আগামী বাজেট যেন ব্যবসায়ীদের জন্য ‘শাস্তিমূলক’ না হয়
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:২১
| প্রিন্ট সংস্করণ
আগামী বাজেট যেন ‘শাস্তিমূলক’ না হয়ে সবার জন্য সহায়তামূলক ও ব্যবসাবান্ধব হয়, সে দাবি তুলেছেন ব্যবসায়ীরা। ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানোর পাশাপাশি হয়রানিমুক্ত কর ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন তারা। ব্যবসায়ীরা বলেছেন, দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যবসানীতির আমূল পরিবর্তন সময়ের দাবি।
গতকাল বুধবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের পরামর্শক কমিটির ৪৬তম সভায় ব্যবসায়ীরা এমন দাবি জানান। রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত সভার যৌথ আয়োজক ছিল এনবিআর এবং ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। সভাপতিত্ব করেন এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান এবং সঞ্চালনা করেন এফবিসিসিআইর প্রশাসক আবদুর রহিম খান। এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন, আইসিসিবির সভাপতি মাহবুবুর রহমানসহ ব্যবসায়ী নেতারা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান টি রহমান করহার কমানোর সুপারিশ করেন।
তিনি কর ব্যবস্থা সহজীকরণ, সবার কর দেওয়ার সংস্কৃতি চালু করতে প্রতীকী ১০০ বা এক হাজার টাকার কর ব্যবস্থা চালু, মোবাইল অ্যাপে রিটার্ন জমার সুযোগ, নগদ লেনদেন-সংক্রান্ত কঠোর শর্ত শিথিল করা এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতকে করের আওতায় আনার প্রস্তাব দেন।
আগামী বাজেট যেন শাস্তিমূলক না হয়ে সহায়তামূলক হয়– এমন আহ্বান জানিয়ে এমসিসিআই সভাপতি বলেন, এমন বাজেট দিতে হবে, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, অর্থনীতিতে গতি ফিরিয়ে আনবে এবং সাধারণ মানুষের দুর্দশা লাঘবে সহায়ক হবে।
কর কর্মকর্তাদের সততা, স্বচ্ছতা ও নৈতিকতার সঙ্গে দেশ ও জনগণের কল্যাণে কাজ করার আহ্বান জানান রিহ্যাবের সিনিয়র সহসভাপতি আব্দুর রাজ্জাক। তিনি বলেন, রাজস্ব আহরণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং করদাতাদের প্রতি সহনশীল আচরণ বজায় রাখা গেলে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ আরও উন্নত হবে। একই সঙ্গে কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন এবং হয়রানিমুক্ত সেবা নিশ্চিত করারও আহ্বান জানান তিনি।
চট্টগ্রাম বন্দরের খরচ ৪৩ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় আমদানি-রপ্তানি খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে ব্যবসায়ীরা জানান। তারা বন্দরের দুর্নীতি রোধ এবং মাশুল কমানোর দাবি তোলেন। তারা অভিযোগ করেন, ভ্যাট ও ট্যাক্স আদায়ের নামে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের হাতে ব্যবসায়ীরা অনেক সময় হয়রানির শিকার হন, ফলে রাজস্ব সরকারি কোষাগারে না গিয়ে ব্যক্তির পকেটে চলে যাচ্ছে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু বলেন, আগামী বাজেট ‘কোয়ালিটি’ বাজেট হবে। সরকার কোনো বিশেষ পৃষ্ঠপোষকতার ব্যবসা চায় না, বরং অর্থনীতির গণতান্ত্রিকায়ন চায়, যেখানে সবাই সমান সুযোগ পাবে। এই রূপান্তর প্রক্রিয়ায় তিনি ব্যবসায়ী সমাজ ও সাধারণ মানুষের পূর্ণ সহযোগিতা কামনা করেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের বয়স মাত্র দুই মাস। সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি পেয়েছে। জ্বালানি খাতে তিন বিলিয়ন ডলার শোধ করতে হয়েছে। বিপুল পরিমাণ বকেয়া এবং ঋণের বোঝা বর্তমান সরকারের ওপর এক বিশাল চাপ সৃষ্টি করেছে, যা সমন্বয় করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
আগামী বাজেটকে ব্যবসাবান্ধব করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আমির খসরু বলেন, একটা বাজেট দিয়ে ব্যবসায়ীদের সব সমস্যা সমাধান করা যাবে না। তবে আগামী তিন মাসের মধ্যে ব্যবসা সহজীকরণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ানো প্রধান সমস্যাগুলো সমাধান করা হবে। ব্যবসায়ীরা কোন কোন ক্ষেত্রে সমস্যায় ভুগছেন, তা সুনির্দিষ্ট করে জানানোর আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, সরকার এক কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আগামী দুই বছরের মধ্যে অর্থনীতিকে একটি শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে। এই লক্ষ্য অর্জনে তিনি ব্যবসায়ীদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান এবং গুণগত বিনিয়োগের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর গুরুত্ব দেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, বর্তমান সরকার এক প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নিয়েছে। আগামী বাজেটে বেসরকারি খাতকে কীভাবে আরও সম্পৃক্ত করা যায়, সেদিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি বলেন, জ্বালানি সংকট এবং উচ্চ সুদের হার ব্যবসার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান সরকার অত্যন্ত ব্যবসাবান্ধব এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় সংস্কার আনতে বদ্ধপরিকর।
এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান বলেন, কর ব্যবস্থা ও নীতির কারণে অনেক সময় ব্যবসার ক্ষতি হয়। করের আওতা বাড়ানো এবং বৈষম্য দূর করার বিষয়ে পুরো জাতি একমত। ব্যবসায়ীদের দাবিগুলো আগামী বাজেটে যতটুকু সম্ভব প্রতিফলিত করার চেষ্টা থাকবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।
এফবিসিসিআইর লিখিত প্রস্তাব
লিখিত প্রস্তাবে ব্যবসায়িক খরচ কমিয়ে আনা, বিনিয়োগ আকর্ষণ ও সুরক্ষা, বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, কর আদায়ের ক্ষেত্রে হয়রানি ও জটিলতা দূরীকরণের মাধ্যমে ব্যবসাবান্ধব কর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাসহ বিভিন্ন সুপারিশ করে এফবিসিসিআই।
এফবিসিসিআই উৎপাদনকারীদের জন্য আমদানি পর্যায়ে অগ্রিম করের হার ধাপে ধাপে কমিয়ে আনা, কাঁচামালের ওপর উৎসে কর ৩ থেকে ২ শতাংশে কমিয়ে আনা এবং রপ্তানির ক্ষেত্রে উৎসে কর কমানোর প্রস্তাব করেছে। অতালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার আগামী বাজেটে ২৫ শতাংশে নামানোর সুপারিশ করেছে এফবিসিসিআই।
- বিষয় :
- বাজেট
