নিজেকেসহ পুরো মন্ত্রিসভাকে শ্রমিক ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর
শুক্রবার নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে শ্রমিক দলের সমাবেশে বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: পিএমও
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০১ মে ২০২৬ | ২১:৩২ | আপডেট: ০১ মে ২০২৬ | ২১:৩৪
দেশ গড়তে নিজেকে এবং নিজের মন্ত্রিসভাকে শ্রমিক হিসেবে ঘোষণা দিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শুক্রবার মহান মে দিবস উপলক্ষে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সমাবেশে এই ঘোষণা দেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ কথা একটাই, কাজ একটাই, সেটি হচ্ছে দেশ গড়া। সেজন্যই শ্রমিকরা কেউ কারখানায় কাজ করেন, কেউ ইমারত নির্মাণ করেন, কেউ জুটমিলে কাজ করেন, কেউ পোশাক শিল্পে কাজ করেন, কেউ হয়ত রেস্টুরেন্টে কাজ করেন, কেউ হয়ত পরিবহনে পরিবহনে কাজ করেন। বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন শ্রেণিতে শ্রমিকরা আছেন। আজ সেসব শ্রমিক ভাইদের উদ্দেশ্যে আমি বলতে চাই, আপনারা যেমন বিভিন্ন সেক্টরে কাজ করেন। আপনাদের খাতায় আমি আমার নামটি লেখাতে চাই একজন শ্রমিক হিসেবে।
এর কারণ ব্যাখ্যা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনি যেরকম ইমারত শ্রমিক হিসেবে এই ইমারতটি গড়ে তুলছেন এই দালানটি গড়ে তুলছেন, আপনি একজন পাট শ্রমিক হিসেবে পাটকলের উৎপাদন বৃদ্ধি করছেন, আপনি একজন পোশাক শিল্প শ্রমিক হিসেবে পোশাক শিল্পের উৎপাদন বৃদ্ধি করছেন। ঠিক একইভাবে আপনার খাতায় নাম লিখিয়ে আমিও দেশ গড়ার কাজে নিয়োজিত করতে চাই নিজেকে। একইসঙ্গে আমি মন্ত্রিপরিষদের সব সদস্যের নাম শ্রমিক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে চাই। কারণ আপনারা যেমন একেকটি জিনিস গড়ে তুলছেন আমরা আপনাদের পাশে থেকে দেশ গড়ার কাজে হাত দিতে চাই, দেশকে গড়তে চাই।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষ পরিশ্রম করে যেভাবে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে তাদের সঙ্গে থেকে তাদের পাশে থেকে আমরা দেশকে গড়ে তুলতে চাই। এজন্যই আমাদের নির্বাচনের সময় স্লোগান ছিল ‘করবো কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’। এটি হচ্ছে আমাদের স্লোগান, এটি হচ্ছে আমাদের বর্তমান স্লোগান, এইটি হচ্ছে আমাদের ভবিষ্যৎ স্লোগান। যেই স্লোগানের বলে বলীয়ান হয় ইনশাআল্লাহ আমরা এই প্রিয় মাতৃভূমিকে আমাদের প্রত্যাশিত বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলতে পারব।
তিনি বলেন, আজকের এই মহান আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসে আসুন, আমরা আজকে প্রত্যেকে এখানে প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করি, প্রত্যেকে শপথ গ্রহণ করি যেই বাংলাদেশের প্রত্যাশা প্রত্যেকটি নারী পুরুষ, প্রত্যেকটি মানুষের মনে রয়েছে সেই প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য আসুন আমরা প্রত্যেকে একেকজন দেশ গড়ার শ্রমিক হিসেবে নিজেদের প্রস্তুত করব। আমরা প্রত্যেকে একেকজন দেশগড়া শ্রমিক হিসেবে আমাদের জীবনের বাকি দিনগুলোকে আমরা অতিবাহিত করব।
সমাবেশের শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কী ভাইয়েরা আমরা কী এই প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করতে পারি? দেশ গড়ায় শ্রমিক হিসেবে কি আপনারা নাম লেখাতে রাজি আছেন?। শ্রমিকরা সমস্বরে ‘হ্যাঁ’ সূচক জবাব দিলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আলহামদুলিল্লাহ। মনে রাখতে হবে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সেই একটি কথা… প্রথম বাংলাদেশ আমার, শেষ বাংলাদেশ। জীবন বাংলাদেশ আমার, মরণ বাংলাদেশ।
‘শ্রমিকরা ভালো থাকলে দেশ ভালো থাকবে’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা জানি এই দেশে কলকারখানা তৈরি হলে এই দেশের শ্রমিকরা কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে। আমরা জানি, শ্রমিকরা যদি ভালো থাকে তাহলে বাংলাদেশ ভালো থাকবে। আমরা জানি কৃষকরা যদি ভালো থাকে তাহলেই বাংলাদেশ ভালো থাকবে। অর্থাৎ সাধারণ খেতে খাওয়া মানুষ যখন ভালো থাকবে তখনই এই দেশ বাংলাদেশ ভালো থাকবে।
