে আওয়ামী লীগ সরকার এসে তাঁকে সেই দায়িত্বে বহাল রাখে। তিন দফায় তাঁর চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধি করে তৎকালীন সরকার।
২০১২ সালের ডিসেম্বরে অবসরে যাওয়ার পর তিনি ঢাকায় পাঁচতারকা হোটেল ও জনশক্তি রপ্তানির ব্যবসায় যুক্ত হন। তিনি ২০১৮ সালে জাতীয় পার্টিতে (জাপা) যোগ দিয়ে ফেনী-৩ আসনের (সোনাগাজী-দাগনভূঞা) সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এর আগে তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। পরে ২০২৪ সালের নির্বাচনেও তিনি ফেনী-৩ আসনে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৫ সালের মার্চে দুর্নীতি দমন কমিশনের এক মামলায় আওয়ামী লীগের সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের স্ত্রী-কন্যার সঙ্গে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকেও আসামি করা হয়। ওই মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগ আনা হয়।
মইন ইউ আহমেদের বইয়ে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী
সাবেক সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদের ‘শান্তির স্বপ্নে’ গ্রন্থে ওই সময় মাসুদ উদ্দিনের নানা ভূমিকার কথা উঠে আসে। বইয়ে তিনি লিখেছেন, তারা তখন প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার জন্য শুরুতে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রস্তাব দিলেও তিনি তাতে রাজি হননি। ড. ইউনূস অস্বীকৃতি জানানোর পর ড. ফখরুদ্দীনের নাম উঠে আসে। মেজর জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ড. ফখরুদ্দীনের বাসায় যান এবং রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। তখন গভীর রাত। আমি ড. ফখরুদ্দীনের বাসায় ফোন করলাম। তিনি সম্ভবত ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। আমিও তাঁকে প্রধান উপদেষ্টার পদ গ্রহণে আমন্ত্রণ জানালাম।
এই বইতে উপদেষ্টা পরিষদ গঠনে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর ভূমিকা প্রসঙ্গে তখনকার সেনাপ্রধান লিখেছেন, ‘এ সময় দেশের গোয়েন্দা বিভাগ ও সাভার ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী উপদেষ্টা পরিষদ গঠনে সর্বাত্মক সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসেন। সাভার ডিভিশনের জিওসি দীর্ঘদিন ডিজিএফআইতে কর্মরত থাকার সুবাদে তাঁর মতামত এ পরিষদ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।’
- বিষয় :
- রিমান্ডে
