পোলট্রি শিল্প চাপে, কমছে উৎপাদন, বাড়ছে দাম
জাহিদুর রহমান
প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:৪০ | আপডেট: ২৩ এপ্রিল ২০২৬ | ১৮:৪৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
অতিমারি করোনার ধাক্কা, ইউক্রেন যুদ্ধের অভিঘাত কাটিয়ে যখন ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল দেশের পোলট্রি শিল্প, তখনই নতুন করে একাধিক সংকট একযোগে আঘাত হেনেছে এই খাতে। জ্বালানি তেলের সাম্প্রতিক দর বেড়ে যাওয়া, দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিং, আমদানিনির্ভর কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, খামার পর্যায়ে রোগবালাই, পরিবহন ব্যয়ের উল্লম্ফন এবং কর-শুল্কের বাড়তি চাপে দেশের অন্যতম বৃহৎ প্রাণিজ প্রোটিননির্ভর এই শিল্প এখন গভীর বিপর্যয়ের মুখে। এর প্রাথমিক অভিঘাত এরই মধ্যে বাজারে পড়তে শুরু করেছে। ডিম ও মুরগির দাম দ্রুত বেড়ে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে দেশের পুষ্টি নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়বে।
লোডশেডিংয়ে প্রান্তিক খামার অচল
পোলট্রি শিল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও নির্দিষ্ট তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ। ব্রয়লারের বাচ্চা উৎপাদন, ডিম ইনকিউবেশন, খামারের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ নির্ভর করে বিদ্যুতের ওপর। তবে বাস্তবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিদিন ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। ফলে খামারিরা বাধ্য হয়ে জেনারেটরের ওপর নির্ভর করছেন। তবে জ্বালানি তেলের দাম রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছানোয় সেই বিকল্প ব্যবস্থাও হয়ে উঠেছে ব্যয়বহুল।
নোয়াখালীর সুবর্ণচরের উদ্যোক্তা মাহবুবুর রহমান প্রায় পাঁচ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে দুই বছর আগে পোলট্রি খামার শুরু করেন। তাঁর খামার এখন টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা জেনারেটর চালাতে গিয়ে জ্বালানির খরচ বহন করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, একটার পর একটা ধাক্কা আসছে। আগে লোডশেডিং সামলাতে জেনারেটর চালিয়েছি। এখন তেলের দাম এত বেড়েছে যে সেটিও চালানো সম্ভব হচ্ছে না। ব্যাংকের ঋণ কীভাবে শোধ করব, বুঝতে পারছি না।
লোডশেডিংয়ের কারণে সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে ব্রয়লার বাচ্চা উৎপাদনে। ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (বিএবি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ব্রয়লার বাচ্চার চাহিদা রয়েছে। তবে ইনকিউবেটরে নিরবচ্ছিন্ন তাপমাত্রা বজায় রাখতে না পারায় উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর মতে, প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৫০ লাখ বাচ্চা কম উৎপাদিত হচ্ছে। ফলে সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব সরাসরি বাজারে পড়ছে।
বাংলাদেশ ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শাহ ফাহাদ হাবিব বলেন, কখনও কখনও ২০ ঘণ্টাও লোডশেডিং হচ্ছে। বাচ্চা যদি সঠিক সময়ে তাপমাত্রা না পায়, তাহলে সমস্যা হয়। এতে বাচ্চা দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন নানা রোগও দেখা দেয়। শুধু ডিজেলের খরচ বেড়ে যাওয়ায় প্রতিটি ডিমের উৎপাদন ব্যয় ২৫ থেকে ৫০ পয়সা এবং একটি বাচ্চার খরচ দুই থেকে তিন টাকা বেড়ে যাচ্ছে।
খাদ্য ও কাঁচামালের দাম লাগামহীন, চাপে ভোক্তা
