ঢাকা মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

ভারসাম্য রক্ষা করা কখনোই সহজ কাজ নয়: অর্থমন্ত্রী

ভারসাম্য রক্ষা করা কখনোই সহজ কাজ নয়: অর্থমন্ত্রী
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬ | ০১:১৩

আগামী ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং আখ্যা দিয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ভারসাম্য রক্ষা করা কখনোই সহজ কাজ নয়। বিশেষ করে এমন এক সময়ে, যখন দেশ অর্থনৈতিক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং মানুষ অর্থবহ পরিবর্তনের প্রত্যাশা করছে, তখন এই ভারসাম্য রক্ষা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

সোমবার রাজধানীর গ্রিন রোডে ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক (ইউএপি) অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এক বাজেট আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে বাজেট প্রণয়নের জন্য মাত্র দেড় মাস সময় ছিল, অথচ জনগণের প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি। দেশের বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনৈতিক অবস্থা থেকে স্থিতিস্থাপক অবস্থায় পৌঁছাতে অন্তত দুই বছর সময় লাগবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) এবং ইউএপি-এর যৌথ উদ্যোগে ‘দ্য ফিসকাল কম্পাস ২০২৬: বিয়ন্ড দ্য নাম্বার্স, শেপিং বাংলাদেশস ফিউচার, প্রপোজড ন্যাশনাল বাজেট ২০২৬-২০২৭’ শীর্ষক এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইউএপি-এর বিজনেস স্কুলের ডিন অধ্যাপক এম এ বাকী খলিলী এবং সঞ্চালনা করেন সিজিএসের সভাপতি জিল্লুর রহমান।

অর্থনীতির গণতান্ত্রিকীকরণ ও শেয়ারবাজার সংস্কার
অর্থমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন, এই বাজেটের অন্যতম কেন্দ্রীয় ধারণা হলো অর্থনীতির গণতান্ত্রিকীকরণ, যেন নাগরিকরা কেবল নিষ্ক্রিয় দর্শক না হয়ে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে। তিনি তরুণ প্রজন্মের বিকাশ এবং সৃজনশীল অর্থনীতি (যেমন ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্প, বাউল গান ইত্যাদি) বিশ্ববাজারে পৌঁছে দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। ব্যবসায়ীদের জন্য অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রক বাধা ও বিধিনিষেধ শিথিল করার ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, কারও তাঁবেদারি করতে হবে না। কেউ সংস্কারে বাধা দিলে তাঁকে পেছনের দরজা দিয়ে বের করে দেওয়া হবে।

দেশের পুঁজিবাজার প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দেশে শেয়ারবাজার বলে কিছু নেই, এটি ধ্বংস হয়ে গেছে। আমরা এই ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে আসতে শুরু করেছি।

তিনি জানান, রাজনৈতিক বিবেচনা ছাড়াই যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রক সংস্থায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী যেমন জেপি মরগান বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছে। আগামী দুই বছরের মধ্যে দেশের শেয়ারবাজার নিশ্চিতভাবে ঘুরে দাঁড়াবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

সেমিনারে ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আবু আহমেদ সরকারকে কঠোরভাবে সতর্ক করেন। আইএমএফের ঋণের ওপর অতি-নির্ভরতার সমালোচনা করে তিনি বলেন, পৃথিবীর কোনো দেশ আইএমএফের টাকায় ধনী হতে পারেনি। আপনি গরিব থাকতে চাইলে কেউ ধনী করতে পারবে না। 

তিনি পুঁজিবাজারে বহুজাতিক ভালো মানের কোম্পানি তালিকাভুক্ত না হওয়া এবং ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের করমুক্ত লভ্যাংশ সুবিধা তুলে নেওয়ার সমালোচনা করেন। এছাড়া, বন্ধ কারখানার জন্য ২০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিলের অপব্যবহারের আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, উদ্যোক্তারা এই অর্থ দিয়ে বেশি সুদের সরকারি বন্ড কিনে বসে থাকবে। সামনের দিনে দেশ বৈদেশিক ঋণের সুদের ফাঁদে পড়তে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন।

অন্যদিকে, অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম জাহান বলেন, বাজেট শুধু সংখ্যার খেলা নয়, এর একটি মানবিক দর্শন থাকা দরকার। মানববাদী সমাজ গঠনের লক্ষ্যে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নই এই বাজেটের মূল দর্শন হওয়া উচিত। বাজেটে একদিকে সাশ্রয়ী হওয়া এবং অন্যদিকে অভিলাষী হওয়ার যে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করা হয়েছে তা ইতিবাচক, তবে এর অর্থায়ন ও বাস্তবায়নে বড় বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

সেমিনারে অন্য বক্তারাও বাজেট বাস্তবায়নের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং কর কাঠামোর যৌক্তিকীকরণের ওপর জোর দেন। অনুষ্ঠানে ইউএপি-এর বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান কে এম মোজিবুল হক, ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য প্রফেসর ড. মহিউদ্দিন আহমেদ ভূঁইয়া, ট্রান্সকম লিমিটেডের গ্রুপ সিইও সিমিন রহমান, র‍্যাপিডের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক এবং সিজিএসের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসীসহ অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়িক নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

আরও পড়ুন

×