ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

সংসদ অধিবেশন

জুলাই সনদ নিয়ে বিতর্ক, ঐকমত্য ছাড়াই শেষ

জুলাই সনদ নিয়ে বিতর্ক, ঐকমত্য ছাড়াই শেষ
×

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৬ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:৩৮ | আপডেট: ০৬ এপ্রিল ২০২৬ | ০৯:২৯

জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে সংসদে আবারও সরকারি ও বিরোধী দলের বাহাস হয়েছে। তবে সনদের বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে ঐকমত্য হয়নি। সরকারি দল বিএনপি আগের মতোই বলেছে, নোট অব ডিসেন্টসহ (ভিন্নমত) স্বাক্ষরিত সনদ অনুযায়ী সংসদে সংবিধান সংশোধন করা হবে।

বিরোধী দল জামায়াত-এনসিপি জোট গণভোটে অনুমোদিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ অনুযায়ী সংবিধান চেয়েছে। তবে বিরোধীদলীয় নেতা ইঙ্গিত দিয়েছেন, গণভোটের ফল মানলে সংবিধান সংশোধনকে সংস্কার হিসেবে মানবে। তবে সরকারি দল বলছে, গোঁজামিল দিয়ে গণভোট করা হয়েছে। সিদ্ধাতে ঐকমত্য ছাড়াই বাহাস শেষ হয়। 

নোয়াখালী-২ আসনের বিএনপির এমপি জয়নুল আবদিন ফারুকের মুলতবি প্রস্তাবে গতকাল রোববার স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রমের সভাপতিত্বে সংসদে এসব বিতর্ক হয়েছে সরকারি ও বিরোধী দলে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষে বক্তৃতা করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের পর সংসদ নেতার পরিবর্তে সালাহউদ্দিন কেন বক্তৃতা করবেন– বিরোধী দলের প্রশ্নে স্পিকার বলেন, সংসদ নেতার পক্ষে বক্তৃতা করবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সরকারি জোট থেকে পাঁচজন এবং বিরোধী জোট থেকে চারজন এমপি বক্তৃতা করেন। 
জয়নুল আবদিন সংসদের কার্যপ্রণালির ৬২ বিধিতে প্রস্তাব করেন, জুলাই সনদ ভবিষ্যতের পথরেখা, একটি রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল। যা সংবিধান সংশোধনসহ বিভিন্ন আইনকানুন প্রণয়ন, সংশোধন, সংযোজন, পরিমার্জনের বিষয় প্রস্তাব সংক্রান্ত। যে কারণে উক্ত জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ এর বাস্তবায়ন পদ্ধতি কী হবে, সে বিষয়ে সংসদ মুলতবি করে আলোচনা হোক। তবে বাস্তবায়ন পদ্ধতি ঠিক হয়নি দুই ঘণ্টার আলোচনায়। 

সংশোধনের বিরোধী নয়, বিরোধী দল

গণভোটের ফলাফল অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান না করার বিষয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, সময়সীমা চলে গেলেও মনখোলা রাখলে, এখনও রাস্তা বের করা সম্ভব। সেই রাস্তা বের করে এগিয়ে যেতে চাই। যতটুকু সংস্কার হওয়ার, সংস্কার হবে। সেখানে সংশোধন হওয়ার, সংশোধন হবে। আমরা সংশোধন বিরোধী নই। সংবিধান সংশোধন ও আইন রচনায় আমাদের পূর্ণ সহযোগিতা থাকবে।

জামায়াত আমির বলেন, অভিযোগ দেওয়া হয়েছে আমরা সংবিধান ছুড়ে ফেলার কথা বলছি। এই সংসদে সাক্ষী রেখে বলছি, আমাদের কেউ এই ধরনের মন্তব্য করেননি। ন্যায়ভিত্তিক সমাজ কায়েমের জন্য এই সংবিধানের পরিবর্তন চেয়েছি। ফ্যাসিবাদমুক্ত দেশ ও শাসন পেতে কথা বলছি। আমরা সংবিধানবিরোধী নই। সংবিধানের ওই জায়গাগুলো চাইনি– যেটা গত ৫৪ বছরে বারবার ফ্যাসিবাদের জন্ম দিয়েছে। বলা হচ্ছে আমরা জুলাই সনদের মুখোমুখি হয়ে যাচ্ছি। জুলাই সনদ গণঅভ্যুত্থানের হৃদয়ের অংশ। আমরা এর বিরুদ্ধে যাব কেন? আমরা আদেশ মানি। গণভোট মানি। সংস্কার পরিষদ মানি। প্রয়োজন ক্ষেত্রে সংবিধানের সংশোধন মানি। জুলাই সনদও সুন্দরভাবে বাস্তবায়নের বিষয়টি মানি। কোথাও অমান্যের বিষয়টি নেই। এখানকার সবাই গণভোটের হ্যাঁ এর পক্ষে কথা বলেছি। 

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, এই সংসদে মজলুমের বাইরে কেউ আছে বলে মনে করি না। আগামীতে এমন বাংলাদেশ হোক, যেখানে সংবিধান ও আইনের দোহাই দিয়ে আর কোনো ফ্যাসিবাদ ফিরে আসবে না। ফ্যাসিবাদের দাফন করতে চাই। 

