ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

৯টা-৫টা সরকারি অফিস

বেড়েছে উপস্থিতি, সচেতনতা কম

বেড়েছে উপস্থিতি, সচেতনতা কম
×

রোববার সচিবালয়ের ৬ নম্বর ভবনের লিফটে মাস্ক ছাড়াই গাদাগাদি করে দাঁড়িয়েছিলেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা-সমকাল

দেলওয়ার হোসেন

প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ২৩ আগস্ট ২০২০ | ২০:২১

করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে ৪ আগস্ট লকডাউন তুলে সরকারি সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ৯টা থেকে ৫টা অফিস করার নির্দেশনা দিয়েছে সরকার। ওই নির্দেশনা অনুযায়ী অনুবিভাগ ও অধিশাখার প্রধান এবং দপ্তরপ্রধানকে আবশ্যিকভাবে অফিসে অবস্থান করার জন্য চিঠি দিয়েছে প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তি, অসুস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সন্তানসম্ভবা নারী ছাড়া সবাইকে অফিসে অবস্থানের জন্য চিঠিতে বলা হয়েছে। এতে উপস্থিতির হার বেড়েছে অনেক; কিন্তু কমেছে সচেতনতা। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের ১২টি স্বাস্থ্যবিধির বেশিরভাগই মানা হচ্ছে না প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়েই। অন্যান্য দপ্তর ও মাঠপর্যায়েও স্বাস্থ্যবিধি ব্যাপকভাবে উপেক্ষা করা হচ্ছে। এর ফলে সরকারি দপ্তরে করোনা সংক্রমণ বাড়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ থেকে দেশব্যাপী করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব এবং ব্যাপক বিস্তার রোধকল্পে সব পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীর স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করার কথা বলা হলেও গত এক সপ্তাহ সচিবালয়সহ রাজধানীর সরকারি বিভিন্ন দপ্তর সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, সরকারি সব দপ্তরেই স্বাস্থ্যবিধি ব্যাপকভাবে উপেক্ষা করা হচ্ছে। করোনা সংক্রমণের শুরু থেকে ঈদের আগে পর্যন্ত সচিবালয় ক্লিনিকের উদ্যোগে সচিবালয়ের প্রবেশপথে থার্মোমিটার দিয়ে তাপমাত্রা মাপা হলেও ঈদের পর তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্রবেশপথে হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে হাত পরিস্কারের কার্যক্রমও বন্ধ রয়েছে। খোদ স্বাস্থ্য ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের শৌচাগারগুলোতে সাবান ছিল না। তথ্য ও জনপ্রশাসনসহ বেশিরভাগ মন্ত্রণালয়ের টয়লেটে জমেছে ময়লার স্তূপ। তথ্য, স্বাস্থ্য, জনপ্রশাসন ছাড়াও অনেক মন্ত্রণালয় ও বিভাগে এমন চিত্র দেখা গেছে। মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও অধিদপ্তরের কিছু শৌচাগারে তরল সাবান রাখার বক্স থাকলেও সেগুলো ছিল ফাঁকা। করোনাকালে সচিবালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে নতুন নতুন বেসিন তৈরি করা হলেও অফিস চালুর পর তা অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে। সচিবালয়ের ৪ নম্বর ভবনে প্রবেশপথের পাশে নতুন বেসিনের নিচে ময়লার স্তূপ জমে ছিল। বেসিনের পাশে সাবান রাখার বক্সে ছিল না কোনো সাবান। একই চিত্র দেখা যায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, শ্রম অধিদপ্তর, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরসহ অনেক দপ্তরে। খোদ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের শৌচাগারে তরল সাবান রাখার বক্স থাকলেও সেগুলো ছিল ফাঁকা। স্বাস্থ্যবিধি নিয়মিত মেনে চলছে কিনা তা মনে করিয়ে দিতে ভিজিলেন্স টিমের মাধ্যমে মনিটরিং কার্যক্রম পরিচালনা করার কথা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। দৃশ্যমান স্থানে স্বাস্থ্য সুরক্ষার নির্দেশনাও ঝুলিয়ে রাখা হয়নি অনেক দপ্তরে। এভাবে প্রায় প্রতিটি মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর ও দপ্তরে স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করা হচ্ছে। এতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে সচেতনতাও কমেছে। শর্তসাপেক্ষে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের আলাদা আদেশেও বলা হয়েছে।

সচেতনতার অভাবে অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী এখন করোনা উপসর্গ নিয়ে নিশ্চিন্তে অফিস করছেন। কঠিন উপসর্গ থাকার পরও কেউ কেউ পরীক্ষা করছেন না। ডাক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) সুধাংশু শেখর ভদ্রের করোনা টেস্টে পজিটিভ হওয়ার পরও ১৪ আগস্ট গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে এক অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম সমকালকে বলেন, সরকারি সেবা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে গতি আনতে সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অফিস করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিজ নিজ মন্ত্রণালয় ও বিভাগ এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন করছে। সরকার গঠিত করোনাবিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির আহ্বায়ক ও বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক মোহাম্মদ সহিদুল্লাহ সমকালকে বলেন, স্বাস্থ্যবিধিগুলো অবশ্যই মেনে চলতে হবে। তবে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের স্বাস্থ্যবিধি-সংক্রান্ত সর্বশেষ নির্দেশনাটি যেহেতু ৩০ মে জারি করা হয়েছিল, তাই কিছু বিষয় সংশোধন হতে পারে। তিনি বলেন, মাস্ক পরিধান, শারীরিক দূরত্ব, সাবান দিয়ে বেশি বেশি হাত ধোয়া, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার, অফিস ও যানবাহন জীবাণুমুক্ত রাখা এবং সব সময় টয়লেট পরিস্কার রাখতে হবে। কর্মস্থলে সব কর্মকর্তা-কর্মচারী উপস্থিতির এই সময়ে স্বাস্থ্যবিধির এই বিষয়গুলোর একটিও অমান্য হলে সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যাবে। তাই স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়টি কঠোরভাবে নজরদারি করতে হবে। সচিবালয় ক্লিনিকের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ইলিয়াছ চৌধুরী বলেন, স্বাস্থ্যবিধিগুলো অবশ্যই মেনে চলতে হবে। এজন্য মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে নিজ উদ্যোগে ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ, সচিবালয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা অনেক; কিন্তু ক্লিনিকের জনবল খুবই কম। ফলে ক্লিনিকের উদ্যোগে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এর মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা দিতে গিয়ে গত ২৮ জুলাই স্যানিটারি ইন্সপেক্টর মৌসুমী মণ্ডল করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।

মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর বৈঠক ভার্চুয়াল মাধ্যমে হলেও পুরোদমে অফিস করছেন সবাই। সব কর্মকর্তা-কর্মচারী অফিস করার পরও স্বাস্থ্যবিধি মানতে ঢিলেঢালা চিত্র দেখা যায়। মূল প্রবেশপথে জীবাণুমুক্তকরণ টানেল বসানো হয়নি। তাপমাত্রা না মেপেও ঢুকছেন নিজ নিজ দপ্তরে। সচিবালয়ে লিফটগুলোতে সামাজিক দূরত্বের নির্দেশনা মানা হচ্ছে না। সচিবালয়ে পার্কিং ব্যবস্থা রয়েছে মাত্র এক হাজার গাড়ির। কিন্তু পাস দেওয়া হয়েছে সাড়ে ছয় হাজার। ফলে করোনাকালীন এই সময়েও অফিস টাইমে সচিবালয়ে হাঁটার জায়গা থাকে না। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ১২ দফা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য সরকারি সব অফিসে চিঠি দেওয়া হয়েছে। সমকালের ২০ জনের অধিক জেলা প্রতিনিধি জানিয়েছেন, মাঠ প্রশাসনের অফিসগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি না মেনেই অফিস করছেন বেশিরভাগ কর্মকর্তা-কর্মচারী।

তবে কর্মকর্তাদের অন্যের রুমে যাওয়া কমে গেছে। জরুরি প্রয়োজনে তারা ইন্টারকমে কথা বলছেন। দর্শনার্থী পাসও বন্ধ রয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী জানান, অফিসে ঢোকার সময় তাদের শরীরের তাপমাত্রা দেখা হয় না। সচিবালয়ের ভেতরে সংক্রমণ ঠেকাতে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। নিজ উদ্যোগে মাস্ক পরা ছাড়া আর কোনো ব্যবস্থাই জোরালো নেই। একেক কক্ষে পাঁচ-ছয়জন করে বসায় সামাজিক দূরত্ব রক্ষা সম্ভব হচ্ছে না। স্বাস্থ্য, জনপ্রশাসন, স্বরাষ্ট্র, সমাজকল্যাণ, ধর্ম ও যুব মন্ত্রণালয় ঘুরে এমন চিত্র দেখা যায়।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, সংক্রমণ আরও কমাতে হলে স্বাস্থ্যবিধি অবশ্যই মেনে চলতে হবে। সরকারি দপ্তরের টয়লেটগুলো সবসময় পরিস্কার রাখতে হবে। বাধ্যতামূলক মাস্ক পরতে হবে; শারীরিক ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে; অসুস্থ হলে করোনা পরীক্ষা করাতে হবে।

স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ সমকালকে বলেন, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনার পর মন্ত্রণালয়ের সব কর্মকর্তা-কর্মচারী সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত অফিস করছেন। অসুস্থ বা অন্য সমস্যা রয়েছে এমন কয়েকজনকে ছুটি দেওয়া হয়েছে। বেশি প্রয়োজন হলে আইসোলেশন বা কোয়ারেন্টাইনে থাকছে। প্রত্যেকে মাস্ক পরিধান করছে, হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে হাত পরিস্কার করছে। যতটুকু সম্ভব শারীরিক দূরত্ব মেনে চলছে। আগে যেসব রুমে পাঁচ থেকে ছয়জন বসত, এখন দুই থেকে তিনজন বসছে। অনেক দপ্তরে কর্মকর্তাদের রুমে কর্মচারীদের বসানো হচ্ছে। ঈদের পর পুরোদমে অফিস চালুর পর করোনা সংক্রমণও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সবার উপস্থিতিতে অফিস শুরু হওয়ার পর মাত্র একজন কর্মকর্তা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছেন। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. মাহবুব হোসেন বলেন, স্বাভাবিক পরিস্থিতির মতোই সবাই অফিস করছেন। মন্ত্রণালয়ের সব ধরনের সেবাও দেওয়া হচ্ছে। শুধু পাঠ্যক্রম বন্ধ রয়েছে। নিজেদের নিরাপত্তার জন্যই কর্মকর্তা-কর্মচারীরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নাসিরুজ্জামান বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য প্রত্যেক কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের ৩৫০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী এর মধ্যে করোনা আক্রান্ত হয়ে আটজন মারা গেছেন। একই কথা বলেন আরও ১০টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিব।

আরও পড়ুন

×