করের চাপ থেকে পরিত্রাণ চায় সংবাদপত্র ও টিভি চ্যানেল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০১ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:৪৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
আগামী বাজেটে সংবাদপত্র শিল্পে আরোপিত বিভিন্ন শুল্ক-কর কমানোর প্রস্তাব দিয়েছে নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব)। এ শিল্পের প্রধান কাঁচামাল নিউজপ্রিন্টের ওপর আরোপিত ৩ শতাংশ আমদানি শুল্ক ও ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহারের পাশাপাশি করপোরেট কর সাড়ে ২৭ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব দিয়েছেন সংবাদপত্রের মালিকরা।
একই আলোচনায় অন্যদিকে বিজ্ঞাপন আয়ের ওপর ৫ শতাংশ ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে অর্জিত বৈদেশিক আয়ের ওপর বিদ্যমান সাড়ে ৭ শতাংশ উৎসে কর প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে অ্যাসোসিয়েশন অব টেলিভিশন চ্যানেল ওনার্স (অ্যাটকো)। সংবাদপত্র এবং টিভি চ্যানলে নানা ধরনের করের চাপ রয়েছে, যা থেকে তারা পরিত্রাণ পেতে চান।
জাতীয় বাজেট সামনে রেখে গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ের জাতীয় রাজস্ব বোর্ড মিলনায়তনে সংবাদপত্র এবং টেলিভিশন চ্যানেল মালিকদের সঙ্গে এই আলোচনা হয়। আগামী অর্থবছরের বাজেট সামনে রেখে বেসরকারি খাতের সঙ্গে এটি ছিল এনবিআরের প্রথম প্রাক-বাজেট আলোচনা।
নোয়াব সভাপতি ও মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী সংগঠনের পক্ষে সংবাদপত্র শিল্পের প্রস্তাব তুলে ধরেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, বণিক বার্তার সম্পাদক ও প্রকাশক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ, অ্যাটকোর মহাসচিব ও একুশে টিভির চেয়ারম্যান আব্দুস সালাম প্রমুখ। আলোচনায় সভাপতিত্ব করেন এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান।
লিখিত প্রস্তাবে নোয়াব বলেছে, সংবাদপত্র এমন একটি সেবা খাত, যার উৎপাদন খরচ বিক্রীত মূল্যের কয়েক গুণ। বিজ্ঞাপন আয় দিয়ে উৎপাদন ব্যয়ের ঘাটতি পূরণ করা হয়। করোনা মহামারি ও পরবর্তী সময়ে অন্যান্য শিল্পকে প্রণোদনা দেওয়া হলেও সংবাদপত্র শিল্পকে দেওয়া হয়নি। সংবাদপত্রের বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন কমে গেছে। বিজ্ঞাপন আয় দিয়েও উৎপাদন ব্যয়ের ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। সংবাদপত্রের প্রধান উপাদান নিউজপ্রিন্টের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। ছয় মাস আগেও প্রতি টন কাগজের আমদানি মূল্য ছিল ৫৬০ ডলার, দাম বেড়ে এখন দাঁড়িয়েছে ৬৩০ ডলার। ফলে বিরাট আকারে আর্থিক লোকসান গুনতে হচ্ছে।
নোয়াব বলেছে, সংবাদপত্র শিল্পের প্রধান কাঁচামাল নিউজপ্রিন্ট আমদানিতে ৩ শতাংশ শুল্ক পরিশোধ করতে হচ্ছে। পাশাপাশি ভ্যাট ১৫ শতাংশ, অগ্রিম আয়কর ৫ শতাংশ এবং অগ্রিম কর সাড়ে ৭ শতাংশ পরিশোধ করতে হয়। পরিবহন, অন্যান্য ব্যয়সহ নিউজপ্রিন্টের ল্যান্ডেড কস্ট প্রায় ১৩০ থেকে ১৩২ শতাংশ পর্যন্ত দাঁড়ায়। নিউজপ্রিন্টের ক্রমবর্ধমান মূল্য এবং উচ্চ আমদানি নির্ভরতার কারণে এ শিল্পের টিকে থাকা কঠিন হয়ে উঠছে।
নোয়াব আরও জানায়, সংবাদপত্রের বিজ্ঞাপন আয়ের ওপর উৎসে কর ৫ শতাংশ এবং কাঁচামাল আমদানির ওপর ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর মিলে হয় ১০ শতাংশ। অথচ সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠানের মোট আয়ের ১০ শতাংশ লাভ থাকে না। এই অগ্রিম আয়কর বছর শেষে আয়করের সঙ্গে সমন্বয় সম্ভব হচ্ছে না। ফলে সরকারের কাছে প্রতিষ্ঠানের অগ্রিম কর পাওনা হিসেবে থেকে যাচ্ছে, যা বাস্তবে নগদ অর্থের সংকট তৈরি করে। তাই ওই দুটি কর হার কমানো জরুরি। এ ছাড়া কর্মীর আয়কর থেকে প্রতিষ্ঠানের দায়মুক্তির দাবি জানিয়েছে নোয়াব।
সভায় নোয়াব সভাপতি মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। বাংলাদেশে বর্তমানে জ্বালানি তেলের দুষ্প্রাপ্যতা রয়েছে এবং আগামী দিনে মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। এমতাবস্থায় পত্রিকা প্রকাশ অব্যাহত রাখা কঠিন।
প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, গত ১৫ থেকে ১৬ বছর সংবাদপত্রগুলো কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে ছিল। গত দেড়-দুই বছরও ভালো ছিল না। এক কপি পত্রিকা বের করতে সব মিলিয়ে খরচ হয় ২৮ টাকা। কিন্তু বিক্রি করা হয় ১২ টাকায়। তাছাড়া পাঠক কমছে, বিজ্ঞাপন কমছে এবং আয়ও কমছে। তিনি বলেন, তৈরি পোশাকশিল্পে ১০ থেকে ১২ শতাংশ করপোরেট কর অথচ সংবাদপত্র শিল্পে করহার সাড়ে ২৭ শতাংশ। এই হার কমানো যৌক্তিক।
সভায় এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান বলেন, সংবাদপত্র শিল্পের করপোরেট কর বাড়বে না। অন্যান্য শুল্ক-কর নিয়ে আগামী বাজেটে যৌক্তিকভাবে কিছু করা হবে। কর্মীর আয়কর থেকে প্রতিষ্ঠানের দায়মুক্তির দাবির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে বেতন কাঠামোতে প্রভাব পড়বে। কারণ আগে যদি মালিকপক্ষ ট্যাক্স দিয়ে থাকে, এখন কর্মীদের নিজস্ব আয় থেকে কর দিতে হলে স্বাভাবিকভাবেই বেতন বাড়ানোর দাবি উঠবে।
অ্যাটকোর বিভিন্ন দাবি
অ্যাটকো বলেছে, দুই-তিনটি বাদে নতুন কোনো চ্যানেল এখনও লাভের মুখ দেখেনি। কোটি
কোটি টাকা উৎসে কর কাটা হলেও লোকসানের কারণে তা ফেরত পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তাই এই খাতকে উৎস কর থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়া দরকার। এ ছাড়া প্রকৃত আয়ের পরিবর্তে গ্রস প্রাপ্তির ওপর কর আরোপের ধারা সংশোধনের দাবি জানিয়েছে অ্যাটকো।
- বিষয় :
- সংবাদপত্র
