ঢাকা মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

ভূমিকম্পে কাঁপল দেশ

ঢাকার পাশেই সক্রিয় ফল্টের নতুন সতর্কবার্তা

ঢাকার পাশেই সক্রিয় ফল্টের নতুন সতর্কবার্তা
×

ফাইল ছবি

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬ | ২৩:৩২

ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সোমবার রাত ৯টা ২৯ মিনিটের দিকে মৃদু ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৪ এবং উৎপত্তিস্থল ছিল নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ। যা রাজধানীর আগারগাঁও ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র থেকে প্রায় ১৬ কিলোমিটার পূর্বে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) ভূমিকম্পটির মাত্রা ৪ দশমিক ৪ এবং গভীরতা ১০ কিলোমিটার বলে জানিয়েছে।

ভূমিকম্পে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো হতাহত বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। তবে রাজধানী ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী ও আশপাশের এলাকায় ভূকম্পনটি স্পষ্টভাবে অনুভূত হওয়ায় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণাকেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবাইয়াৎ কবির জানিয়েছেন, রাত ৯টা ২৮ মিনিট ৫৪ সেকেন্ডে এই ভূমিকম্প হয়। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৪। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ঢাকায়।

রূপগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলে ভূমিকম্পের ইতিহাস
ভূমিকম্প পর্যবেক্ষকদের মতে, নারায়ণগঞ্জ ও তার আশপাশের এলাকা দেশের অন্যতম ভূমিকম্প-সংবেদনশীল অঞ্চলের মধ্যে পড়ে। কারণ এ অঞ্চলের নিচ দিয়ে মধুপুর ফল্ট, শীতলক্ষ্যা নদীসংলগ্ন গোপন ফল্ট এবং বৃহত্তর ইন্দো-বার্মা টেকটোনিক প্লেটের প্রভাব বিস্তৃত রয়েছে।

যদিও রূপগঞ্জকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক অতীতে বড় মাত্রার ভূমিকম্পের রেকর্ড খুব বেশি নেই। তবে নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদী অঞ্চলের কাছাকাছি একাধিক উল্লেখযোগ্য ভূমিকম্প হয়েছে।

গত বছরের ২১ নভেম্বর দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৫.৭ এবং উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদীর মাধবদী, যা ঢাকা থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার পূর্বে। ভূমিকম্পে রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় ভবনের অংশবিশেষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং কয়েকজনের প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়। নারায়ণগঞ্জেও ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটে। 

ভূকম্পবিদদের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা অঞ্চলের ৩০০ কিলোমিটারের মধ্যে গত এক শতাব্দীতে একাধিক মাঝারি ও শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়েছে। ১৯১৮ সালের শ্রীমঙ্গল-নরসিংদী অঞ্চলের ৭.১ মাত্রার ভূমিকম্প এবং সাম্প্রতিক দশকগুলোর একাধিক ৫ থেকে ৬ মাত্রার ভূমিকম্প এই অঞ্চলকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। 

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদি আহমেদ আনসারীর বলেন, রূপগঞ্জের এই ভূমিকম্পকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। শীতলক্ষ্যা নদীর আশপাশে একাধিক গোপন বা অপর্যাপ্তভাবে চিহ্নিত ফল্ট সক্রিয় রয়েছে। এ ধরনের ছোট ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প ভূগর্ভস্থ চাপ পুরোপুরি মুক্ত করে না। বরং বড় ভূমিকম্পের সম্ভাবনার ইঙ্গিতও বহন করতে পারে।

তিনি মনে করেন, ঢাকার চারপাশের গোপন ফল্টগুলো দ্রুত শনাক্ত করে জাতীয় ভূমিকম্প ঝুঁকি মানচিত্রে অন্তর্ভুক্ত করা এবং রাজধানীর জন্য পূর্ণাঙ্গ মাইক্রোজোনেশন সম্পন্ন করা জরুরি। কারণ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ নগরী হিসেবে ঢাকায় মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পও বড় ধরনের মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

মেহেদি আহমেদ আনসারী বলেন, রূপগঞ্জের মতো ঢাকার একেবারে নিকটবর্তী এলাকায় ভূমিকম্পের উৎপত্তি হওয়া ভূকম্পবিদদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। এতদিন দেশের ভূমিকম্প ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা প্রধানত ডাউকি ফল্ট, মধুপুর ফল্ট ও আরাকান সাবডাকশন জোনকে ঘিরে থাকলেও এবার ঢাকার উপকণ্ঠের স্থানীয় ফল্টগুলোর সক্রিয়তা নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।

এই ভূমিকম্পে বড় ক্ষতি না হলেও এটি রাজধানী ও আশপাশের অঞ্চলের ভূমিকম্প প্রস্তুতি, ভবন নির্মাণ বিধিমালা বাস্তবায়ন এবং জরুরি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। কারণ ঢাকার খুব কাছাকাছি উৎপত্তিস্থল হওয়ায় ভবিষ্যতে একই অঞ্চলে আরও শক্তিশালী ভূমিকম্প হলে তার প্রভাব অনেক বেশি হতে পারে।

আরও পড়ুন

×