ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি অপসারণ ও প্রশাসক নিয়ােগে বিল পাস

স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি অপসারণ ও প্রশাসক নিয়ােগে বিল পাস
×

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১০ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:৫৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ‘বিশেষ পরিস্থিতিতে বা জনস্বার্থে’ অপসারণ করে ‘উপযুক্ত ব্যক্তিকে’ প্রশাসক নিয়াগের বিধান সুযোগ রেখে জেলা, উপজেলা, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ বিল পাস হয়েছে। একে ‘স্থানীয় সরকার দখল’ আখ্যা দিয়ে প্রতিবাদে ওয়াকআউট করেছে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী জোট। পরে ফিরে বগুড়া-৬ ও শেরপুর-৩ আসনের ভোটে জালিয়াতির অভিযোগ করেন তারা।

গতকাল বৃহস্পতিবার সংসদের বৈঠকে পৃথকভাবে পাঁচটি বিল পাসের প্রস্তাব করেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। এগুলোসহ ৩১টি বিল পাস হয়। এর মধ্যে ৮টি বিলে বিরোধী দলের আপত্তি ছিল। তারা প্রশ্ন তোলেন, ‘বিশেষ পরিস্থিতি’ এবং ‘উপযুক্ত ব্যক্তি’র ব্যাখ্যা কী? এর মাধ্যমে সরকারি দলের নেতাদের পরিবারের সদস্যদের প্রশাসক নিয়োগ করা হবে। 
প্রতিমন্ত্রী যুক্তি দেন, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা স্থানীয় সরকারের অধ্যাদেশগুলো পাস না করলে, আওয়ামী লীগের বিতর্কিত প্রতিনিধিরা দায়িত্বে ফিরবেন। গণঅভ্যুত্থানের পর তাদের বিশেষ পরিস্থিতিতে অপসারণ করা হয়েছিল। বিল পাস করলেও, সরকার দ্রুত স্থানীয় নির্বাচন আয়োজন করবে। দলীয় প্রতীকে আর স্থানীয় নির্বাচন হবে না।

‘সংবিধানবিরোধী’ বিল পাসের অভিযোগ করে সন্ধ্যা ৬টার কিছুক্ষণ আগে বিরোধী দল ওয়াকআউট করে। ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল তখন সংসদের বৈঠকের সভাপতিত্ব করছিলেন। মাগরিবের নামাজের বিরতির পর বিরোধী দল সংসদে ফিরে ওয়াকআউটের ‘কটূক্তি’ করা হয়েছে দাবি করে স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। 
সংসদের পরিবেশ নষ্ট হয়–ভবিষ্যতে এ ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে অনুরোধ জানান বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। তখন ফ্লোর চান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। ডেপুটি স্পিকার বলেন, বিরোধীদলীয় নেতার পর সংসদ নেতা ফ্লোর চাইলে দিতে পারতেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বসার অনুরোধ করেন ডেপুটি স্পিকার। কিন্তু তিনি দাঁড়িয়ে ফ্লোর চাইতে থাকেন। পরে সুযোগ দিলে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, সংসদ কক্ষে কাউকে সমালোচনা করা হয়নি। বিলগুলো পাসে সহযোগিতার জন্য বিরোধী দলকে ধন্যবাদ জানানো হয়েছে।
বগুড়া ও শেরপুরের ভোট নিয়ে অভিযোগ
সংসদ নির্বাচনে পরাজিত বিএনপি নেতাদের কয়েকজনকে সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে নিয়োগের উদাহরণ দিয়েছেন জামায়াতের এমপি নাজিবুর রহমান। বগুড়া-৬ ও শেরপুর-৩ আসনের ভোটের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, মানুষ বলছে, ১৯৯৪-এ ছিল মাগুরা, ২০২৬ সালে হলো বগুড়া। 

শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন প্রসঙ্গে জামায়াতের এমপি রাশেদুল ইসলাম বলেন, প্রতিমন্ত্রী একটি অসত্য তথ্য দিয়েছেন সংসদে। জামায়াত প্রার্থী নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন। বিগত ফ্যাসিস্ট আমলের মতো, হামলা জখম করা হয়েছে শেরপুরে। ভোট কারচুপি হয়েছে। সিল মারা হয়েছে। প্রশাসনকে অভিযোগের প্রতিকার করার আগেই রফাদফা হয়ে যাচ্ছে।
গতকাল অনুষ্ঠিত দুটি আসনের নির্বাচনের বিষয়ে এনসিপির হান্নান মাসউদ বলেন, উপনির্বাচনে বিরোধী দলীয় এজেন্টদের ভোটকেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। আহত করা হয়েছে। শিশুদের লাইনে দাঁড় করিয়ে ভোট দেওয়ানো হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে দেশকে আরেকবার সংকটে ফেলা হচ্ছে।

