ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট
পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় সেচ ব্যাহত, চাষাবাদ বন্ধ
নিজস্ব প্রতিবেদক, ময়মনসিংহ ও হালুয়াঘাট প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৫ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:১৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর স্বাভাবিকের তুলনায় নিচে নেমে গেছে। ফলে গভীর নলকূপে পানি না ওঠায় এবার বোরো মৌসুমে অনাবাদি প্রায় দুই হাজার ১৬৯ হেক্টর কৃষিজমি। এতে অন্তত ১২ হাজার টন ধান উৎপাদন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষকরা।
উপজেলা কৃষি দপ্তরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হালুয়াঘাটে কৃষিজমি রয়েছে ২৫ হাজার ১৯ হেক্টর। এর মধ্যে ২২ হাজার ৮৫০ হেক্টর জমিতে চলতি মৌসুমে বোরো ধান চাষ করা হয়েছে। সেচ সংকটে হালুয়াঘাট সদর, কৈচাপুর, জুগলী, ভুবনকুড়া, গাজীরভিটা ইউনিয়নে অন্তত দুই হাজার ১৬৯ হেক্টর জমি অনাবাদি রয়েছে। কৃষকরা বলছেন, সেচ সংকটে অনাবাদি জমির পরিমাণ আরও বেশি।
বিএডিসির তথ্যমতে, হালুয়াঘাট উপজেলায় ৭৭টি গভীর নলকূপ রয়েছে। এর মধ্যে ৩৬টি চালু আছে। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় ৪১টি গভীর নলকূপ বিভিন্ন সময়ে বন্ধ হয়ে গেছে। সরকারিভাবে এসব গভীর নলকূপ ৯০ ফুট হাউজিং করা থাকে। অর্থাৎ বৈদ্যুতিক মোটরগুলো ৯০ ফুটের নিচে নামানো সম্ভব হয় না। সাধারণত চৈত্র মাসে পানির স্তর ১২০ ফুট থেকে ১৫০ ফুট পর্যন্ত নেমে যায়। তাই তখন গভীর নলকূপগুলো অকার্যকর হয়ে পড়ে। বিএডিসির প্রতিটি গভীর নলকূপের আওতায় ৬০-৮০ একর জমিতে সেচ দেওয়া যায়। যেখানে ব্যক্তি উদ্যোগে স্থাপিত গভীর নলকূপ থেকে মাত্র ২০-৩০ একর জমিতে সেচ দেওয়া সম্ভব।
প্রকৌশলীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গভীর নলকূপ স্থাপনে সাধারণত ৩৫০ থেকে ৬০০ ফুট বোরিং করা হয়। যান্ত্রিক সুরক্ষা ও বিদ্যুৎ খরচ সাশ্রয়ে পাম্পটি সাধারণত ৮০-৯০ ফুটের নিচে নামানো হয় না। অর্থাৎ বৈদ্যুতিক মোটর স্থাপন করা হয় ৮০ থেকে ৯০ ফুট গভীরে। কিন্তু গ্রীষ্মকালে পানির স্তর ১২০ থেকে ১৫০ ফুট নিচে নেমে যায়। ফলে বাতাসের মধ্যে পড়ে যাওয়া বৈদ্যুতিক মোটর নিচ থেকে পানি টেনে তুলতে পারে না। প্রযুক্তিগতভাবে এই সমস্যাকে ‘ড্রাই রানিং’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, যেখানে পাইপের গভীরতা কোনো ভূমিকা রাখতে পারে না। কারণ, সাবমার্সিবল পাম্প শুধু তার নিজস্ব অবস্থানের চারপাশের পানিকেই ওপরে তুলতে সক্ষম। যখন ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ১৫০ ফুট নিচে চলে যায়, তখন পাইপ ৬০০ ফুট গভীরে থাকলেও পাম্পটি পানির নাগাল পায় না এবং শূন্য পাইপে কেবল বাতাস ঘুরতে থাকে। ফলে শুষ্ক মৌসুমে সেচ কাজ সচল রাখতে হলে পাম্পটিকে বর্তমান পানির স্তরেরও অন্তত ২০ থেকে ৩০ ফুট নিচে বা নিরাপদ গভীরতায় পুনঃস্থাপন করা ছাড়া কারিগরি কোনো বিকল্প থাকে না।
বিএডিসির ময়মনসিংহ সার্কেলের সহকারী প্রকৌশলী ওয়াসিম আকরামের ভাষ্য, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বা ডায়নামিক লেভেলের সামান্য নিচে পাম্প স্থাপনই যথেষ্ট। অন্যথায় মোটরের ওপর অতিরিক্ত পানির চাপ পড়ে কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে। এ ছাড়া একদম গভীরে পাম্প স্থাপন করলে বালু ও পলি ঢুকে ইম্পেলার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি উত্তোলন ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
