ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বিশ্ব লবণ সচেতনতা সপ্তাহের সেমিনারে বক্তারা

অতিরিক্ত লবণে দেশে বছরে ২৪ হাজার মানুষের মৃত্যু

অতিরিক্ত লবণে দেশে বছরে ২৪ হাজার মানুষের মৃত্যু
×

ছবি: সমকাল

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬ | ১৬:২৩

বাংলাদেশে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ দৈনিক গড়ে প্রায় ৯ গ্রাম লবণ গ্রহণ করেন, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্ধারিত মাত্রার প্রায় দ্বিগুণ। অতিরিক্ত লবণ গ্রহণের কারণে দেশে প্রতিবছর প্রায় ২৪ হাজার মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। 

বুধবার রাজধানীর শাহবাগে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) কার্যালয়ে বিশ্ব লবণ সচেতনতা সপ্তাহ ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে এসব তথ্য তুলে ধরেন খাদ্য ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। বিএফএসএর উদ্যোগে এবং ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের কারিগরি সহায়তায় এ সেমিনারের আয়োজন করা হয়। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন পরিস্থিতিতে হৃদরোগ, স্ট্রোকসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমাতে ব্যক্তি সচেতনতার পাশাপাশি সরকার, খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। 

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) ফারুক আহম্মেদ। 

তিনি বলেন, অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ এখন নীরব জনস্বাস্থ্য হুমকিতে পরিণত হয়েছে। খাদ্যে অতিরিক্ত লবণের ব্যবহার মানুষের অজান্তেই উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেটজাত খাবারে অতিরিক্ত লবণের উপস্থিতি উদ্বেগজনক।

তিনি আরও বলেন, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর খাদ্য নিশ্চিত করতে খাদ্যের মোড়কে স্পষ্ট পুষ্টি তথ্য উল্লেখ করা জরুরি। পাশাপাশি খাদ্য লেবেলিং ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম সরকারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন কর্তৃপক্ষের সদস্য (খাদ্য শিল্প ও উৎপাদন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েব। 

তিনি বলেন, অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ বিশ্বব্যাপী বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে স্বীকৃত। এটি রক্তচাপ বাড়ায় এবং হৃদরোগসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। একই সঙ্গে অস্বাস্থ্যকর ওজন বৃদ্ধি ও অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণও হয়ে দাঁড়ায়।

ড. মোহাম্মদ শোয়েব আরও বলেন, ব্যক্তি ও পরিবার পর্যায়ে সচেতনতার পাশাপাশি খাদ্যশিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যে লবণের পরিমাণ কমিয়ে স্বাস্থ্যসম্মত পণ্য উৎপাদনে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে কার্যকর জনস্বাস্থ্য নীতি ও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর ওপরও জোর দিতে হবে।

সেমিনারে উপস্থাপিত এক প্রবন্ধে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালের অ্যাসিস্ট্যান্ট সায়েন্টিস্ট ডা. আহমাদ খাইরুল আববার জানান, দেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশই অসংক্রামক রোগে ঘটে। এর মধ্যে ৫১ শতাংশ মানুষ অকালে মারা যান। অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ উচ্চ রক্তচাপ ছাড়াও হৃদরোগ, স্ট্রোক, কিডনি রোগ ও পাকস্থলির ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়।

তিনি বলেন, দেশে প্রতি চারজনের মধ্যে একজন উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা নিয়ন্ত্রণে থাকে না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রোগ্রাম অফিসার (ডায়েট-রিলেটেড রিস্ক ফ্যাক্টর) সামিনা ইসরাত বলেন, বাংলাদেশে ফ্রন্ট-অব-প্যাক লেবেলিং (এফওপিএল) চালু করা খাদ্যজনিত অসংক্রামক রোগ মোকাবিলায় কার্যকর জনস্বাস্থ্য কৌশল হতে পারে। প্যাকেটজাত খাদ্যের সামনের অংশে সহজবোধ্য পুষ্টি তথ্য উল্লেখ থাকলে ভোক্তারা স্বাস্থ্যকর খাদ্য বেছে নিতে পারবেন। ফলে খাদ্যশিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোও পণ্যের পুষ্টিগুণ উন্নত করতে উৎসাহিত হবে।

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী প্রক্রিয়াজাত খাবারে থাকা ‘লুকায়িত লবণ’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। 

তিনি বলেন, চিপস, চানাচুর, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, আচার, স্যুপ ও বিস্কুটসহ বিভিন্ন জনপ্রিয় খাদ্যে উচ্চমাত্রার লবণ থাকে। এমনকি অনেক মিষ্টি স্বাদের খাবারেও অতিরিক্ত সোডিয়াম রয়েছে, যা অধিকাংশ ভোক্তার অজানা। ফলে মানুষ অজান্তেই অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ করছেন।

তিনি উচ্চ লবণযুক্ত খাবার সহজে চিহ্নিত করতে বাধ্যতামূলক ফ্রন্ট-অব-প্যাক সতর্কীকরণ লেবেল চালু, প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের উপাদান পুনর্গঠন এবং শিক্ষামূলক প্রচারণা জোরদারের আহ্বান জানান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. সাইদুল আরেফিন বলেন, দেশে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের ব্যবহার উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। শিশু-কিশোরদের মধ্যে প্যাকেটজাত খাবার গ্রহণের প্রবণতা ভবিষ্যতে অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে। তাই ছোটবেলা থেকেই স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

সেমিনারে লবণ গ্রহণ কমাতে রান্নায় কম লবণ ব্যবহার, খাবারের সঙ্গে আলাদা লবণ না খাওয়া, প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খাওয়া, সস ও আচার সীমিত রাখা এবং খাদ্য কেনার আগে পুষ্টি তথ্য যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হয়।

বক্তারা বলেন, অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে শুধু ব্যক্তিগত সচেতনতা যথেষ্ট নয়; সরকার, খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যখাত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমসহ সব অংশীজনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তারা প্রক্রিয়াজাত খাদ্যে লবণের সর্বোচ্চ মাত্রা নির্ধারণ, ফ্রন্ট-অব-প্যাক সতর্কীকরণ লেবেল চালু এবং জাতীয় পর্যায়ে জনসচেতনতামূলক প্রচারণা জোরদারের আহ্বান জানান।

‘চলুন সবাই মিলে খাবারের লবণ কমাই একসাথে’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এ সেমিনারে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসক, পুষ্টিবিদ, গবেষক, শিক্ষাবিদ, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

আরও পড়ুন

×