বাচ্চা উৎপাদনের এই সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে খাদ্য ও কাঁচামালের দাম। পোলট্রি খাতে মোট উৎপাদন খরচের ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ ব্যয় হয় খাদ্যে। আন্তর্জাতিক বাজারে ভুট্টা, সয়াবিন মিলসহ বিভিন্ন কাঁচামালের দাম বাড়ার কারণে ফিড উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে।
উৎপাদন ব্যয়ের এই ঊর্ধ্বগতি গত পাঁচ বছরে একটি উদ্বেগজনক চিত্র তৈরি করেছে। বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিআইএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে উৎপাদন খরচ বেড়েছিল ১১৫ শতাংশ, ২০২৩ সালে ১৪৫ শতাংশ, ২০২৪ সালে ১৭০ শতাংশ, ২০২৫ সালে প্রায় ১৯০ শতাংশ ও ২০২৬ সালে এসে তা দাঁড়িয়েছে ২০০ শতাংশে। অর্থাৎ ছয় বছরে উৎপাদন ব্যয় দ্বিগুণ হয়েছে।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় সরাসরি প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতে। গত দুই সপ্তাহেই পরিবহন খরচ প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। আগে যেখানে একটি ট্রাকে পাঁচ হাজার মুরগি পরিবহন করা হতো, এখন সেখানে তিন হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজারের বেশি পাওয়া যাচ্ছে না। উৎপাদন কমে যাওয়ায় সংগ্রহকারীর বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে হচ্ছে। ফলে প্রতি ইউনিট পণ্যের খরচ আরও বেড়ে যাচ্ছে। এরই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বাজারে। রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে ডিমের দাম আবারও বেড়েছে। এখন প্রতি ডজন লাল ডিম ১২০ থেকে ১৩০ টাকা এবং সাদা ডিম ১১০ থেকে ১১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক মাস আগেও যেখানে ডজনপ্রতি দাম ছিল ৯৫ থেকে ১০০ টাকা, সেখানে এক মাসে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। হাঁসের ডিম বিক্রি হচ্ছে ডজন ১৮০ টাকায়। মুরগির বাজারেও একই চিত্র। সোনালি মুরগি কেজিপ্রতি ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা এবং দেশি মুরগি ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে দেশি মুরগির দাম গরুর মাংসের সমান হয়ে গেছে।
কারওয়ান বাজারের রোকেয়া ব্রয়লার হাউসের ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম জানান, তারা সাধারণত সরাসরি উৎপাদকদের কাছ থেকে মুরগি সংগ্রহ করেন। তবে বর্তমানে আগের তুলনায় কম সরবরাহ পাচ্ছেন। আগে নিয়মিত ট্রাকভর্তি মুরগি এলেও এখন উৎপাদন কমে যাওয়ায় সরবরাহও কমেছে।
বাংলাদেশ ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি সপ্তাহে সোনালি ও রঙিন মুরগির বাচ্চা উৎপাদন হয় প্রায় দুই কোটি ৫০ লাখ। এর মধ্যে বিভিন্ন কারণে সাধারণত পাঁচ থেকে আট লাখ বাচ্চা মারা যায়। তবে গত দুই সপ্তাহে বাজারে সরবরাহ কমে দাঁড়িয়েছে এক কোটি ৫০ লাখ থেকে দুই কোটিতে।
দেশি মুরগির সরবরাহ কমে যাওয়ার পেছনে রোগবালাই বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। খামারিদের ভাষ্য, শীত শেষে কলেরা, রানীক্ষেত ও বার্ড ফ্লুর প্রাদুর্ভাবে ব্যাপক হারে মুরগি মারা গেছে। ফলে অনেক খামারি নতুন করে উৎপাদনে যেতে সাহস পাচ্ছেন না। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে নারীনির্ভর দেশি মুরগি পালন কমে গেছে, যার প্রভাব পড়েছে সরবরাহে।
বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন
বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। খামারি পর্যায়ে কম দামে বিক্রি হলেও খুচরায় দাম অনেক বেশি। খামারি ও ভোক্তার মধ্যে দামের এই বড় ব্যবধান বাজারে একটি গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণের ইঙ্গিত দেয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ওয়ার্ল্ড পোলট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের সভাপতি শামসুল আরেফিন খালেদ খামারি ও খুচরা বিক্রেতার মধ্যে দামের পার্থক্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, বর্তমানে এই পার্থক্য প্রায় ৫০ টাকা পর্যন্ত। মাত্র ১৮ জনের একটি গোষ্ঠী এই বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে।