বিশেষ কমিটির পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট সংসদে উপস্থাপনের দাবি করে তিনি বলেন, সেই রিপোর্ট দেখে বাকি বিলগুলোকে বৈধতা দেওয়ার জন্য সেগুলোতে অংশগ্রহণ করতে চাই। সরকারি ও বিরোধী দল মিলে আইনের সুষ্ঠু কাঠামো গড়ে তুলতে চাই। আমরা এর বাইরে যেতে চাই না। এটা নিয়ে প্রতিযোগিতা নয়, সহযোগিতার মানসিকতা থেকে নিবিড়ভাবে আলোচনায় অংশ নিতে চাই।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, গণভোটে সবাই রাজি ছিলাম। হ্যাঁ ভোটের জন্য সবাই প্রচার করেছি। আসুন কোনো বিতর্ক ছাড়াই গণভোট মেনে নিই। ওই গণভোটের নির্দেশনা অনুযায়ী যে সংস্কার পরিষদ গঠন করার কথা; সংবিধান-আইন মানুষের জন্য। সবকিছু মেনে এই সংসদ গঠিত হয়নি। আমরা আইনের সমঝোতা করেই এখানে এসেছি। সমঝোতা করেছি দেশ ও জনগণের স্বার্থে। 

তিনি আরও বলেন, এখানে আমাদের উদ্দেশ্য মব কালচার ‍সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে। এর তীব্র প্রতিবাদ করছি। যে দলটি ফ্যাসিস্ট আমলে চরম নির্যাতনের শিকার; সেই দলের প্রতি অপবাদ দেওয়া হবে এই সংসদের জন্য লজ্জাকর। 

গত বুধবার বিরোধীদলীয় নেতার মুলতবি প্রস্তাব নিয়ে সংসদে আলোচনা হয়েছিল। সেই প্রস্তাবের পরিণতি কী হয়েছে, তা স্পিকারের কাছে প্রশ্ন রেখে জামায়াত আমির বলেন, এক মুলতবি প্রস্তাব থাকার পর, আরেকটি প্রস্তাব আসতে পারে কিনা? 

আগের অবস্থানই জানাল সরকারি দল

বিরোধীদলীয় নেতার পর সালাহউদ্দিন আহমেদ বক্তৃতার জন্য দাঁড়ালে জামায়াতের হুইপ রফিকুল ইসলাম খান বলেন, অতীতে দেখেছি, বিরোধীদলীয় নেতা বক্তৃতা করার পর সংসদ নেতা বক্তৃতা করেন। এখন দেখা যাচ্ছে বিরোধীদলীয় নেতার পর মন্ত্রীরা বক্তৃতা করছেন। তখন স্পিকার এবং সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, সংসদ নেতার পক্ষে বক্তৃতা করবেন।  

সালাহউদ্দিন জুলাই জাতীয় সনদের গুরুত্বপূর্ণ যেসব প্রস্তাবে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট আছে, সেগুলো তুলে ধরেন। তিনি বলেন, একজন প্রধানমন্ত্রী পদে ১০ বছরের বেশি ক্ষমতায় থাকতে পারবেন না– তারেক রহমানের নির্দেশে এ প্রস্তাব বিএনপিই করেছিল। কারণ তিনি চান না, ব্যক্তিতান্ত্রিক স্বৈরাচার সংসদীয় স্বৈরাচারে পরিণত না হোক। 

এই বক্তব্যের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কৌতুক করে বলেন, বিরোধীদলীয় হাততালি আশা করেছিলাম। তখন বিরোধীদলীয় এমপিরা টেবিল চাপড়ে সমর্থন করেন। 

সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, নোট অব ডিসেন্টসহ যেভাবে সই হয়েছে বিএনপি জুলাই সনদের সব দফা, অঙ্গীকারনামা শতভাগ পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ। এ সময় তিনি জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশকে ‘কালারেবল লেজিসলেশন’ হিসেবে আখ্যা দেন।

তিনি অভিযোগ করেন, সংবিধানের পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম তপশিল বিলুপ্তির প্রস্তাবে ঐকমত্য হয়েছিল। কিন্তু পরে সপ্তম তপশিল বাতিলের প্রস্তাব সনদে রাখা হয়নি। আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপন যুক্ত করা, শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি টানানোর বিধান বাদ দেওয়ার বিষয়েও ঐকমত্য হয়েছিল। কিন্তু এগুলো সনদে রাখা হয়নি। তিনি বলেন, গোঁজামিল দিয়ে গণভোট দেওয়া হয়েছে। 

সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বিএনপি বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। কিন্তু সার্বভৌম বিচার বিভাগ চান না। কারণ সার্বভৌম হলো জনগণ, সংসদ ও দেশ। এর বাইরে কারও সার্বভৌম কর্তৃত্ব থাকতে পারে না। 

