ঢাকা মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

পরীক্ষার কিট শেষ, উদ্যোগে ঘাটতি

পরীক্ষার কিট শেষ, উদ্যোগে ঘাটতি
×

টাঙ্গাইল থেকে গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা শিশু হাসপাতালে আনা হয় আবিরকে। সেখানে আইসিইউ শয্যা খালি না পেয়ে অন্যত্র নিয়ে যান স্বজনরা - সাজ্জাদ নয়ন

 তবিবুর রহমান 

প্রকাশ: ০৬ মে ২০২৬ | ০৯:১৪ | আপডেট: ০৬ মে ২০২৬ | ০৯:৩২

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে হামের পরীক্ষা হয় শুধু রাজধানীর মহাখালীতে জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরীক্ষাগারে (ল্যাবরেটরি)। আর কোথাও এমন ব্যবস্থা নেই। কিন্তু সেই পরীক্ষাগারে হাম পরীক্ষার কিট (সরঞ্জাম) আছে মাত্র সাতটি। এসব কিট দিয়ে সর্বোচ্চ ৬৩০টি রক্তের নমুনা পরীক্ষা করা যাবে। বর্তমান হারে নমুনা পরীক্ষা করলে ছয় দিনের মধ্যে এগুলো শেষ হয়ে যাবে। 

গত এপ্রিল থেকেই পরীক্ষাগারে কিটের সংকট প্রকট হচ্ছিল। কিন্তু জরুরি ভিত্তিতে উদ্যোগের ঘাটতির কারণে এখন পর্যন্ত নতুন জোগান তৈরি হয়নি। ফলে নতুন কিট না এলে ১১ মের পর দেশে হামের নমুনা পরীক্ষা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে। 

প্রতিদিন সারা দেশ থেকে গড়ে ৩০০ রোগীর নমুনা পরীক্ষার জন্য জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরীক্ষাগারে আসে। এরই মধ্যে ৭ হাজার ৭৫৮টি নমুনা জমা হয়ে রয়েছে পরীক্ষার জন্য। 
ফলে দ্রুতই আরও সংকটময় রূপ নেবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে হামের পরিস্থিতি উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। এটিকে মহামারি হিসেবে ঘোষণা করে পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত একটি সমন্বিত চিকিৎসা প্রটোকল প্রস্তুত করা যেত। সেটা হলে স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া ও মাঠ পর্যায়ে পাঠানো যেত। পাশাপাশি ব্যাপক হারে পরীক্ষা বাড়িয়ে রোগী শনাক্ত করে তাদের 
আলাদা রেখে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যেত।

জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট সূত্রে জানা গেছে, গত ১৫ মার্চ থেকে গত সোমবার পর্যন্ত ১৬ হাজার ৫২৭টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে পরীক্ষা সম্পন্ন হওয়া আট হাজার ৭৬৯টি নমুনার বিপরীতে তিন হাজার ৭১৪টিতে হাম শনাক্ত হয়েছে, যা মোট পরীক্ষার ৪২ দশমিক ৩৫ শতাংশ। 

গতকাল মঙ্গলবার জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হাম পরীক্ষার কিট দেয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। একটি কিটে ৯০ জন রোগীর নমুনা পরীক্ষা করা যায়। গতকাল তারা ১০৭টি নমুনা পরীক্ষা করেছেন। তাদের দৈনিক ৩০০ থেকে ৪০০টি নমুনা পরীক্ষার সক্ষমতা আছে। কিন্তু কিট স্বল্পতার কারণে পরীক্ষার সংখ্যা বাড়ানো যাচ্ছে না।

জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক মোমিনুর রহমান বলেন, কিট সংকটের কারণে নমুনা পরীক্ষা কমে গেছে। এক মাস আগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে কিটের চাহিদাপত্র পাঠানো হলেও তা এখনও পাওয়া যায়নি। আশা করছি, ১৫ মে নাগাদ কিট পাওয়া যাবে। বর্তমান অবশিষ্ট থাকা কিট দিয়ে আর চার থেকে পাঁচ দিন পরীক্ষা চালানো যাবে। 
জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল সমকালকে বলেন, এটি স্পষ্ট অবহেলার ফল এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন। কিট সংকটে পরীক্ষা বন্ধ হয়ে গেলে সংক্রমণের প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে না এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হবে। 

দ্রুত রোগ শনাক্ত, রোগী ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ও আইসোলেশন নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন আবু জামিল ফয়সাল। তিনি বলেন, সরকার টিকাদান কার্যক্রম চালালেও আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়, সংসদে আলোচনা এবং বেসরকারি খাতকে যুক্ত করার উদ্যোগ তেমন একটা দেখা যায়নি। বিশেষ করে বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে সম্পৃক্ত করা গেলে পরিস্থিতি মোকাবিলা সহজ হতে পারত।
তিনজন শিশু বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ায় অনেক শিশুর মধ্যে শ্বাসকষ্ট, অক্সিজেনের ঘাটতি, মস্তিষ্কে প্রদাহ, দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়া, খিঁচুনিসহ নানা জটিলতা দেখা দিচ্ছে। ফলে মৃত্যুঝুঁকিও বাড়ছে। তাদের মতে, হামের পরীক্ষার সুবিধা বিকেন্দ্রীকরণ এখন জরুরি। জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে পরীক্ষা চালু করা গেলে দ্রুত রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে এবং ঢাকামুখী চাপও কমবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চিকিৎসক জানিয়েছেন, দেশে নিউমোনিয়াজনিত শিশুমৃত্যুর পরিস্থিতি নতুন নয়। তবে মৃত্যুহার কমাতে দীর্ঘদিন ধরে বড় কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো নিউমোনিয়াসহ জটিল রোগে আক্রান্ত শিশুদের যথাযথ সেবা দেওয়ার মতো জেলা পর্যায়ে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সরঞ্জামের ঘাটতি আছে। 
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন সমকালকে বলেন, মহামারি মোকাবিলার মৌলিক ধাপের মধ্যে আছে ডেথ রিভিউ, সমন্বিত চিকিৎসা প্রোটোকল, ব্যাপক পরীক্ষা, আইসোলেশন ও জনসচেতনতা। কিন্তু এসব ধাপ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হয়নি। তাঁর মতে, জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি ঘোষণা, দ্রুত টিকাদান জোরদার, উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসা সক্ষমতা বাড়ানো, অক্সিজেনসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

