ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

উপহাস মাড়িয়ে সাফল্যের হাসি

উপহাস মাড়িয়ে সাফল্যের হাসি
×

বগুড়ার শিবগঞ্জের গড়িয়াপাড়া গ্রামে নিজ খামারে ব্যস্ত রাজিয়া সুলতানা সুমি (বাঁয়ে) সমকাল

লিমন বাসার, উত্তরাঞ্চল

প্রকাশ: ২৫ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:০৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

শহুরে জৌলুস আর কাচের দেয়ালের করপোরেট হাতছানি টানেনি রাজিয়া সুলতানা সুমিকে। তপ্ত পিচঢালা পথের চেয়ে মায়ার আঁচল বিছানো মেঠোপথকে বেশি ভালোবেসেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ পকেটে পুরে ফেরেননি কোনো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত দপ্তরে; বরং ফিরেছেন পিতৃপুরুষের সেই সোঁদা গন্ধযুক্ত মাটির কোলে। ফসলের ঘ্রাণে সুমি বুনেছেন স্বাবলম্বিতার এক নতুন বীজ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজকল্যাণ বিভাগে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) শেষ করেছেন সুমি। এরপর সাধারণত একজন শিক্ষার্থীর কাছে বিসিএস বা বড় কোনো করপোরেট চাকরির প্রত্যাশা থাকে। কিন্তু বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার গড়িয়াপাড়া গ্রামের রাজিয়া সুলতানা সুমি হেঁটেছেন উল্টো পথে। ডিগ্রিকে অহংকার না বানিয়ে তিনি একে রূপান্তর করেছেন শক্তিতে; শুরু করেছেন জৈবসার উৎপাদনভিত্তিক আধুনিক কৃষি খামার।

বর্তমানে স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এই সার আশপাশের উপজেলা ও জেলাগুলোতেও যাচ্ছে। তবে পুঁজির সীমাবদ্ধতার কারণে উৎপাদন বড় পরিসরে করতে পারছেন না সুমি। সুশাসনের জন্য প্রচারাভিযান-সুপ্রর জেলা সম্পাদক কেজিএম ফারুক বলেন, ‘সুমির গল্প কেবল একটি খামারের গল্প নয়, এটি নারীর সাহস আর শিকড়ে ফেরার এক অনুপ্রেরণার উপাখ্যান।’

শুরুতে বিদ্রূপ করতেন গ্রামবাসী
২০২০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা শেষ করার পর সুমি যখন স্থায়ীভাবে গ্রামে ফিরে বাবার সঙ্গে মাঠে কাজ শুরু করেন, তখন প্রতিবেশী ও গ্রামবাসীর অনেকেই তাঁকে বিদ্রূপ করেছিলেন। উচ্চশিক্ষিত হয়ে মাঠে কাজ করাকে অনেকে ‘পড়াশোনার অপচয়’ বলে কটূক্তি করেন। সুমি বলেন, ‘শুরুতে খারাপ লাগলেও দমে যাইনি। আমি জানতাম, যে পেশা মানুষকে অন্ন দেয়, তাকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।’ 
ভবিষ্যতে সুমি কাজের পরিধি বাড়াতে চান। গ্রামে একটি পূর্ণাঙ্গ কৃষি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তুলতে চান, যেখানে শহরের চাকরির পেছনে না ছুটে গ্রামের তরুণরা মাটির গুণাগুণ বুঝে আধুনিক কৃষক হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলবে।

শামীমা এগ্রো ফার্ম ও সাফল্যের শুরু
রাসায়নিক সারের প্রভাবে মাটির উর্বরতা কমে যাওয়া রোধ করতে সুমি ও তাঁর বড় বোন শামীমা বেগম মিলে শুরু করেন ‘শামীমা এগ্রো ফার্ম’। মাত্র কয়েকটি রিং আর কিছু কেঁচো নিয়ে শুরু হওয়া তাদের এই ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সার উৎপাদন কেন্দ্রটি আজ স্থানীয় কৃষকদের ভরসার জায়গা। স্থানীয় কৃষক আব্দুল কুদ্দুস জানান, সুমির খামারের সার ব্যবহারে জমির মাটি নরম হয়েছে এবং ফলনও ভালো হচ্ছে।
সুমি কেবল নিজেকে নিয়েই ভাবেননি। গ্রামের বেকার তরুণ ও গৃহবধূদের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে তিনি গড়ে তুলেছেন ‘চেতনায়ন’ নামে একটি সংগঠন। এই সংগঠনের মাধ্যমে তিনি প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। রফিকুল ইসলামের মতো অনেক তরুণ নিজ বাড়িতে সার তৈরি করে মাসে হাজার হাজার টাকা আয় করছেন। এ ছাড়া রাশিদা বেগম ও নাসিমা খাতুনের মতো গৃহবধূরা ঘরের কাজের পাশাপাশি সার উৎপাদন করে বাড়তি আয় করছেন।
উপজেলা কৃষি অফিসার আব্দুল হান্নান সুমির এ উদ্যোগকে একটি মডেল হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, ‘শিক্ষিত তরুণদের কৃষিতে যুক্ত হওয়া মানেই নতুন প্রযুক্তির প্রবেশ। মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় সুমির এ উদ্যোগ অনন্য উদাহরণ।’

আরও পড়ুন

×