ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

এলপিজির দামে বড় লাফ, রান্নার খরচ আরও বাড়ল

এলপিজির দামে বড় লাফ, রান্নার খরচ আরও বাড়ল
×

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৩ এপ্রিল ২০২৬ | ০৯:৫৭ | আপডেট: ০৩ এপ্রিল ২০২৬ | ১০:৪২

| প্রিন্ট সংস্করণ

সরকারিভাবেই তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম ২৯ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। ফলে এলপিজি ব্যবহারকারীদের খরচ আরেক দফা বাড়ছে। যদিও সরকারি দামে বাজারে মেলে না সিলিন্ডার গ্যাস।  ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা বাড়তি দিয়েই তা কিনতে হয়। সরকার দাম বাড়ানোর ফলে এই খরচ আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

গত মাসে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ছিল এক হাজার ৩৪১ টাকা, যা নতুনভাবে এপ্রিল থেকে করা  হয়েছে এক হাজার ৭২৮ টাকা। অর্থাৎ ১২ কেজিতে দাম বেড়েছে ৩৮৭ টাকা। কেজিতে বেড়েছে ৩২ টাকা ৩০ পয়সা। গতকাল বৃহস্পতিবার নতুন দাম ঘোষণা করেন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ। গতকাল সন্ধ্যা থেকেই এই দর কার্যকর হয়েছে। 

রেটিকুলেটেড পদ্ধতিতে সরবরাহ করা বেসরকারি এলপিজির দামও বেড়েছে। তরল অবস্থায় প্রতি কেজির দাম মার্চের ১০৭ টাকা ৯৯ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১৪০ টাকা ২৯ পয়সা করা হয়েছে। গ্যাসীয় অবস্থায় প্রতি ঘনমিটারের দাম ২৩৯ টাকা ৯০ পয়সা থেকে বেড়ে ৩১১ টাকা ৭০ পয়সা  হয়েছে। গাড়িতে ব্যবহৃত এলপিজির (অটো গ্যাস) দাম প্রতি লিটার ৭৯ টাকা ৭৭ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে দাম ছিল ৬১ টাকা ৮৩ পয়সা। সরকারি কোম্পানির সরবরাহ করা এলপিজির সাড়ে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ৮২৫ টাকা অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।

রান্নার খরচ বাড়বে
এলপিজির ১২ কেজি সিলিন্ডার সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় গৃহস্থালির কাজে। গতকাল বিইআরসির বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, কোনো পর্যায়ে কমিশন নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দরে বিক্রি করা যাবে না। তবে বাস্তবতা ভিন্ন। অভিযোগ আছে, এমনিতেই সিলিন্ডারপ্রতি ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা বেশি দিতে হয় ক্রেতাদের। তবে চার দিন ধরে প্রতি সিলিন্ডারে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা বেশি দাম নিচ্ছেন বিক্রেতারা। 

রাজধানীর মগবাজারের বাসিন্দা ফখরুল ইসলাম বলেন, গত শুক্রবার এক হাজার ৬৪০ টাকায় একটি সিলিন্ডার  কিনেছি, যা সরকার নির্ধারিত মার্চের দামের চেয়ে প্রায় ৩০০ টাকা বেশি। গতকাল সন্ধ্যায় আবার সেই  বিক্রেতার কাছে একই সিলিন্ডারের দাম জানতে চাইলে তিনি দুই হাজার টাকা চান। দাম এত বাড়ার কারণ জানতে চাইলে ওই বিক্রেতা জানান, চার দিন ধরে সব কোম্পানির সিলিন্ডারের দাম বেড়ে গেছে। এর সঙ্গে সরকারের দাম বাড়ানোর কোনো সংযোগ নেই। এখন সরকার যেহেতু দাম বাড়িয়েছে, তাই গ্যাসের দাম আরও বাড়বে। এই দোকানে ৩৫ কেজির সিলিন্ডারের দাম গতকাল ছিল ৬ হাজার ২০০ টাকা, যা সরকার ঘোষিত এপ্রিলের দামের চেয়ে এক হাজার ২০০ টাকা বেশি।

মিরপুরের শ্যাওড়াপাড়ার বাসিন্দা অখিল চন্দ্র জানান, বৃহস্পতিবার সকালেই ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনেছেন দুই হাজার টাকায়। তিনি জানান, ৩৫ কেজি সিলন্ডারের দাম পড়েছে পাঁচ হাজার ৬০০ টাকা। এই দাম সরকার নির্ধারিত মার্চের দাম তিন হাজার ৯১১ টাকা থেকে বেশি, এমনকি সরকার ঘোষিত নতুন দর পাঁচ হাজার ৪১ টাকা থেকেও বেশি। অখিল জানান, সরকার দাম বাড়ানোর ফলে ১২ কেজির সিলিন্ডার দুই হাজার ৫০০ টাকার নিচে পাওয়া যাবে না। 

চার থেকে পাঁচ সদস্যের পরিবারের রান্নার জন্য মাসে এক থেকে দেড়টি (১২ কেজি) এলপিজি সিলিন্ডার প্রয়োজন হয়। ফলে যে পরিবারের মার্চে এলপি গ্যাসের জন্য খরচ ছিল আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা। তা এপ্রিলে বেড়ে হবে সাড়ে তিন হাজার টাকা। 