মাগুরা উপনির্বাচনের কথা উল্লেখ করে হান্নান বলেন, ট্রেজারি বেঞ্চের নেতারা বারবার দেশের গণতন্ত্রকে হত্যার চেষ্টা করেছেন। তারা ব্যর্থ হয়েছেন, আওয়ামী লীগের মতো সফল হতে পারেননি। 
বিরোধীদের জবাব দিয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম বলেন, বিকেল ৪টার পর আপনারা বুঝলেন ভোট কারচুপি হয়েছে! যখন নিশ্চিত হয়েছেন পরাজয় নিশ্চিত, তখন ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন। গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখতে নির্বাচন বয়কটের পুরান রেওয়াজ থেকে সরে আসুন।

‘গণবিরোধী বিল’ আখ্যা বিরোধীদলীয় নেতার
পৌরসভা সংশোধন বিল পাসের আগে শফিকুর রহমান ফ্লোর নিয়ে বলেন, দুঃখজনক হলেও সত্য, যৌক্তিক বাধা সত্ত্বেও যে কয়টি গণবিরোধী বিল আজকে পাস হয়েছে, আমরা এর দায় নিতে চাই না। 
বিরোধী দলের ওয়াকআউটের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সব প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের পরে ওয়াকআউটের কোনো মানে আছে কিনা, এটা জানার জন্য উঠেছি। 
পরে সাংবাদিকদের এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, যে অধ্যাদেশগুলো সরকারের ক্ষমতাকে বাড়াতে পারে, তারা কেবল সেগুলো পাস করছে। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়, মানবাধিকার কমিশনের মতো অধ্যাদেশ পাস করছে না। এ দ্বিমুখী অবস্থান দেশের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনতে পারে না। সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় একতরফাভাবে আইন পাস করছে সরকার। 
স্থানীয় সরকার প্রশাসক নিয়োগের অধ্যাদেশটি সংবিধানবহির্ভূত এবং ‘রাষ্ট্রপতিকে জোর করে পারানো হয়েছিল’–স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন বক্তব্য উল্লেখ করে নাজিবুর রহমান বলেন, যে অধ্যাদেশ এখন আইন হিসেবে পরিগণিত করার জন্য বিল আনা হয়েছে, সেটিও আসলে রাষ্ট্রপতি পারতেন না, তাকে দিয়ে জোর করে করানো হয়েছে।

বিশেষ পরিস্থিতিতে পৌরসভার মেয়র ও কাউন্সিলর অপসারণের ক্ষমতা সরকারকে দেওয়ার বিরোধিতা করে নাজিবুর রহমান বলেন, স্থানীয় সরকারে অনির্বাচিত প্রশাসক বসানোর বিধান কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। অন্তর্বর্তী সরকার বিশেষ পরিস্থিতিতে অধ্যাদেশটি করেছিল। বিলটির মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিকে সরিয়ে দিয়ে অনির্বাচিত প্রশাসক বসানোর রাস্তা খোলা হলো। 
জামায়াতের গাজী এনামুল হক জেলা পরিষদ বিলে আপত্তি করে বলেন, সংবিধানের তিনটি অনুচ্ছেদের সুনির্দিষ্ট ব্যত্যয় ঘটেছে। সংবিধানের সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদ এবং উচ্চ আদালতের একাধিক মামলার রায় তুলে ধরে এনামুল হক বলেন, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বাদ দিয়ে প্রশাসক নিয়োগ অবৈধ। বিশেষ পরিস্থিতির বিধান এসেছিল অভ্যুত্থানের পরের পরিস্থিতির কারণে। কিন্তু নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদ গঠিত হওয়ার পর স্থিতিশীল সময়ে এই প্রয়োজন নেই। স্থানীয় সরকার এখন ‘ফেইলড ও বঞ্চিত’ লোকদের ক্লাবে পরিণত হচ্ছে।

উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যানদের অপসারণ এবং প্রশাসক নিয়োগের ক্ষমতা সরকারকে দিয়ে উত্থাপিত বিলের আপত্তিতে জামায়াতের রাশেদুল ইসলাম বলেন, সরকারি দলের সদস্যরা বাস্তবতা উপলব্ধি করলে বিগত ১৭ বছরের ইতিহাসের ইতি টেনে চমৎকার করে বিল আনতেন। এভাবে সাজানো পরিকল্পনার উদ্যোগ নেওয়া হলে নির্বাচনের আর কী দরকার। বিগত দিনের মতো সাজানো নির্বাচন হতে পারে। 
সিটি করপোরেশন বিলে আপত্তি জানিয়ে হান্নান মাসউদ বলেন, বিশেষ পরিস্থিতি বলতে কি দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে না পারলে, নাকি অবৈধ সুবিধা না দিলে অপসারণ করা হবে, সে ব্যাখ্যা নেই। ‘উপযুক্ত ব্যক্তি’ বলতে কি দলীয় নেতা নাকি লাঠিয়াল নাকি মন্ত্রী-এমপির সন্তান হলেই হবে?
জবাবে মীর শাহে আলম বলেন, আইন পাস না হওয়া পর্যন্ত যেহেতু নির্বাচন দেওয়া যাচ্ছে না, তাই এটি বিশেষ পরিস্থিতি। এ কারণেই আমরা প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছি।

আরও পড়ুন

×