গরমের সঙ্গে বাড়ছে লোডশেডিং শিল্প উৎপাদন বিঘ্নিত, দুর্ভোগ
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২১ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:৫২ | আপডেট: ২১ এপ্রিল ২০২৬ | ১৩:৩৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
তীব্র গরমের মধ্যে দেশজুড়ে লোডশেডিংয়ের দাপটে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। দিনভর ভোগান্তির পর রাতেও মিলছে না স্বস্তি। দিনে-রাতে সমানতালে বিদ্যুৎ বিভ্রাটে স্থবির হয়ে পড়েছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। শহরের তুলনায় গ্রামে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ নেই, কোথাও আবার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অর্ধেক সময়ই অন্ধকারে কাটাতে হচ্ছে। কৃষি, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে শিক্ষাক্ষেত্র– সবখানেই এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গরম যত বাড়ছে, লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি তত বাড়ছে।
দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যাওয়ায় সর্বত্রই লোডশেডিং বেড়েছে। কোথাও ৩০ শতাংশ, কোথাও ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ঘাটতি থাকায় বাধ্য হয়ে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকছে। এপ্রিলেই এই অবস্থা হলে আগামী মে-জুনে পরিস্থিতি কী হবে, তা নিয়ে চিন্তিত বিদ্যুৎ বিভাগ।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি (পিজিসিবি) কোম্পানির সূত্র বলছে, গতকাল সোমবার সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল এক হাজার ৯৩২ মেগাওয়াট। গতকাল সন্ধ্যা ৬টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৩৩০ মেগাওয়াট, ঘাটতি ছিল এক হাজার ৩৫৮ মেগাওয়াট। এ সময় গ্যাসচালিত কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ আসে চার হাজার ৫৭৪ মেগাওয়াট।
রোববার সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ২৫০ মেগাওয়াট। লোডশেডিং হয় এক হাজার ৭৩০ মেগাওয়াট। শনিবার সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৭২৫ মেগাওয়াট, ঘাটতি ছিল এক হাজার ২৫০ মেগাওয়াট।
গত রোববার বিদ্যুৎ উৎপাদনে ৯২ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করে পেট্রোবাংলা। যেখানে পিডিবির চাহিদা কমপক্ষে ১০০ কোটি ঘনফুট। এদিনের তথ্য বলছে, কয়লা স্বল্পতা থেকে ৬১২ মেগাওয়াট, গ্যাস ও তেল ঘাটতির কারণে প্রায় পাঁচ হাজার মেগাওয়াট এবং মেরামতের কারণে এক হাজার ৮১২ মেগাওয়াট উৎপাদন বন্ধ ছিল।
পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) জহুরুল ইসলাম বলেন, রোববার মাতারবাড়ী কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ আসে ৯৩৫ মেগাওয়াট এবং এসএস পাওয়ার থেকে আসে ৬১২ মেগাওয়াট। অন্যান্য বড় কয়লা কেন্দ্র সক্ষমতা অনুসারে উৎপাদন ধরে রেখেছে। পর্যাপ্ত জ্বালানি পেলে ঘাটতি থাকত না।
গ্রামাঞ্চলের পরিস্থিতি ভয়াবহ
নওগাঁর রাণীনগর উপজেলায় চাহিদার তুলনায় অর্ধেক বিদ্যুৎ সরবরাহ হওয়ায় পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার নিয়েছে। দৈনিক প্রায় ২০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ মিলছে ১০ মেগাওয়াট। ফলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় অর্ধেক সময় বিদ্যুৎ থাকছে না।
উপজেলার কালীগ্রাম এলাকার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, ১ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকলে দুই-তিন ঘণ্টা থাকে না। কখন যাবে বা আসবে, তার কোনো ঠিক নেই। সেচনির্ভর বোরো মৌসুমে এই সংকট কৃষকদের জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কুমিল্লা শহরে তুলনামূলক লোডশেডিং কম হলেও গ্রামের চিত্র উল্টো। অনেক উপজেলায় দিনে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। দৌলতপুর এলাকার গৃহিণী শারমিন আক্তার বলেন, ২৪ ঘণ্টায় কয়েকবার বিদ্যুৎ যায়। রাতে দীর্ঘ সময় থাকে না। গরমে থাকা যায় না। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, চাহিদার তুলনায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ ঘাটতির কারণে নিয়মিত লোডশেডিং করতে হচ্ছে। এতে সেচপাম্প বন্ধ থাকায় কৃষকরা বিপাকে পড়েছেন, পাশাপাশি শিল্পকারখানার উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে।
