বৃষ্টি ও উজানের ঢল, বিস্তীর্ণ জমির ধান পানির নিচে
আদমদীঘির রক্তদহ বিল এলাকায় ডুবে যাওয়া ক্ষেত থেকে ধান কাটছেন কৃষক সমকাল
আদমদীঘি (বগুড়া) ও রাজারহাট (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬ | ০৮:১৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলের কারণে বগুড়ার আদমদীঘি ও কুড়িগ্রামের রাজারহাটে বিস্তীর্ণ জমির বোরো ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে ফসল নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন ভুক্তভোগী কৃষক। ক্ষতির পরিমাণ কমাতে অনেক পানিতে নেমে শুধু ধানের শীষ কেটে ঘরে তোলার চেষ্টা করছেন।
বৃষ্টি ও নদীর পানির ঢলে আদমদীঘি উপজেলার রক্তদহ বিল এলাকার ১০টি গ্রামের প্রায় ৬০০ বিঘা জমির ধানক্ষেত পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ডুবে যাওয়া ফসল রক্ষায় চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন কৃষক।
ফরমান আলী, ময়েন উদ্দিন, মাহফুজুল, জালাল উদ্দিন, আব্দুল মান্নান, আব্দুর রশিদ, মনছুর রহমান, ফজলুল হকসহ কয়েকজন কৃষক জানান, গত কয়েক দিনের বৃষ্টিপাত এবং নওগাঁর তুলসী গঙ্গা নদীর উজান থেকে ছাতনি হয়ে রক্তদহ বিলে নেমে আসা পানির ঢলে বিস্তীর্ণ আবাদি জমি তলিয়ে গেছে। বিল এলাকায় অবস্থিত করজবাড়ি, দক্ষিণ গণিপুর, সান্দিড়া, বিশিয়া গ্রামসহ আশপাশের ১০টি গ্রামের মাঠে থাকা ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। অনেক জমির ধানগাছ সম্পূর্ণরূপে পানির নিচে, আবার কোনো জমির ধানের শুধু শীষ বের হয়ে আছে। ডুবে থাকা ধান কেটে ঘরে তোলার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছেন কৃষক। তবে অধিকাংশ ধান কেটে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এ ছাড়া ধান কাটা শ্রমিকের মজুরিও বর্তমানে বেশি। প্রতিটি শ্রমিককে বিঘাপ্রতি ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা মজুরি দিতে হচ্ছে।
কৃষি শ্রমিক শহিদুল বাবলু মিয়া জানান, প্রায় জমিতে হাঁটু ও কোমরসমান পানিতে নেমে ধানের গাছের শুধু শীষ কাটতে হচ্ছে। এতে বেশি পরিশ্রমের পাশাপাশি শরীরে চুলকানিও দেখা দিচ্ছে।
আদমদীঘি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম জানায়, অল্পদিনের মধ্যে উজান থেকে নেমে আসা পানি নেমে গেলে খুব বেশি ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা নেই। তবে জলাবদ্ধতা বেশিদিন থাকলে অনেক কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। শিগগিরই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিস্তারিত জানানো হবে।
এদিকে টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিতে রাজারহাটের বিভিন্ন এলাকার বোরোক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক স্থানে জমিতে হাঁটু পরিমাণ পানি জমে থাকায় কৃষক-কৃষানিরা পানির মধ্যেই ধান কাটতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে একদিকে যেমন ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে বেড়েছে ধান কাটার খরচ। ফলে চরম ভোগান্তি ও আর্থিক সংকটে পড়েছেন জেলার কৃষক।
সরেজমিন দেখা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন নিচু এলাকার ধানক্ষেতে পানি জমে রয়েছে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় পেকে যাওয়া ধান দ্রুত জমি থেকে ঘরে তুলতে সবাই একসঙ্গে শ্রমিক খুঁজছেন। এতে শ্রমিকের সংকট তৈরি হওয়ায় বেড়েছে মজুরি। বর্তমানে প্রতি পাঁচ শতক জমির ধান কাটতে শ্রমিকরা ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি নিচ্ছেন। একই সঙ্গে ধান মাড়াই, পরিবহন ও শুকানোর অতিরিক্ত খরচ যোগ হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়ে গেছে। অথচ বাজারে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ ১ হাজার ১০০ টাকায়। এতে ধান চাষে লাভ তো দূরের কথা, উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে কৃষকদের।
কৃষকদের ভাষ্য, বিরূপ আবহাওয়ার কারণে এবার বোরো মৌসুমে কৃষকদের অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে বাজারে ধানের ন্যায্যমূল্য না থাকায় কৃষকদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। কৃষকদের দাবি, উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা না হলে আগামীতে অনেকেই ধান চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন।
উপজেলার কালুয়া গ্রামের কৃষক মমিনুল ইসলাম বলেন, প্রতিদিন বৃষ্টি হওয়ার কারণে জমিতে পানি জমে গেছে। ধান কাটতে দেরি হলে সব নষ্ট হয়ে যাবে। বাধ্য হয়ে বেশি টাকায় শ্রমিক নিয়েছি। এত খরচ করে ধান বিক্রি করেও লাভ থাকছে না।
কুড়িগ্রাম খামারবাড়ি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, কয়েক দিনের অতিবৃষ্টিতে জেলার নিম্নাঞ্চলে কিছু জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে যেসব ৮০% পেকে গেছে তা দ্রুত কর্তনের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
- বিষয় :
- বৃষ্টি