বাসাবাড়ির খরচের পাশাপাশি হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন এবং এলপিজিচালিত শিল্পেও খরচ বাড়বে। 
তেজগাঁও এলাকার চা বিক্রেতা শাওন ইকবাল জানান, ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার তিন দিন যায়। গত মাসে ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায় সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সিলিন্ডারের দাম চেয়েছে ২ হাজার ১০০ টাকা, যদিও সিলিন্ডার এনেছেন আগের দিন বুধবার। শাওন বলেন, এক দিনের গ্যাস খরচই ১০০ টাকা বেড়েছে। ডিলারের কথা শুনে মনে হয়েছে দাম আরও বাড়বে। এত খরচ হলে চা বিক্রি করে পোষানো যাবে না। ব্যবসা বন্ধ করে দিতে হবে। 

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. শামসুল আলম বলেন, এলপিজির বাজারের অনিয়ম প্রতিরোধ করার দায়িত্ব বিইআরসির। তারা এ কাজে ব্যর্থ হয়েছে। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, প্রতিযোগিতা কমিশন, ভোক্তা অধিদপ্তর নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে।  তারা এলপিজি ব্যবসায়ীদের হাতে বন্দি হয়ে গেছে। ভোক্তাদের স্বার্থ দেখার কেউ নেই। 

দাম বাড়ার কারণ 
২০২১ সালের এপ্রিল থেকে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে আসছে বিইআরসি। এলপিজি তৈরির মূল উপাদান প্রোপেন ও বিউটেন বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হয়। প্রতি মাসে এলপিজির এই দুই উপাদানের মূল্য প্রকাশ করে সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠান আরামকো। এটি সৌদি কার্গো মূল্য (সিপি) নামে পরিচিত। এই সৌদি সিপিকে ভিত্তিমূল্য ধরে দেশে এলপিজির দাম সমন্বয় করে বিইআরসি। আমদানিকারক কোম্পানির চালান মূল্য থেকে গড় করে পুরো মাসের জন্য ডলারের দাম হিসাব করে বিইআরসি।

এপ্রিলের জন্য প্রোপেনের সৌদি সিপি প্রতি টন ৭৫০ ডলার এবং বিউটেনের ৮০০ ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে। ওই দুই গ্যাস ৩৫: ৬৫ অনুপাতে মিশিয়ে এলপিজি হয়। তাতে গড় সৌদি সিপি দাঁড়িয়েছে ৭৮২ দশমিক ৫০ ডলার, যা মার্চে ছিল ৫৪১ দশমিক ৭৫ ডলার। মার্কিন ডলারের গড় বিনিময় মূল্য মার্চের ১২২ দশমিক ৪৭ টাকা থেকে বেড়ে এপ্রিলের জন্য ১২২ দশমিক ৯৪ টাকা ধরা হয়েছে। কাঁচামালের দাম ও ডলারে দাম বাড়ায় দেশে এলপিজির দর এত বেড়েছে।

কোন সিলিন্ডারে কত বেড়েছে
মার্চে ১২ দশমিক ৫ কেজির সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ৩৯৭ টাকা; এপ্রিলে তা হয়েছে ১ হাজার ৮০১ টাকা। আর ৫ দশমিক ৫ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৬১৫ থেকে হয়েছে ৭৯২ টাকা।

বড় সিলিন্ডারগুলোর দামও একই হারে বেড়েছে। ১৫ কেজির সিলিন্ডার ১ হাজার ৬৭৬ থেকে ২ হাজার ১৬১ টাকা, ১৬ কেজির সিলিন্ডার ১ হাজার ৭৮৮ থেকে ২ হাজার ৩০৫ টাকা, ১৮ কেজির সিলন্ডার ২ হাজার ১১ থেকে বেড়ে ২ হাজার ৫৯৩ টাকা, ২০ কেজির সিলিন্ডার ২ হাজার ২৩৫ থেকে বেড়ে ২ হাজার ৮৮১ টাকা এবং ২২ কেজির সিলিন্ডার ২ হাজার ৪৫৮ থেকে বেড়ে ৩ হাজার ১৬৯ টাকা হয়েছে।

আর ২৫ কেজির সিলিন্ডার ২ হাজার ৭৯৪ থেকে বেড়ে ৩ হাজার ৬০১ টাকা, ৩০ কেজির সিলিন্ডার ৩ হাজার ৩৫২ থেকে বেড়ে ৪ হাজার ৩২১ টাকা, ৩৩ কেজির সিলিন্ডার ৩ হাজার ৬৮৭ থেকে বেড়ে ৪ হাজার ৭৫৩ টাকা, ৩৫ কেজির ৩ হাজার ৯১১ টাকা থেকে বেড়ে ৫ হাজার ৪১ টাকা এবং ৪৫ কেজির সিলিন্ডার ৫ হাজার ২৮ থেকে বেড়ে ৬ হাজার ৪৮২ টাকা হয়েছে।

আরও পড়ুন

×