প্রকৌশলী ওয়াসিম আকরাম জানান, হালুয়াঘাটের চারটি ইউনিয়নে পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় ২০০০ সালের পর থেকে বিএডিসি নিয়ন্ত্রিত ১২টি গভীর নলকূপ বন্ধ হয়ে গেছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় একটি নির্দেশনা ছিল মাটির নিচে আর নতুন করে গভীর নলকূপ স্থাপন করা নিষেধ। এই কারণে বন্ধ গভীর নলকূপগুলো পুনঃস্থাপন করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে নদীনালার পানি ব্যবহার করে সেচ কার্যক্রম চালানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, সর্বশেষ মিটিংয়ে জেলা পরিষদ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও বিএডিসির সমন্বয়ে একটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পটি পাস হলে সেচের দুর্ভোগ অনেকটাই লাঘব হবে। হালুয়াঘাট উপজেলার জুগলি ইউনিয়নে বিএডিসির একটি গভীর নলকূপের আওতাধীন ৩০০ একর জমি পতিত রয়েছে। এটি পুনরায় চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কৃষকরা জানান, পানির স্তর বোরো মৌসুমে নিচে চলে যাওয়ায় ব্যক্তিগত উদ্যোগে নির্মাণ করা শ্যালো মেশিন, সেচ পাম্পেও পানি ওঠে না। মাটির নিচে পাথর ও ব্যয়বহুল হওয়ায় গভীর নলকূপ স্থাপন করতে পারেন না তারা। উপজেলার সীমান্তবর্তী কয়েকটি নদীতে জলকপাট ও রাবারড্যাম নির্মাণ করা হয়েছে। এতে ওইসব এলাকার কৃষক জমিতে সেচ দিতে পারছেন।
কৃষকরা অভিযোগ করেন, আচকিপাড়া-ধুপাঝুড়ি এলাকার সওল নদী, বিষ্ণজুড়ি খালে জলকপাট ও লক্ষ্মীকুড়া এলাকার মেনংছড়া নদীর ওপর রাবারড্যাম নির্মাণ করা হলেও সেগুলো অপরিকল্পিত। রাবারড্যাম ও জলকপাটগুলো পরিকল্পিতভাবে স্থাপন করলে কৃষকের আরও বেশি উপকার হতো।
স্থানীয় বাসিন্দা মাসুদ রানা বলেন, আচকিপাড়া-ধুপাঝুড়ি এলাকার সওল নদীর বিষ্ণজুড়ি খালে জলকপাট ও লক্ষ্মীকুড়া এলাকার মেনংছড়া নদীর ওপর রাবারড্যাম নির্মাণ করা হয়েছে বাংলাদেশ-ভারতের সীমানা ঘেঁষে, ফলে অনেক ফসলি জমি চাষের আওতায় আসেনি। বাংলাদেশের চেয়ে ভারতীয় কৃষরাই লাভবান বেশি হচ্ছেন। অথচ বাংলাদেশের আরও অভ্যন্তরে এসব রাবারড্যাম ও জলকপাট স্থাপন করা গেলে অনেক জমি চাষের আওতায় আসত। তিনি জানান, নদীপারের বাসিন্দাদের কথা চিন্তা না করে অস্থায়ীভাবে পানি সংরক্ষণের জন্য মাটি দিয়েই নদীর পার উঁচু করে নির্মাণ করা হয়েছে। এর ফলে প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে পার ভেঙে মানুষের ঘরবাড়ি ও ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
উপজেলা সদরের কৃষক রুকন উদ্দিন বলেন, তাদের গ্রামে শুধু রোপা আমন ফসল হলেও বোরো মৌসুমে পানি সংকটে চাষাবাদ করা যায় না। গভীর নলকূপের ব্যবস্থা করে দেওয়া হলে চাষের আওতায় আসত।
ডাকিয়াপাড়ার গুমুরিয়া এলাকার কৃষক আতাউর রহমানের ভাষ্য, জলকপাট পাকা। বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢল এলে সবকিছু নদীতে ভেসে যায়। অনেক পুকুরের মাছ, গো-খাদ্য, কাঁচা ঘরের ক্ষতি হয় বেশি। বাড়িতে এমনও হয়, পানির কারণে রান্না বন্ধ থাকে, ফলে সন্তানদের নিয়ে না খেয়ে থাকতে হয়। বাড়ি থেকে কোথাও যেতে পারেন না তারা। প্রতিবছরই নদীর পার মেরামত করা হয়। তারা গরিব মানুষ। সরকার তো ক্ষতিপূরণ দেয় না।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘সীমান্তবর্তী তিনটি ইউনিয়নে যেসব নদী রয়েছে, সেগুলো পুনর্খননের মাধ্যমে নদীর পানি ধরে রেখে কৃষিকাজে ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বৃষ্টির পানি ধরে রাখা গেলে চাষাবাদের কাজে লাগবে। বিএডিসির মাধ্যমে ও সরকারি সহায়তায় গভীর নলকূপ স্থাপন করা হলে অনাবাদি জমি সেচের আওতায় আনা যাবে।’
বিএডিসি হালুয়াঘাট উপজেলার উপসহকারী প্রকৌশলী রেজাউল করিম জানান, বোরো মৌসুমে ওই এলাকার পানির স্তর নিচে চলে যায়। পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় ব্যক্তিগত উদ্যোগে সেচ দেওয়া অনেক ব্যয়বহুল। সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় কয়েক ফুট মাটির নিচেই পাথর, যে কারণে সেচ পাম্পের বোরিং করা যায় না। সরকারিভাবে উদ্যোগ নেওয়া হলে গভীর নলকূপের মাধ্যমে সেচের পানি উত্তোলন করা সম্ভব। ইতোমধ্যে অনাবাদি জমিগুলো সেচের আওতায় আনতে একটি চাহিদা পাঠানো হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশনা পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
- বিষয় :
- পানির সংকট
