ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ওষুধ শিল্পে বড় সংকটের শঙ্কা

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ওষুধ শিল্পে বড় সংকটের শঙ্কা
×

ছবি: ফাইল

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ৩০ মার্চ ২০২৬ | ০৭:৪০

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি ও পেট্রোকেমিক্যাল বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় দেশের ওষুধ শিল্পে চাপ বাড়ছে। বিশেষ করে বেসিক কেমিক্যাল ও কাঁচামালের উৎপাদন খরচ ব্যয় বেড়ে গেছে। বর্তমানে কয়েক মাসের কাঁচামাল মজুত থাকায় সরবরাহে বড় কোনো সমস্যা হয়নি, তবে যুদ্ধ দীর্ঘ হলে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গতকাল রোববার রাজধানীর পূর্বাচলে অনুষ্ঠিত ১৭তম এশিয়া ফার্মা এক্সপোর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন বক্তারা। এ সময় বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির সভাপতি আব্দুল মুক্তাদির বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি শুধু ওষুধ শিল্প নয়, বিশ্বজুড়ে সব শিল্পের জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। উৎপাদন অব্যাহত রাখতে বিদ্যুৎ সংকটের কারণে অনেক ক্ষেত্রে ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে।

তিনি বলেন, দেশের ওষুধ কোম্পানিগুলো প্রতিদিন প্রায় ১৫ হাজার যানবাহনের মাধ্যমে শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত ওষুধ সরবরাহ করে থাকে। সরকার এপ্রিল পর্যন্ত ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করার কথা জানিয়েছে। এর মধ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির উন্নতি হলে বড় ধরনের সংকট এড়ানো সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, পেট্রোকেমিক্যাল নির্ভর কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। আগে যেখানে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি 
প্রায় ৬০ ডলার ছিল, তা এখন বেড়ে ১২০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে কেমিক্যাল ও ওষুধ উৎপাদনে ব্যবহৃত উপকরণের ওপর। তবে আপাতত ওষুধের দাম বাড়ানোর কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।

এশিয়া ফার্মা এক্সপোর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে ওষুধ শিল্প সমিতির মহাসচিব ডা. জাকির হোসেন বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে আমদানিনির্ভর বেশ কিছু পণ্যের দাম ইতোমধ্যে বেড়ে গেছে।
ওষুধের কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান বিবিকন ফার্মাসিউটিক্যালসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডি এইচ শামীম বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাবে ওষুধ শিল্পে ব্যবহৃত প্রায় সব ধরনের কাঁচামালের দাম গড়ে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে শিল্পে চাপ তৈরি হয়েছে।

তিনি জানান, গ্যাস সংকট এবং সলভেন্টসহ বিভিন্ন বেসিক ইন্টারমিডিয়েটের মূল্যবৃদ্ধির কারণে এপিআই (অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট) উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত ওষুধের উৎপাদন খরচে পড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে নির্ধারিত দামে কাঁচামাল কিনতে বাধ্য হওয়ায় কোম্পানিগুলোর বিকল্প কম। কিন্তু কাঁচামালের দাম বাড়লেও খুচরা মূল্য (এমআরপি) অপরিবর্তিত থাকায় অনেক কোম্পানিকে লোকসান গুনতে হচ্ছে।

দীর্ঘস্থায়ী হলে সংকট গভীর হবে

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, সাধারণত ওষুধ কোম্পানিগুলোর কাছে তিন থেকে ছয় মাসের কাঁচামাল মজুত থাকে। তবে যুদ্ধ যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে এই মজুত শেষ হওয়ার পর সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। লি ফার্মা লিমিটেডের পরিচালক রঘু মৃধা বলেন, কাঁচামাল সংকটের কারণে অনেক ক্ষেত্রে নতুন অর্ডার নেওয়া যাচ্ছে না। আগামী দুই থেকে তিন মাস পরিস্থিতি সামাল দেওয়া গেলেও এর পর কী হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। 

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দ্রুত যুদ্ধ পরিস্থিতির অবসান না হলে দেশের ওষুধ শিল্পের ওপর চাপ আরও বাড়বে এবং দীর্ঘ মেয়াদে সরবরাহ ব্যবস্থাও ব্যাহত হতে পারে। 

গতকাল সকালে আনুষ্ঠানিকভাবে এশিয়া ফার্মা এক্সপোর উদ্বোধন করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল। এ সময় তিনি বলেন, ওষুধ শিল্পকে আমরা বহুদূর এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই। এ জন্য সম্মলিতভাবে কাজ করা জরুরি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ওষুধ শিল্প উন্নয়নে সহযোগিতা করবে। এ সময় স্বাস্থ্য সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, এটি শুধু প্রদর্শনী নয়, বাংলাদেশে ফার্মাসি খাতে এগিয়ে নেওয়ার একটি প্রক্রিয়া।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের (বিএপিআই) আয়োজনে এ প্রদর্শনীতে এবার ২০টির বেশি দেশের চার শতাধিক প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে। আগামীকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত তিন দিনব্যাপী এ প্রদর্শনী চলবে। এতে ফার্মাসিউটিক্যাল প্রসেসিং ও প্যাকেজিং প্রযুক্তি, এপিআই ও এক্সিপিয়েন্টস, অ্যানালিটিক্যাল ও ল্যাবরেটরি যন্ত্রপাতি, ক্লিনরুম ও এইচভিএসি সিস্টেম, পানি ব্যবস্থাপনা এবং টার্নকি প্রজেক্ট সেবাসহ বিভিন্ন আধুনিক প্রযুক্তি তুলে ধরা হবে।

আরও পড়ুন

×