ফিড ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুল হক বলেন, সয়াবিন মিলের দাম ৫৫ থেকে ৬২ টাকায় ঠেকেছে, যা অনেক ক্ষেত্রে ৬৫ টাকার নিচে পাওয়া যাচ্ছে না। খামারিরা শুধু দুই টাকা নয়; অনেক ক্ষেত্রে পাঁচ টাকা পর্যন্ত লোকসান দিচ্ছেন প্রতি ডিমে।
কর-শুল্কের চাপে পোলট্রি খাত
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কর ও শুল্কের বাড়তি চাপ। চলতি বাজেটে করপোরেট কর ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৭.৫ শতাংশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন কর ও শুল্ক বাড়ানোয় দফায় দফায় বেড়েছে পোলট্রির খাদ্য ও অন্যান্য উপকরণের দাম।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের চেয়ে বাংলাদেশে পোলট্রি ও পশুখাদ্য খাতে কর সুবিধা কম। ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তান, ভারত, নেপাল, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় এ খাতে বিভিন্ন ধরনের কর অব্যাহতি এবং প্রণোদনা দেওয়া হলেও বাংলাদেশে উচ্চ কর কাঠামো বহাল রয়েছে।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রিপন কুমার মণ্ডল বলেন, পোলট্রি শিল্প টিকিয়ে রাখতে হলে আগে খাদ্যের দাম কমাতে হবে। কারণ, খামার পরিচালনার মোট ব্যয়ের ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশই খাদ্যের পেছনে যায়। খাদ্যের কাঁচামাল আমদানিনির্ভর হওয়ায় এ খাতে আয়কর ও শুল্ক কমানো ছাড়া বিকল্প নেই। পাশাপাশি দেশীয় খাদ্য উৎপাদনে উদ্যোক্তা তৈরি এবং যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্কছাড় দেওয়ার ওপরও জোর দেন তিনি।
বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিআইএ) সভাপতি মোশারফ হোসেন চৌধুরী বলেন, বিশ্বের কোথাও খাদ্য উৎপাদন সংশ্লিষ্ট খাতে এত উচ্চ কর নেই। অথচ কৃষিপ্রধান দেশ হয়েও বাংলাদেশে উল্টো প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এর প্রভাব ইতোমধ্যে উৎপাদনকারীদের ওপর পড়েছে এবং ভবিষ্যতে বাজার ও ভোক্তাদের ওপরও পড়বে। তিনি বলেন, বর্তমান কর ও শুল্ক অর্ধেকে নামানো না হলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিরা টিকতে পারবেন না। এতে পুরো খাত বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, গত পাঁচ বছরে নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও পোলট্রি শিল্প টিকে ছিল। কিন্তু চলতি বছরে কর ও শুল্ক বাড়ানোয় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় খামারিদের কম দামে ডিম ও মুরগি বিক্রি করতে হচ্ছে। ফলে তারা মাসের পর মাস লোকসান গুনছেন।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পোলট্রি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ইলিয়াছ হোসেন বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে কর ও শুল্কের বিষয়ে নমনীয় হওয়া জরুরি। তিনি করপোরেট কর ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা, টার্নওভার কর ০.২ শতাংশ নির্ধারণ এবং এআইটি ১ শতাংশে রাখার পরামর্শ দেন।
বিপিআইএর মহাসচিব মো. সাফির রহমান বলেন, আগামী বাজেটে বিশেষ সুবিধা না থাকলে এ খাতে নতুন বিনিয়োগ আসবে না। বিদ্যমান উদ্যোক্তারাও অন্য খাতে চলে যেতে পারেন। এতে ডিম ও মুরগি সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, ক্ষুদ্র খামারিদের টিকিয়ে রাখা জরুরি। তারা না থাকলে বড় খামারিরাও টিকে থাকতে পারবেন না। উৎপাদন খরচ কমাতে সরকারের পক্ষ থেকে সহায়তা দেওয়া হবে।
- বিষয় :
- পোলট্রি শিল্প
- দাম বৃদ্ধি
