পুষ্প
পানচুলিমালা যেন তুষারের ফুল
জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে পানচুলিমালা ফুল। সম্প্রতি তোলা ছবি: লেখক
মৃত্যুঞ্জয় রায়
প্রকাশ: ০৯ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:১৮ | আপডেট: ০৯ এপ্রিল ২০২৬ | ০৯:৩৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
চৈত্রের প্রথম দিকে এক সকালে গেলাম মিরপুরে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে। দেখলাম, জালিয়াডাঙ্গা লেকে কী অসাধারণভাবে ফুটে আছে পানচুলিমালা আর চাঁদমালা ফুল! যেন লেকের জলের ওপর তুষারপাত শুরু হয়েছে। বাতাসে ভেসে আসা তুষারকণার মতো লেকের জলের ওপর ভেসে বেড়াচ্ছে বরফের ফুল। লেকের জলের ওপর বেশ খানিকটা জায়গা ধরে ছড়িয়ে রয়েছে সেসব ফুল আর গাছের ভাসমান পাতা। পাতাগুলো অনেকটা শাপলা পাতার মতোই।
বসন্তের সকালে শুভ্র ফুলের এমন উষ্ণ অভ্যর্থনায় মুগ্ধ হয়ে সেসব গাছের কাছে না গিয়ে পারলাম না। স্বচ্ছ জলের কোলে বসে দেখছি দারকিনা মাছের ডুবসাঁতার, বসন্ত বাতাসে কেঁপে কেঁপে ছোট ছোট ঢেউ তোলা জলের চাতাল, সে চাতালের ওপর অলসভাবে ছড়িয়ে রয়েছে অজস্র সবুজ পাতা। পাতাগুলো প্রায় গোলাকার, বলা যায় হৃৎপিণ্ডাকার। পাতাগুলো জলের ওপর ঘন আচ্ছাদন তৈরি করেছে। সে আচ্ছাদনের ফাঁকে ফাঁকে ভেসে বেড়াচ্ছে জলজ ফার্ন ইন্দুরকানি। সেসব ফার্নের শোভাও কম সুন্দর না।
পানচুলিমালার অন্য নাম চাঁদমোনা। ভোরবেলায় কুঁড়িগুলোর আড়মোড়া দিয়ে ঘুম ভাঙে সকাল ৯টার পর। সম্পূর্ণ ফোটা ফুলগুলো দেখতে তুষারকণার মতো। তাই এর ইংরেজি নাম রাখা হয়েছে Water snowflake, মেনিয়ানথেসি গোত্রের গাছ। মেনিয়ানথেসি গোত্রের বাংলাদেশে অন্তত চারটি প্রজাতির গাছ দেখা যায়, যেমন হলদে চাঁদমালা (Nymphoides auranticum), চাঁদমালা (Nymphoides hydrophylla), ছোট চাঁদমালা (Nymphoides parvifolium) ও পানচুলি (Nymphoides indica)।
হলদে চাঁদমালার ফুল দেখতে পানচুলির মতো, তবে রং হলুদ, ফুল ফোটে অক্টোবর থেকে জানুয়ারি মাসের মধ্যে। নোয়াখালী ও দিনাজপুরে এ গাছ আছে। ছোট চাঁদমালার ফুল ফোটে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে। এ গাছের ফুলগুলো ছোট ও গাছপ্রতি পাতা থাকে মাত্র একটি। হুকার ১৮৮৩ সালে চট্টগ্রাম থেকে ছোট চাঁদমালা গাছ সংগ্রহ করেছিলেন বলে জানা যায়। ধারণা করা হয়, বর্তমানে এটি বিরল অবস্থায় আছে, তেমন চোখে পড়ে না।
পানচুলিমালা একটি বহুবর্ষজীবী কন্দজ জলজ বীরুৎ শ্রেণির লতানো আগাছা; কন্দ বা গোড়ার রাইজোম থাকে জলের তলে কাদার মধ্যে, ভাসমান মুক্ত কন্দও চোখে পড়ে। কন্দ থেকে চারদিকে রশ্মির মতো বেরিয়ে আসে পাতার লম্বা বোঁটাগুলো। বোঁটার মাথায় পাতাগুলো জলতলের ওপর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ফুল খুবই ছোট, ফোটা ফুলের পাপড়ির বিস্তার প্রায় ২ সেন্টিমিটার। সাধারণত ফুলের পাঁচটি পাপড়ি থাকে, কখনও কখনও বেশি থাকতে পারে। পাপড়ির কিনারা সূক্ষ্ম সুতার ঝালরের মতো, দেখতে অনেকটা চিচিঙ্গা ফুলের মতো। চিচিঙ্গা ফুলের সঙ্গে এর পার্থক্য হলো, এর কেন্দ্রস্থল হলুদ। ফুল সকালে ফুটে বিকেলেই বুজে যায়, এক দিনের ফুল হলেও দিনের পর দিন ফুটতে থাকে। ফুল ও ফল ধরার সময় কার্তিক থেকে চৈত্র। ফল গোলাকার ক্যাপসুল। বীজ ও গোড়ার মোথা বা রাইজোম দিয়ে বংশবৃদ্ধি ঘটে।
পানচুলিমালা ও চাঁদমালা উষ্ণমণ্ডলীয় উদ্ভিদ। আদি নিবাস যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস থেকে মেরিল্যান্ড পর্যন্ত বিস্তৃত। আফ্রিকা, এশিয়া, অস্ট্রেলিয়ার অনেক স্থানে এ গাছ আছে। এটি বাংলাদেশের জলজ আগাছা, লালিত না হলেও জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে মনে হয় না প্রাকৃতিকভাবে জন্মেছে। কেউ হয়তো সেগুলো লাগিয়েছেন। এ দেশের বিলে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো পানচুলিমালা ও চাঁদমালা গাছ অনেক দেখা যায়। ছাদে বা ব্যালকনিতে ছোট্ট জলাধারে বা পাত্রে জলমাটি দিয়ে একে চমৎকারভাবে লালন করা যায়। একবার টিকে গেলে কয়েক বছর সেসব গাছে ফুল ফুটবে। মনোহর সেসব ফুল জলের অন্যান্য গাছের সঙ্গে তুলবে জলের গানের সুর।
লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ
