জাতিসংঘ সংস্থার মূল্যায়ন প্রতিবেদন
এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতিতে বড় ঘাটতি
প্রতীকী ছবি
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৬ এপ্রিল ২০২৬ | ১১:৩৩ | আপডেট: ০৬ এপ্রিল ২০২৬ | ১১:৫৩
স্বল্পোন্নত দেশ বা এলডিসি থেকে উত্তরণে বাংলাদেশের প্রস্তুতিতে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। এ অবস্থায় উত্তরণ হলে ইইউ বাজারে রপ্তানি সক্ষমতা অনেক কমবে। রপ্তানি কমলে ব্যাংকে খেলাপি ঋণ আরও বাড়তে পারে, যা বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত করবে। সরকারের আয় কমলে দেশি-বিদেশি ঋণ পরিশোধ করা আরও কঠিন হয়ে পড়বে। সব মিলিয়ে চাপে পড়বে অর্থনীতি।
বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি নিয়ে জাতিসংঘের অঙ্গ সংস্থা ইউনাইটেড নেশনস অফিস অব দ্য হাই রিপ্রেজেনটেটিভ ফর দ্য লিস্ট ডেভেলপমেন্ট কান্ট্রিজ, ল্যান্ডলকড ডেভেলপিং কান্ট্রিজ অ্যান্ড স্মল আইল্যান্ড ডেভেলপিং স্টেটসের (ইউএনওএইচআরএলএলএস) মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এই মত দেওয়া হয়েছে। গতকাল রোববার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে এলিডিসি থেকে উত্তরণ নিয়ে বহুপক্ষীয় পরামর্শ সভায় প্রকাশ করা হয়।
ইআরডি, ইউএনওএইচআরএলএলএস এবং জাতিসংঘের আবাসিক কার্যালয় যৌথভাবে সভার আয়োজন করে। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, ইউএনওএইচআরএলএলএসের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল রাবাব ফাতিমা ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি। এ ছাড়া তৈরি পোশাক খাতের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান ও মোহাম্মদ হাতেম বক্তব্য দেন।
আগামী ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণের চূড়ান্ত ঘোষণা আসার কথা। তবে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরদিনই গত ১৯ ফেব্রুয়ারি উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করে বাংলাদেশ। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে এলডিসি উত্তরণ-প্রস্তুতির সময়কাল ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর অনুরোধ জানানো হয়।
জাতিসংঘের মূল্যায়ন প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন গবেষণা সংস্থা র্যাপিডের চেয়ারম্যান ড. আবদুর রাজ্জাক এবং ইউএনওএইচআরএলএলএসের পরামর্শক ড. ড্যানিয়েল গে। এতে বলা হয়, এলডিসি থেকে উত্তরণের যোগ্যতা হিসেবে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় (জিএনআই), মানবসম্পদ সূচক (এইচএআই) ও অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভঙ্গুরতা সূচকে (ইভিআই) নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করেছে। প্রস্তুতির ক্ষেত্রে এখনও বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে। এ অবস্থায় উত্তরণ হলে অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হবে।
সভা শেষে ব্রিফিংয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের মতো প্রস্তুতি নেই। বৈদেশিক ঋণ ও অভ্যন্তরীণ দেনার চাপ, উচ্চ সুদের হারে ঋণ গ্রহণের ঝুঁকি এবং সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থায় এলডিসি থেকে উত্তরণের কোনা সুযোগ নেই।
মন্ত্রী বলেন, জ্বালানি সংকট ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। এর প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারেও পড়বে, যা মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে তুলবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং বাংলাদেশ এখনও তা নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে। তবে দীর্ঘদিন এই চাপ বহন করা সরকারের জন্য সম্ভব নয়।
মন্ত্রী বলেন, সরকার জনগণের ওপর হঠাৎ অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে চায় না। কিন্তু সরকারি তহবিল থেকে ধারাবাহিক ব্যয় চলতে থাকলে শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব জনগণের ওপরই পড়বে।
এলডিসি থেকে উত্তরণ প্রসঙ্গে মন্ত্রী আরও বলেন, বর্তমানে উত্তরণ প্রক্রিয়া কিছু সময়ের জন্য পিছিয়ে দেওয়ার সুযোগ রয়েছে এবং এই সময়ের মধ্যে দেশের অর্থনীতির মৌলিক সূচকগুলো শক্তিশালী করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন করা গেলে ভবিষ্যতে উত্তরণ একটি বাস্তবসম্মত লক্ষ্য হয়ে উঠবে।
বাংলাদেশের আবেদন বিবেচনা করছে জাতিসংঘ
সভায় ইউএনওএইচআরএলএলএসের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল রাবাব ফাতিমা বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণ প্রশ্নে বাংলাদেশের সময় বৃদ্ধির অনুরোধ জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির এনহান্স মনিটরিং ম্যাকানিজমের আওতায় বিবেচনা করা হচ্ছে। কারিগরি পর্যালোচনা শেষে সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিষদ সুপারিশ করে। সেই সুপারিশের ভিত্তিতে বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণের বিষয়ে সাধারণ পরিষদ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
প্রস্তুতির রোডম্যাপ চান রপ্তানিকারক উদ্যোক্তারা
সভায় তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ সভাপতি উপস্থিত ছিলেন। জানতে চাইলে বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম সমকালকে বলেন, জাতিসংঘের প্রতিবেদনে প্রকৃত বাস্তবতা উঠে এসেছে। ফলে উত্তরণ পেছানো হচ্ছে বলেই তারা ধরে নিচ্ছেন। সরকারের পক্ষ থেকে তিন বছরের সময় চাওয়া হয়েছে। তিন বছর সময় পাওয়া গেলে নতুন করে কীভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে সে ব্যাপারে তারা একটা রোডম্যাপ চেয়েছেন।
- বিষয় :
- এলডিসি
- জাতিসংঘ
- স্বল্পোন্নত দেশ
