ট্রাম্প হরমুজে বাজি ধরছেন, ঢাকার ফারুক যুদ্ধের কথা বলে ঋণ করছেন
ঢাকার একটি ফিলিং স্টেশনের সামনের সড়কে মোটরসাইকেল চালকদের সারি। ছবি: আনাদোলু এজেন্সি
সাদিকুর রহমান
প্রকাশ: ১৭ এপ্রিল ২০২৬ | ১৮:১১ | আপডেট: ১৭ এপ্রিল ২০২৬ | ১৮:৩২
ঢাকার মহানগর আবাসিক এলাকার পাশের টিনশেডের একটি ভাড়া বাড়িতে থাকেন মোহাম্মদ আলম। শুক্রবার দুপুরে সেখান থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরে তেজগাঁওয়ের একটি বহুতল ভবনের ছায়ায় বসে ছিলেন তিনি। পাশের সড়কে দাঁড় করানো তাঁর মোটরসাইকেলের তেলের ট্যাংকিতে পড়া রোদ তখন চকচক করছিল।
মোটরসাইকেলটি কতক্ষণ ধরে এভাবে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন? আলমকে যখন এমন প্রশ্ন করা হলো তখন তিনি হাত দিয়ে কপালে জমা ঘাম মোছার চেষ্টা করছিলেন। পরে বললেন, ‘সকাল সাড়ে দশটার আগে এসেছি। এখন আজান (দুপুর ১২টা) দিল।’
আলমের এই অপেক্ষা মোটরসাইকেলের জ্বালানি নেওয়ার জন্য। রাজধানীতে তিনি রাইড শেয়ার করে জীবিকা নির্বাহ করেন। হরমুজ প্রণালি বন্ধ ও জ্বালানি সরবরাহ সংকট শুরুর পর থেকে আয় নিয়ে টানাটানিতে আছেন। সবচেয়ে বড় সমস্যায় পড়ছেন শারীরিকভাবে। নূন্যতম আয় করতেও এখন তাঁকে দিনে ১৬ থেকে ১৭ ঘণ্টা কাজ করতে হচ্ছে। আগে এটি ৮ থেকে ১০ ঘণ্টায় সীমাবদ্ধ ছিল।
তেজগাঁও শিল্প এলাকায় আলমের সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল তখন, সেখানকার সিটি ফিলিং স্টেশনে তেল বিক্রি কেবল শুরু হয়েছে। বাইকের দীর্ঘ সারিতে তিনি ছিলেন প্রায় মাঝামাঝি অবস্থানে। সামনে তখনো অর্ধশতাধিক মোটরসাইকেল। এ সুযোগে মধ্যবয়সী এই বাইক রাইডার জানালেন গত দেড় মাসে জীবনযাপন বদলে যাওয়ার গল্প।
‘এখানে যুদ্ধের চেয়েও বেশি ক্ষতি হচ্ছে। একমাস আগেও আমার গড় আয় ছিল ২০ হাজার টাকা। এখন ৩০ দিন পরিশ্রম করেও ১২-১৩ হাজার টাকা ওঠে না। জ্বালানি ঘাটতির কারণে যত দিন যাচ্ছে আমার অবস্থা ততই খারাপ হচ্ছে।’
_1776427643.jpg)
আলম যখন এসব কথা বলছিলেন, তখন পাশেই বসে ছিলেন ফারুক হোসেন। তিনিও রাইড শেয়ারের কাজ করেন। গত বুধবার বিকেলে সিটি ফিলিং স্টেশনে গিয়ে তাঁর তেল কিনতে সময় লেগেছিল প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা। সরকারি-বেসরকারি অফিস ছুটির কারণে সড়কে যাত্রীর ভিড় থাকলেও তা কাজে লাগাতে পারেননি। শুক্রবার দুপুরে এক যাত্রীকে ফিলিং স্টেশনের পাশে নামিয়ে দেওয়া পর্যন্ত তাঁর আয়ের পরিমাণ ছিল মাত্র তিন’শ টাকা।
ফারুক বলেন, ‘যুদ্ধ হচ্ছে কয়েক হাজার মাইল দূরে। কিন্তু এখানে আমার অবস্থা এমন যে- পেশাটাও বদলাতে পারছি না। অন্য কোনো পেশায় তাৎক্ষণিক বেশি আয় করাও সম্ভব না। সবচেয়ে বড় কথা নতুন কোনো কাজ পাওয়াটাই এখন বড় সমস্যা।’
‘যুদ্ধের কথা বলে ঋণ করছি’
গত জানুয়ারি মাসেও ২০-২৫ হাজার টাকায় চার সদস্যের পরিবার চালানো ফারুক হোসেন মার্চ মাস শেষে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণের মধ্যে পড়েছেন। মার্চ মাসে রাইড শেয়ার করে তাঁর আয় ছিল প্রায় ১৪ হাজার টাকা।
ফারুক বলেন, ‘এই ঘাটতি মেটানোর একটাই উপায়- ধার করা। গ্রামের আত্মীয়-স্বজনদের বলতে হয়েছে, যুদ্ধের কারণে ঢাকায় সমস্যায় আছি। তারা যতটুকু সাহায্য করেছে, সেটাই আমার ঋণ। কিছুদিন পর শোধও করতে হবে। কিন্তু এই অবস্থা তো বদলাচ্ছে না।’
হরমুজ প্রণালি ঘিরে দ্রুতই অচলাবস্থা কাটার স্পষ্ট ইঙ্গিত এখনো নেই। বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ও ইসরায়েলের মন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ হুমকি দিয়েছেন, ইরান চুক্তি না করলে ফের হামলা শুরু হবে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ অবরোধও চলবে। বিপরীতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলছেন, ‘ইরান যুদ্ধ দ্রুতই শেষ হবে।’