মহান মে দিবস উপলক্ষে বিএনপির শ্রমিক সংগঠন জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের উদ্যোগে এই শ্রমিক সমাবেশ হয়। এই সমাবেশে ঢাকার বিভিন্ন ওয়ার্ডের শ্রমিক দলের নেতাকর্মী-সমর্থক ছাড়াও গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, মুন্সিগঞ্জ, মানিকগঞ্জ প্রভৃতি জেলার শিল্প-কলকারখানার শ্রমিকরা অংশ নিয়েছে। লাল টুপি মাথায় হাজারো নেতাকর্মী ব্যানার নিয়ে এই সমাবেশে উপস্থিত হয়। কাকরাইল থেকে ফকিরাপুল মোড় পর্যন্ত হাজার হাজার শ্রমিকদের উপস্থিতিতে সমাবেশে জনসমুদ্রে রুপ নেয়।
বক্তব্যের শুরুতে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে এবং ৯০ এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, গত দেড় দশকে সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আন্দোলন নিহত শ্রমিকদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, আমরা দেখেছি কীভাবে দেশের শিল্প কলকারখানাগুলোকে ধীরে ধীরে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এই দেশের পুরো অর্থনীতিকে কীভাবে ধীরে ধীরে আমদানিনির্ভর করে গড়ে তোলা হয়েছিল। আমরা দেখেছি কীভাবে স্বৈরাচারের সময় এই দেশ থেকে এই দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল।
‘বন্ধ কলকারখানা খুলে দেয়া হবে’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান বিএনপি সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার এবং সেইজন্য এই সরকার গঠিত হওয়ার পরে সাথে সাথেই আমি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে সাথে নিয়ে বসেছি এবং নির্দেশনা দিয়েছি। আপনারা জানলে খুশি হবেন আমি নির্দেশনা দিয়েছি, কীভাবে আমরা কত দ্রুত বন্ধ কলকারখানাগুলো চালু করতে পারব। কর্মসংস্থান হারিয়ে বেকার হয়ে যাওয়া শ্রমিকের কর্মের ব্যবস্থা যেন আমরা করতে পারি সেই মিটিংটি এই সপ্তাহে আবার নির্ধারিত হয়েছে।
তিনি বলেন, ইনশাআল্লাহ বাংলাদেশের অনেকগুলো কলকারখানা যেগুলো বন্ধ হয়ে গেছে বিগত বছরগুলোতে, পর্যায়ক্রমে আমরা সেই কলকারখানাগুলো আবার চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। শুধু এই বন্ধ কলকারখানা চালু হলেই সব শ্রমিকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে না আমরা জানি।
‘উচ্ছেদ হওয়া হকারদের পুনর্বাসন করা হচ্ছে’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঢাকা শহরের বিভিন্ন রাস্তায় আপনারা দেখেছেন হকার ভাইরা ছিল। কিন্তু যানজটসহ সাধারণ মানুষের চলাফেরার অসুবিধার জন্য আমরা হকার ভাইদেরকে সরিয়ে দিয়েছি। কিন্তু আমরা এটাও বুঝি তারাও মানুষ তাদেরও পরিবার আছে। তাদেরও চলতে হবে খেয়েপরে, তাদেরকেও বাঁচতে হবে। সেজন্যই আমি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সাথে সাথে নির্দেশনা দিয়েছি যে, হকার উচ্ছেদ করলে শুধু হবে না এই মানুষগুলো যাতে খেয়েপরে বাঁচতে পারে।
শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেনের সভাপতিত্বে ও প্রচার সম্পাদক মনজরুল ইসলাম মনজুর সঞ্চালনায় সমাবেশে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য আমান উল্লাহ আমান, আবদুস সালাম, শ্রমিক দলের প্রধান সমন্বয়কারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, বিএনপি মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক রফিকুল আলম মজনু, উত্তরের আহ্বায়ক আমিনুল ইসলাম, শফিকুল আলম মিল্টন, যুব দলের সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন, ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব, বিএনপির হুমায়ুন কবির খান, ফিরোজ উজ জামান মামুন মোল্লা, শ্রমিক দলের সালাহ উদ্দিন সরকার, মেহেদি আলী খান, মোস্তাফিজুল করীম মজুমদার, আবুল খায়ের খাজা, সুমন ভূঁইয়া প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