মুশতাক হোসেন আরও বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হামের পরিস্থিতিকে উচ্চ ঝুঁকি হিসেবে আখ্যা দেওয়ার পর এ নিয়ে সরকারের জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করা উচিত ছিল। এতে একদিকে যেমন সঠিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যেত, তেমনি সাধারণ মানুষের মধ্যেও সচেতনতা বাড়ানো যেত।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল শাখার পরিচালক মঈনুল আহসান বলেন, কিট সংকটের বিষয়টি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে জানানো হয়েছিল এবং দ্রুত সমাধানের আশ্বাসও পাওয়া যায়। তাঁর মতে, হামের পরীক্ষার কিট সরবরাহ অনেকটাই স্বাস্থ্য সংস্থার ওপর নির্ভরশীল। অন্য একটি সংস্থা কিট দিতে চাইলেও প্রোটোকল না থাকায় নেওয়া সম্ভব হয়নি। 
কিটের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশে হামের কিট সরবরাহের দায়িত্বে থাকা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কর্মকর্তা ডা. চিরঞ্জীব গতকাল বেলা ১১টায় মোবাইল ফোনে সমকালকে বলেন, ‘এ বিষয়ে এভাবে বক্তব্য দেওয়া সম্ভব নয়। আপনি ইমেইলে প্রশ্ন পাঠান, আমাদের মিডিয়া বিভাগে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করবে।’ এর পরই তাদের ইমেইল দেওয়া হয়। তবে ১০ ঘণ্টা পার হলেও ইমেইলের জবাব পাওয়া যায়নি। মাঝে তাঁর মোবাইল ফোনে কয়েকবার কল দিলেও তিনি ধরেননি।  


স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল গতকাল মঙ্গলবার সমকালকে বলেন, ‘কিট সংকট সমাধানে চেষ্টা করা হচ্ছে। ১৫ মে নয়, আমরা আরও দ্রুত টিকা পাব বলে আশা করছি। হাম নিয়ন্ত্রণে টিকাদান কর্মসূচি চলমান রয়েছে। আইসিইউ সংকট নিরসনে কাজ চলছে। হামের আলাদা ইউনিট করে রোগের চিকিৎসা নিশ্চিত করা হচ্ছে। অস্থায়ী হাসপাতালও চালু করা হয়েছে।’ 

টিকার আওতায় প্রায় ৮৯ শতাংশ শিশু
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ মার্চ দেশে হামের সংক্রমণ শনাক্ত হয়। সংক্রমণ বাড়তে থাকায় গত ২৪ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশকে উচ্চ ঝুঁকির দেশ হিসেবে চিহ্নিত করে। এর মধ্যে সরকার ৫ এপ্রিল ১৮টি জেলার ৩০টি উপজেলায় বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে। ১২ এপ্রিল ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনসহ কয়েকটি এলাকায় টিকাদান শুরু হয়। পরে ২০ এপ্রিল থেকে সারাদেশে এই কর্মসূচি চালু করা হয়। জরুরি টিকাদান কর্মসূচির আওতায় এক কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে এক কোটি ৬১ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে, যা মোট লক্ষ্যের প্রায় ৮৯ শতাংশ। 
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. এফ এ আসমা খান বলেন, হামে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে। অধিকাংশ শিশুই তীব্র শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে আসছে। জেলা পর্যায়ে চিকিৎসা সম্ভব না হওয়ায় ঢাকায় পাঠানোর ক্ষেত্রে দেরি হয়ে যাচ্ছে। এতে জটিলতা আরও বাড়ছে। 

সংক্রমণের চিত্র
সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে ছয় শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ সময় নতুন করে এক হাজার ১৮৬ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে ২৬৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আর হাম শনাক্তের পর মারা গেছে ৫৪ শিশু। মোট ৪২ হাজার ৯৭৯ শিশুর মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা গেছে এবং ২৯ হাজার ৮৩১ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে ২৬ হাজার ৩৬৮ শিশু সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে।

সিলেট ও ময়মনসিংহে মৃত্যু
আমাদের সিলেট ও ময়মনসিংহ প্রতিনিধি জানান, সিলেটে গত ২৪ ঘণ্টায় দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তারা হলো সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার প্রিয়ম সরকার (পাঁচ মাস) এবং বিশ্বনাথ উপজেলার ওমর (ছয় মাস)। এ নিয়ে জেলায় মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে আঠারোতে। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একই সময়ে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে সেখানে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে পঁচিশে। হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়লেও শয্যা ও আইসিইউ সংকটের কারণে ভোগান্তি বাড়ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্বজনরা। চিকিৎসকরা বলছেন, সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

 

আরও পড়ুন

×