রানা প্লাজা ধসের ১৩ বছর: দ্রুত বিচার, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন দাবি
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৪ এপ্রিল ২০২৬ | ১৬:৫০ | আপডেট: ২৪ এপ্রিল ২০২৬ | ১৬:৫৫
রাজধানীতে এক মতবিনিময় সভায় ১৩ বছর আগে সাভারের রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় দায়ের করা মামলার দ্রুত বিচার, হতাহতদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি আহতদের নিয়ে একটি টিম গঠন করে আইনজীবী, ট্রেড ইউনিয়ন ও গণমাধ্যমসহ সবাই সমন্বিত হয়ে বিচারাধীন মামলার ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘রানা প্লাজা ভবন ধস: বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা ও ক্ষতিগ্রস্তদের অধিকার’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় বক্তারা এসব দাবি জানান। বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) এ মতবিনিময় সভার আয়োজন করে।
২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারের রানা প্লাজায় ধ্বসের ঘটনায় ১ হাজার ১৩৬ জনের বেশি শ্রমিক নির্মমভাবে নিহত হন। আহত হন ২ হাজার ৪৩৮ জন। এ ঘটনার ঢাকার অধস্তন আদালতে ১০টি মামলা এবং উচ্চ আদালতে চারটি রিট মামলা দায়ের করা হয়। গত ১৩ বছরে কোনো মামলার বিচার শেষ হয়নি।
ব্লাস্টের পরিচালক বরকত আলী সঞ্চালনায় মতবিনিময় সভার শুরুতেই আদালতে বিচারাধীন মামলার সর্বশেষ অবস্থা তুলে ধরেন সিফাত-ই নুর খানম। সভার শুরুতে দ্রুত বিচার, যথাযথ ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন এবং জুরাইন কবরস্থানে স্থায়ী স্মৃতিফলক নির্মাণে অবিলম্বে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। মতবিনিময় সভায় ভুক্তভোগী শ্রমিক, ট্রেড ইউনিয়ন, শ্রমিক অধিকার সংগঠন, সরকারি কর্মকর্তা ও আইনজীবীরা অংশগ্রহণ করেন।
সভায় সুপ্রিমকোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও ব্লাস্টের নির্বাহী পরিচালক ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, রানা প্লাজা ধ্বসের ঘটনায় হাইকোর্টে ৫টি রিট ও নিম্ন আদালতে দশটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। বিচারগুলো যেন দ্রুত সম্পন্ন করা যায় তার ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি উচ্চ আদালতে এসব রিটের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ পরিমাণ সংবিধানের আলোকে নির্ধারিত হতে পারে। এছাড়া আহতদের নিয়ে একটি টিম গঠন করে আইনজীবী, ট্রেড ইউনিয়ন ও গণমাধ্যমসহ সবাই সমন্বিত হয়ে মামলার ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, রানা প্লাজার দুর্ঘটনার মামলাগুলো নিষ্পত্তিতে ব্যতিক্রমী মামলা হিসেবে দেখতে হবে। অন্যথায় খুব সহসা বিচার পাওয়া কঠিন হয়ে যাবে। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে যারা প্রাণ দিয়েছেন তাদের মাধ্যমে বোঝা যায় আসলে বিচার পাওয়াটা কত কঠিন। তবে রানা প্লাজা ধসে ক্ষতিগ্রস্তদের বিচার, যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন বিষয়গুলোতে সামনে এনে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য শ্রম আইন সংশোধনের জন্য উদ্যোগ নিতে হবে।
বিলস-এর নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদ বলেন, রানা প্লাজা ভবনধসের বিচার দ্রুত শেষ করা প্রয়োজন। ক্ষতিগ্রস্তদের আজীবন বিশেষায়িত চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে এবং স্থানীয় প্রশাসন ও প্রতিনিধিদের বিষয়টিতে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের যুগ্ম মহাপরিদর্শক মাহফুজুর রহমান ভুঁইয়া বলেন, শ্রম আদালতে চলমান মামলায় কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের প্রতিনিধি উপস্থিতি নিশ্চিতে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির প্রধান তাসলিমা আখতার বলেন, ক্ষতিপূরণ পাওয়া শ্রমিকদের আইনি অধিকার। শিল্পের প্রবৃদ্ধি হলেও শ্রমিকরা বঞ্চিত-এ প্রশ্ন তুলে তিনি শ্রমিকদের ঐক্যের ওপর গুরুত্ব দেন।
ঢাকা জেলা ও দায়রা আদালতের অতিরিক্ত পিপি ফয়সাল মাহমুদ বলেন, সাক্ষীরা আদালতে সাক্ষ্য দিতে না আসায় মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করা যাচ্ছে না। বিগত সরকারের আমলের চেয়ে এখন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ অনেক বেড়েছে, ইতিমধ্যে ১৪৫ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়েছে। আশা করা যায়, এই বছরের মধ্যে দণ্ডবিধির অধীনের মামলার নিষ্পত্তি হবে। তিনি আরও বলেন, মোট সাক্ষী ছিলো ৫৯৪ জন। এমন পুলিশ অফিসারদের সাক্ষী করা হয়েছে। তাদেরকে আদালতে হাজির করার ক্ষেত্রে পুলিশের গাফলতিও দেখা গেছে। আগামী ৩০ এপ্রিল মামলার পরবর্তী তারিখ রয়েছে বলেও জানান তিনি।
ব্লাস্টের সিফাত-ই-নূর খানম বলেন, রানা প্লাজা মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য প্রতিদিন শুনানি নির্ধারণ জরুরি। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা, টেকসই পুনর্বাসন, স্বাধীন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং শ্রম আইন সংশোধনের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণের মানদণ্ড নির্ধারণ প্রয়োজন। সাভার ও জুরাইনে নিহতদের স্মরণে স্থায়ী স্মৃতিফলক নির্মাণেরও সুপারিশ করা হয়। এসময় উপস্থিত ছিলেন ব্লাস্টের পরিচালক (অ্যাডভোকেসি ও কমিউনিকেশন) মাহবুবা আক্তার, ঢাকা লেবার কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি আইনজীবী সেলিম আহসান খান প্রমুখ।
- বিষয় :
- রাজধানী
- রানা প্লাজা
