ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির ১৩ বছর

কর্মহীন জীবনে দুঃসহ দিন রানা প্লাজার আহতদের

কর্মহীন জীবনে দুঃসহ দিন রানা প্লাজার আহতদের
×

রানা প্লাজা ধসে দুই পা হারিয়ে পঙ্গুত্বের জীবন বয়ে বেড়াচ্ছেন দিনাজপুরের ফুলবাড়ীর বারাই চেয়ারম্যানপাড়া গ্রামের রেবেকা বেগম। পঙ্গুত্বের কারণে সন্তানদের কোনো আবদার পূরণ করতে না পারার আর্তনাদ আর আক্ষেপই এখন তাঁর নিত্যসঙ্গী সমকাল

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ২৪ এপ্রিল ২০২৬ | ০৯:৩৩ | আপডেট: ২৪ এপ্রিল ২০২৬ | ০৯:৪২

| প্রিন্ট সংস্করণ

রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় সেই দুঃসহ স্মৃতি বহন করে চলেছেন দিনাজপুরের ফুলবাড়ীর দুই পা হারানো রেবেকা বেগম। কর্মহীন হয়ে বাড়িতে শুয়ে-বসে দিন কাটছে তাঁর। তিনি বলেন, সন্তানদের নিয়ে কোথাও যেতেও পারেন না। তাদের প্রয়োজনেও তেমন কাজে আসতে পারেন না। দুই পা হারানোর দুঃসহ স্মৃতি বহন করতে হবে তাঁকে, যতদিন বেঁচে থাকবেন ততদিনই।

উপজেলার আরেকটি পরিবার রানা প্লাজার ঘটনায় নিখোঁজ পোশাক শ্রমিক গুলশানে জান্নাত শাবানার ফেরার অপেক্ষায় আছে। শাবানার মরদেহ পাওয়া যায়নি। 

আতাউর রহমান ও শাবানা দম্পতির বাড়ি ফুলবাড়ী উপজেলার কাজিহাল ইউনিয়নের ডাঙ্গাপাড়া গ্রামে। গত বুধবার আতাউর জানান, দুই সন্তান, স্ত্রী আর মাকে নিয়ে ছিল তাঁর সংসার। ছেলেমেয়েকে মায়ের কাছে রেখে ঢাকায় চাকরি করতেন স্বামী-স্ত্রী। ছেলে সাজ্জাদ আহম্মেদ সজিবের বয়স তখন পাঁচ বছর, আর মেয়ে সোহানা আফরিন সানুর তিন। ভবন ধসের পাঁচ মাস পর এলাকায় ফিরে আসেন। ছেলেটা মায়ের কথা কিছুটা বলতে পারে। মায়ের জন্য প্রথম প্রথম খুব কান্নাকাটি করত। কিন্তু মেয়ের তেমন মায়ের স্মৃতি নেই।

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ডে আটতলা ভবনটি ধসে ১ হাজার ১৩৬ জনের বেশি শ্রমিক নিহত হন। আহত হন ২ হাজার ৪৩৮ জন। যারা প্রাণে বেঁচে গেছেন, তাদের বরণ করতে হয়েছে পঙ্গুত্ব। ১৩ বছরেও তাদের কষ্টের গল্প শেষ হয়নি।

বেঁচে যাওয়া নাসিমাকে সারা জীবন তাড়া করেছে দুর্ভাগ্য রানা প্লাজা ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে তিন দিন পর জীবিত উদ্ধার করা হয়েছিল দিনাজপুরের পার্বতীপুরের নাসিমা বেগমকে। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, সম্প্রতি আরেকটি বড় দুর্ঘটনায় তাঁর প্রাণ গেছে।

দুর্ঘটনা নাসিমাকে দুঃস্বপ্নের মতো সারা জীবন তাড়া করেছে। ২০০২ সালে বাবা আব্দুল সাত্তার মারা যান বাস দুর্ঘটনায়। ২০২৪ সালে লিভারে সমস্যায় মারা যান স্বামী। গত ২৫ মার্চ রাজবাড়ীর দৌলতদিয়ায় বহুল আলোচিত ফেরিঘাট থেকে বাস নদীতে পড়ার ঘটনা প্রাণ যায় নাসিমার। তাঁর মরদেহ বাড়িতে আনার সময় বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সও পড়ে দুর্ঘটনার কবলে। 

‘১৩ বছর পার হলেও বিচার, পুনর্বাসন ও চিকিৎসা পাইনি’

‘রানা প্লাজা ধসে হাত হারিয়েছি। আমার মতো আরও অনেকেই হাত-পা হারিয়েছেন। অথচ ১৩ বছর পার হলেও আমরা এখনও এ ঘটনার বিচার, পুনর্বাসন ও চিকিৎসা পাইনি। এ ঘটনার আগে আমি মাস্টার্স পাস করেছিলাম। কী লাভ হলো পাস করে? হাত হারিয়ে এখন কর্মহীন ঘুরে বেড়াচ্ছি।’
গতকাল বৃহস্পতিবার আক্ষেপের সুরে কথাগুলো বলছিলেন রানা প্লাসা ধসের ঘটনায় হাত হারানো সাদ্দাম হোসেন। 