যুদ্ধ ও হরমুজ ঘিরে ট্রাম্প প্রশাসনের এই বিপরীতমুখী বক্তব্যকে এক ধরনের বাজি হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। তাদের ধারণা এমন বিভ্রান্তিমূলক বক্তব্য জ্বালানির বিশ্ববাজারে দামের উত্থান-পতন নিয়ন্ত্রণ এবং ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তির দরকষাকষিতে প্রভাব ফেলবে। জাহাজ চলাচল ও বাজারের তথ্য বিশ্লেষণকারীদের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, হরমুজ প্রণালি সচল হলেও আমদানিনির্ভর এশিয়ার দেশগুলোতে সংকট দ্রুত কাটবে না। জ্বালানি পরিবহন, খালাস ও তা বাজার পর্যন্ত পৌঁছানোটা সময় সাপেক্ষ।
আলম-ফারুকের মিল ভিয়েতনামে
ঢাকার রামপুরার আলম ও ফারুকের মতো একই দশা ভিয়েতনামের বাইক রাইডারদেরও। সম্প্রতি এনগুয়েন নামে একজন রাইডারের সাক্ষাৎকার প্রকাশ করে কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আলজাজিরা। গত ৬ এপ্রিল হো চি মিন সিটির একটি ফিলিং স্টেশনে তিনি বলেন, প্রায় সাত থেকে আট ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে আয় হয়েছিল ২ লাখ ৪০ হাজার ভিয়েতনামিজ ডং (প্রায় এগারো’শ টাকা)। কিন্তু এর মধ্যে ১ লাখ ২০ হাজার ডং-ই পেট্রলের পেছনে খরচ হয়েছে।
_1776427552.jpg)
ওই প্রতিবেদনে আলজাজিরা লিখে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের ঢেউ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে ভিয়েতনামের হো চি মিন সিটির মতো শহরে এখন মোটরসাইকেলে চলাচল বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে।
হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানিবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ হওয়া মানে কেবলই তেলের অভাব নয়। বরং এটি একটি মানবিক সংকট। যেটির ভুক্তভোগী আলম, ফারুক ও এনগুয়েনের মতো স্বল্প আয়ের মানুষরা। যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক পরিষেবার প্রতিষ্ঠান জেপি মরগানের বিশ্লেষকরা বলছেন, করোনাকালের মতোই চলমান সংকটের ধাক্কা ধাপে ধাপে আসছে। মার্চ মাসের তুলনায় এশিয়ার দেশগুলোতে এপ্রিলে সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে।
সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্চ মাসের শেষ দিকে প্রকাশিত এক গবেষণা নোটে জেপি মরগানের বিশ্লেষকরা এশিয়ার দেশগুলো নিয়ে এমন পূর্বাভাস দিয়েছেন। যুক্তি হিসেবে তারা বলছেন, এশিয়ায় অপরিশোধিত তেলের সবশেষ চালানগুলো গিয়েছে যুদ্ধ শুরুর আগে। সেগুলোর মজুত এপ্রিলেই শেষ হতে পারে।
সরকার যা বলছে
শুক্রবার বাংলাদেশের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে আমদানিকৃত সব জ্বালানি দেশে এসেছে। এপ্রিল ও মে মাসের জ্বালানি চাহিদা মেটানোর পূর্ণ সক্ষমতা আছে। বর্তমানে জুন মাসের চাহিদা মাথায় রেখে পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিতের কাজ চলছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকার বিকল্প উৎস থেকে পরিশোধিত এবং অপরিশোধিত জ্বালানি আমদানির চেষ্টা করছে।
গত বুধবার জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ও যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী জানিয়েছিলেন, দেশে অকটেন ও পেট্রলের মজুত যা আছে তা দিয়ে আগামী দুই মাসেও কোনো সমস্যা হবে না। বর্তমানে ডিজেল এক লাখ ১৩ হাজার ৮৫ টন, অকটেন ৩১ হাজার ৮২১ টন, পেট্রল ১৮ হাজার ২১ টন এবং ফার্নেস অয়েলের মজুত আছে ৭৭ হাজার ৫৪৬ টন।