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এই সংসদেই বিচার বিভাগের সচিবালয় ও বিচারক নিয়োগের আইন পাস করবেন। সংবিধান সংস্কার হয় না। সংবিধান রহিত হয়, স্থগিত হয়, সংশোধন হয়, বাতিল হয়। সংশোধনের মাধ্যমে সংবিধান পরিবর্তন হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, বিরোধী দল সংবিধানের সংস্কার চায়, সংশোধনী চায় না। পুনর্লিখিত সংবিধান কেউ কেউ চেয়েছিল। যারা বিদেশ থেকে আমদানি হয়েছিল সংস্কার প্রস্তাবসহ। আমরা বলেছিলাম, পুনর্লিখিত সংবিধান, নতুন সংবিধান, গণপরিষদ– এগুলো একই কথা, সংবিধানে যা কিছু গ্রহণ করতে চায় তা সংশোধনীতে আনি। ‘তাল ধপ করে পড়িল, নাকি পড়িয়া ধপ করিল’– একই কথা।

প্রয়াত খালেদা জিয়া বলেছিলেন, ‘এই সংবিধান ছুড়ে ফেলা হবে।’ এই বক্তব্যের বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, এ বক্তব্য রাজনৈতিক রূপক। এর মানে পঞ্চদশ সংশোধন ছুড়ে ফেলা হবে। আমরা তা করেছি। পঞ্চদশ সংশোধনী আংশিক বাতিল হয়েছে আদালতে।

আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন কোন পদ্ধতিতে হবে, তা সনদেই ব্যাখ্যা করা আছে। এটি পরিপূর্ণ স্বচ্ছভাবে রক্তের ঋণ হিসেবে প্রতিফলিত হবে। এটা বাস্তবায়নে অন্য কোনো পদ্ধতির প্রয়োজন নেই। জুলাই বিপ্লব জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন। ৩৩টি দল একমত হয়েছে, আমরা এমন একটি সংবিধান চাই। যেটা বর্তমান সংবিধানকে সামনে রেখে সংযোজন-বিয়োজন ও পরিমার্জন হবে। সেটাই হলো জুলাই সনদ। আমরা এটাই মেনে নিয়েছি। সব সংশোধনই সংস্কার।

আইনমন্ত্রী বলেন, আমরা যদি স্বাধীনতা যুদ্ধ, সংবিধান ও নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানকে অস্বীকার করি, তাহলে ভবিষ্যতে এই জুলাই সনদকে কেউ না কেউ অস্বীকার করবেন। আমরা সে রকম পথ রেখে যেতে চাই না। এজন্যই আমরা বারবার বলছি, জুলাই সনদ নিয়ে রাজনীতি করার দরকার নেই। আপনারা বলছেন, সংস্কার পরিষদ। আমরা বলছি, জুলাই সনদ পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করব। জুলাই সনদ জনগণের মুক্তির সনদ।

অন্যরা যা বলেন 

জামায়াতের এমপি গাজী এনামুল হক বলেন, জুলাই বাস্তবায়ন সনদকে পাশ কাটিয়ে এই প্রস্তাব আনা হয়েছে। এতে সংস্কার শব্দটি আনা হয়নি।

এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন কীভাবে হবে, এই সিদ্ধান্ত ঐকমত্য কমিশনে হয়েছে। সেই আলোচনার ফলাফল আজকে বিএনপি মানতে চায় না। বিএনপি ‘ব্যাক স্পেস’ চেপে  এগিয়ে যাওয়া ঘোড়াকে লাগাম দেওয়ার চেষ্টা করছে। তারা সংস্কারের সবকিছু বাদ দিয়ে নোট অব ডিসেন্টসহ জুলাই সনদের কথা বলছেন। জাতির সঙ্গে প্রতারণা করতে, কোনো একজন ব্যক্তি নিজের মতো করে সনদে নোট অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এই নোটটি কারা অন্তর্ভুক্ত করেছিল, তদন্ত চাই। গণভোটের পক্ষে হ্যাঁ বলার পর, বিএনপির বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া শঠতা। খালেদা জিয়াকে কোনো আইন ও সংবিধানের বলে মুক্তি দেওয়া হয়নি। এটা জনগণের অভিপ্রায়ের ভিত্তিতে হয়েছিল। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশও জনগণের অভিপ্রায় অনুসারে হয়েছে।

বিজেপির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ বলেন, জুলাই সনদের বিষয়গুলো সংবিধানে আসবে। সংসদের রীতিনীতি মেনেই এটা আসবে। জুলাইয়ের বিরুদ্ধে বিএনপি জোটকে দাঁড় করানোর পাঁয়তারা করা হচ্ছে। আমরা গণভোট মানি। বিএনপির মীর মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, জুলাই বাস্তবায়ন আদেশে গলদ রয়েছে।

জামায়াতের  নাজিবুর রহমান বলেন, সংবিধানের দোহাই দিয়ে আপনারা জনরায়কে অবজ্ঞা করছেন। গণরায় ও জনগণের বিপ্লবকে অবজ্ঞা করা হলে প্রকারান্তরে সংবিধানকে অবজ্ঞা করা হয়েছে। জুলাই সনদকে যেভাবে হাসিঠাট্টা করা হচ্ছে– বলা হচ্ছে তা জাতির সঙ্গে প্রতারণার দলিল।

আরও পড়ুন

×