পাবনায় বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা নেমে এসেছে। দিনে-রাতে পাঁচ থেকে ছয়বার লোডশেডিং হচ্ছে। প্রতিবারই প্রায় এক ঘণ্টা বা তার বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকে না। কাপড় ব্যবসায়ী সবুজ হোসেন বলেন, বিদ্যুৎ না থাকলে ক্রেতারা দোকানে বসে না। দিনে চার-পাঁচবার বিদ্যুৎ গেলে ব্যবসা করা কঠিন হয়ে পড়ে। পল্লী বিদ্যুৎ সূত্রে জানা গেছে, জেলার বিভিন্ন এলাকায় চাহিদা প্রায় ৯৭ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ মিলছে ৭৫ থেকে ৮০ মেগাওয়াট। ফলে বাধ্য হয়ে ফিডারভিত্তিক লোডশেডিং করতে হচ্ছে। স্থানীয় কৃষক সুজন হোসেন বলেন, সেচ পাম্প চালাতে পারি না। এতে জমিতে পানি দেওয়া বন্ধ হয়ে গেছে।
দিনাজপুরে গ্রামাঞ্চলে ছয় থেকে সাত ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। জেলায় গরমের সময় চাহিদা ১০০ থেকে ১২০ মেগাওয়াট থাকলেও ২৫ থেকে ৩০ মেগাওয়াট ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এতে কৃষি ও ক্ষুদ্র শিল্পে প্রভাব পড়ছে।
বিরল উপজেলার বাসিন্দা মোসলেম উদ্দিন বলেন, দুপুরে বিদ্যুৎ গেলে দুই-তিন ঘণ্টা থাকে না, রাতে গেলে আরও বেশি সময় লাগে।
গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে বিদ্যুৎ সংকট সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে উৎপাদনে। ৪৮৪ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ মিলছে মাত্র ৩১২ মেগাওয়াট। ফলে প্রতিদিন ছয় থেকে আট ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
ইটাহাটা এলাকার ব্যবসায়ী কাজল ফকির বলেন, দিনে ছয়-সাতবার বিদ্যুৎ যায়। এতে ব্যবসা চালানো কঠিন হয়ে গেছে। একটি পোশাক কারখানার ব্যবস্থাপক মাসুদ হাসান বলেন, বিদ্যুৎ না থাকায় উৎপাদন কমে গেছে। সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা যাচ্ছে না।
সিরাজগঞ্জের বেলকুচিতে তাঁত শিল্পে উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। বিদ্যুৎ না থাকায় শ্রমিকদের অনেক সময় বসে থাকতে হচ্ছে। একই সঙ্গে সেচনির্ভর প্রায় আট হাজার হেক্টর জমিতে পানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।
গোপালগঞ্জে চাহিদা ১৬ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ মিলছে আট থেকে ১০ মেগাওয়াট। ফলে এক ঘণ্টা পরপর লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। রাজবাড়ীতে তীব্র গরম ও লোডশেডিংয়ের কারণে মানুষ আবার হাতপাখার দিকে ঝুঁকছে। বাজারে তালপাতার পাখার চাহিদা বেড়েছে।
এদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় লোডশেডিং কমানোর দাবিতে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় নাগরিক সংগঠনের পক্ষ থেকে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে বলা হয়েছে, অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সংগঠনের প্রতিনিধি শেখ আরিফ বিল্লাহ আজিজী বলেন, লোডশেডিংয়ের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য, পড়াশোনা সবকিছুতেই সমস্যা হচ্ছে।
সিলেটেও একই চিত্র। সেখানে ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যুৎ বিভাগ বৈঠক করেছে। তাতে জানানো হয়েছে, চাহিদার তুলনায় কম বিদ্যুৎ পাওয়ায় নির্দিষ্ট সময় লোডশেডিং অনিবার্য হয়ে পড়েছে। তবে ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ সময় বিশেষ করে বিকেল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত লোডশেডিং না রাখার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। এক কর্মকর্তা বলেন, চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ না পাওয়ায় আমাদের সমন্বয় করে লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
মোবাইল নেটওয়ার্ক বিঘ্নের শঙ্কা
দেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে টেলিকম সেবা বড় ঝুঁকিতে পড়েছে বলে সতর্ক করেছে মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন (অ্যামটব)। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, লোডশেডিংয়ের কারণে টাওয়ার চালাতে প্রতিদিন প্রায় ৫২ হাজার লিটার ডিজেল ও ২০ হাজার লিটার অকটেন লাগছে।
অ্যামটব জানিয়েছে, ডেটা সেন্টার ও সুইচিং হাব বিদ্যুৎবিহীন হলে বড় ধরনের নেটওয়ার্ক বিভ্রাট হতে পারে। প্রতিটি ডেটা সেন্টারে ঘণ্টায় ৫০০-৬০০ লিটার জ্বালানি লাগে, দিনে প্রায় চার হাজার লিটার পর্যন্ত খরচ হচ্ছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না পেলে কল ড্রপ, ইন্টারনেট বিভ্রাট ও জরুরি সেবায় বিঘ্নের আশঙ্কা রয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়, দেশে ৪৬ হাজারের বেশি টেলিকম টাওয়ার ও ২৭টি ডেটা সেন্টার ১৮ কোটির বেশি গ্রাহককে সেবা দিচ্ছে। অপারেটররা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে।
- বিষয় :
- জ্বালানি সংকট
- গরম
- লোডশেডিং
- তীব্র গরম