আরেক ভুক্তভোগী শিলা আক্তার এখনও ফিরতে পারেননি স্বাভাবিক জীবনে। শিলা বলেন, ভবন ধসের ঘটনায় ডান হাতের রগ কেটে যায়। পেটে ভবনের ভিম পড়ে নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে গিয়েছিল। ভেঙে গেছে মেরুদণ্ড। এখন অন্যের সহায়তায় শত যন্ত্রণা নিয়ে কোনোমতে বেঁচে আছি। অর্থাভাবে নিজের চিকিৎসা কিংবা একমাত্র মেয়ের পড়াশোনা– কোনোটাই করাতে পারছি না।

সমাজের বিত্তবানদের কাছে সহযোগিতা চেয়ে তিনি বলেন, ‘নিজে তো চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পড়ে আছি। খেয়ে না খেয়ে সময় যাচ্ছে। অনেক স্বপ্ন ছিল, মেয়েটা বড় অফিসার হবে, তাও শেষ হয়ে গেল। কেউ সহযোগিতা করলে মেয়েটাকে পড়ালেখা করাতে পারতাম।’ কিছুটা ক্ষোভ নিয়ে তিনি বলেন, ঘটনার আগের দিন বিল্ডিংয়ে ফাটল দেখা দিলে ইঞ্জিনিয়ার এসে বলেন– ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ। পরে ব্যানার ও তালা লাগিয়ে দিলেও রানা ও গার্মেন্টস মালিকরা জোর করে ভয় দেখিয়ে শ্রমিকদের কাজে যোগ দিতে বাধ্য করেন। তাদের কারণে এতগুলো মানুষের প্রাণ গেল, পঙ্গুত্ব বরণ করতে হলো। কিন্তু তাদের কোনো শাস্তি হলো না।

আহত শ্রমিক নিলুফার ইয়াসমিন বলেন, ‘রানা প্লাজার হতাহত শ্রমিক ও তাদের পরিবার কেমনে জীবনযাপন করছে, কেউ এখন আর তার খোঁজ রাখে না। শ্রমিকরা আজও রাস্তায় রাস্তায় কেঁদে বেড়াচ্ছে।’ তাঁর প্রশ্ন, ‘আমরা আর কত কাঁদব? ফুটপাতে একটি দোকান করে কোনোমতো চলতাম, সেটিও উচ্ছেদ করা হয়েছে। নিজের চিকিৎসা করাব নাকি সংসারের খরচ জোগাব– এত কিছু সামাল দিতে না পেরে গ্রামে চলে এসেছি।’

রানা প্লাজার পাঁচতলায় ফ্যান্টম অ্যাপারেলসে কাজ করতেন পারুল বেগম। ভবনটি ধসে পড়ার ৮ ঘণ্টা পর তাঁকে ধ্বংসস্তূপ থেকে বের করে আনেন উদ্ধারকারীরা। তাঁর স্বামী ইয়াসিন হোসেনও রানা প্লাজা ধসে আহত হয়েছিলেন। তাঁর ডান কানের পর্দা ফেটে যায়। তিন-চার বছর তিনি কোনো কাজ করতে পারেননি, এখন একটা ছোট কারখানায় নিরাপত্তাকর্মীর কাজ করছেন। সেই আয় দিয়ে কোনো রকমে চলছে সংসার। পারুল বলেন, ভবন ধসে কিডনিতে আঘাত পেয়েছিলেন। এরপর কিডনিতে পানি জমত। পরে ডাক্তাররা একটা নল লাগিয়ে দিয়েছিলেন। তাতে সমস্যা কিছুটা কমলেও এখন দু-একদিন পরপরই ব্যথায় ভুগতে হয়।

দ্রুত বিচার, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের দাবি
রাজধানীতে এক মতবিনিময় সভায় সাভারের রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় দায়ের করা মামলার দ্রুত বিচার, হতাহতদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি আহতদের নিয়ে একটি টিম গঠন করে আইনজীবী, ট্রেড ইউনিয়ন, গণমাধ্যমসহ সবাই সমন্বিত হয়ে বিচারাধীন মামলার ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।  

গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘রানা প্লাজা ভবন ধস: বিচারের দীর্ঘসূত্রতা ও ক্ষতিগ্রস্তদের অধিকার’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় বক্তারা এসব দাবি জানান। বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) এ মতবিনিময় সভার আয়োজন করে। 

রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় ঢাকার অধস্তন আদালতে ১০টি মামলা এবং উচ্চ আদালতে চারটি রিট মামলা দায়ের করা হয়। গত ১৩ বছরে কোনো মামলার বিচার শেষ হয়নি।

রানা প্লাজা সারভাইভার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাহমুদুল হাসান হৃদয় বলেন, দুর্ঘটনার পর ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য যে সহায়তা ও তহবিলের কথা বলা হয়েছিল, তার বড় অংশই সঠিকভাবে পৌঁছায়নি ভুক্তভোগীদের হাতে। ফলে এত বছর পরও অনেকে বঞ্চিত রয়ে গেছেন। ভবন ধসের এত বছর পরও তারা স্থায়ী পুনর্বাসন, পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়েছেন। ভবন ধসের ঘটনায় দায়ের করা মামলার বিচার এখনও শেষ হয়নি। বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা আর জবাবদিহির অভাব নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।

(প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন সমকাল প্রতিবেদক এবং সাভার থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক, দিনাজপুর ও ফুলবাড়ী প্রতিনিধি)

আরও পড়ুন

×