একনেকে প্রকল্প অনুমোদন
পদ্মা ব্যারাজে উপকৃত হবে ২৪ জেলার ৭ কোটি মানুষ
ছবি : পিএমও
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৬ | ০৪:২৬ | আপডেট: ১৪ মে ২০২৬ | ০৪:২৬
আলোচিত পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প অনুমোদন করেছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। আগামী মাসে প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হবে। ২০৩৩ সালের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার কথা রয়েছে। এ প্রকল্পের ফলে সরাসরি উপকার পাবে দেশের ২৪ জেলার প্রায় সাত কোটি মানুষ।
প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা। এই ব্যয় প্রাথমিক প্রাক্কলনের চেয়ে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা কম। প্রাথমিক প্রাক্কলনে ব্যয় ধরা হয়ছিল ৫০ হাজার কোটি টাকা। ব্যারাজ নির্মাণে ব্যয় জোগান দেওয়া হবে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে। আপাতত কোনো বিদেশি ঋণ নেই প্রকল্পে। তবে উন্নয়ন সহযোগীদের আগ্রহ দেখা গেলে পরিস্থিতি বুঝে পরবর্তী সময় ঋণ নেওয়া হতে পারে।
বুধবার সচিবালয়ের মন্ত্রিসভা কক্ষে অনুষ্ঠিত একনেক বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন তারেক রহমান। এই নিয়ে বর্তমান সরকারের প্রথম তিনটি একনেক বৈঠক পরিকল্পনা কমিশনের এনইসি সম্মেলন কক্ষের পরিবর্তে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত হলো। বৈঠকে পদ্মা ব্যারাজসহ ৯টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। এসব প্রকল্পের মধ্যে নতন প্রকল্প রয়েছে তিনটি, সংশোধিত পাঁচটি ও মেয়াদ বৃদ্ধির অনুমোদন দেওয়া হয় একটির। এসব প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৬ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকা।
বৈঠকে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী; স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়নমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর; বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ; কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ; শিল্প, বস্ত্র ও পাট এবং বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির; সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন; আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকিসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশগ্রহণ করেন।
একনেক বৈঠক শেষে ব্রিফিংয়ে পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেন, পদ্মা ব্যারাজের সরাসরি উপকার পাবে দেশের ২৪টি জেলার প্রায় ৭ কোটি মানুষ। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, পদ্মা ব্যারাজ দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় হওয়ায় ভারতের সঙ্গে আলোচনার কিছু নেই। তবে গঙ্গা চুক্তি নবায়নে দুই দেশের কমিশন কাজ করছে। আগামী বাজেটের পরই পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার কথাও জানান মন্ত্রী।
প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) প্রেক্ষাপট হিসেবে বলা হয়, ১৯৭৫ সালে ভারত পশ্চিমবঙ্গে ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণের কারণে বাংলাদেশের পদ্মা নদীতে প্রবাহ ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় কৃষি, নৌ চলাচল, সুন্দরবন ও জীববৈচিত্র্যের যে ক্ষতি হয়েছে, তা থেকে এই প্রকল্প সুরক্ষা দেবে। পদ্মা নদীতে শুষ্ক মৌসুমে পানি সংরক্ষণ এবং পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের নদীগুলোতে প্রবাহ বাড়ানোর মাধ্যমে সেচ সহজ করা প্রকল্পের বড় উদ্দেশ্য।
যা থাকছে প্রকল্পে
প্রকল্পের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে প্রায় দুই হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা হবে, যা হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতী, চন্দনা-বারাশিয়া, ইছামতী ও বড়াল নদের ব্যবস্থায় প্রবাহ ফিরিয়ে আনবে। এতে লবণাক্ততা কমবে, স্বাদু পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে এবং সুন্দরবনের প্রতিবেশ রক্ষা পাবে। প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ১৯ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত হলে কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, বরিশাল, পাবনা ও রাজশাহী অঞ্চলে কৃষি উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
সম্ভাব্যতা সমীক্ষার ভিত্তিতে রাজবাড়ী জেলার পাংশা পয়েন্টকে গঙ্গা ব্যারাজ নির্মাণের জন্য সবচেয়ে উপযোগী স্থান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্যারাজের মাধ্যমে নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ, পানি বিভাজন এবং নিম্ন প্রবাহে পানির সুষ্ঠু বণ্টন তুলনামূলক সহজ হবে। ডিপিপিতে প্রকল্পের প্রধান কাজের মধ্যে রয়েছে ৭৮টি স্পিলওয়ে গেট, যার প্রতিটির প্রস্থ ১৮ মিটার। এ ছাড়া ১৮টি আন্ডার স্লুইসগেট থাকবে। নৌযান চলাচলের জন্য ১৪ মিটার প্রশস্ত একটি নেভিগেশন লক এবং দুটি ২০ মিটার প্রশস্ত ফিশ পাস রাখা হবে। ব্যারাজের ওপর দিয়ে ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি রেলওয়ে সেতুও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ প্লান্ট থাকবে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় পানির সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য।
এর বাইরে প্রকল্পের হাইড্রো প্লান্ট থেকে প্রায় বিনা ব্যয়ে ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। ব্যারাজের ওপর দিয়ে দুই কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের একটি রেলওয়ে সেতুও নির্মাণ হবে।
সংকটাপন্ন শুষ্ক মৌসুমে ব্যারাজ দিয়ে ন্যূনতম ৫৭০ ঘনমিটার প্রতি সেকেন্ড পানি ছাড়ার পরিকল্পনা রয়েছে, যা নিম্ন প্রবাহের নদীগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করবে। প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ১৯ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত হলে কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, বরিশাল, পাবনা ও রাজশাহী অঞ্চলে কৃষি উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
প্রকল্পের সুফল হিসেবে বাড়তি ২৫ লাখ টন ধান উৎপাদন হবে। অন্যান্য শস্য উৎপাদন হবে ১০ লাখ টন। ডিপিপি পুনর্গঠনের আগে এসব তথ্য ছিল। পুনর্গঠিত ডিপিপিতে কিছু পরিবর্তন থাকতে পারে।
অনুমোদিত অন্য প্রকল্প
একনেকে অনুমোদিত অন্য প্রকল্পগুলো হচ্ছে চট্টগ্রাম মুসলিম ইনস্টিটিউট সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স স্থাপন। এটি প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনী। গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের বহুতল ভবন নির্মাণ– এই প্রকল্পটিও দ্বিতীয়বারের মতো সংশোধন হলো। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জেলা শহরে বিদ্যমান মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রকে ৩০ শয্যাবিশিষ্ট মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রে উন্নীতকরণ প্রকল্প।
এ ছাড়া তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হাইটেক সিটি-২ এর সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণ (৩য় সংশোধন) প্রকল্প। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সরকারি শিশু পরিবার এবং ছোটমণি নিবাস নির্মাণ (২য় সংশোধন) প্রকল্প। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাভার সেনানিবাসে সৈনিকদের আবাসন সমস্যা নিরসনে ব্যারাক কমপ্লেক্স নির্মাণ প্রকল্প। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের চট্টগ্রাম সিটি আউটার রিং রোড (পতেঙ্গা হতে সাগরিকা) প্রকল্প। এই প্রকল্পটি এ নিয়ে পঞ্চমবারের মতো সংশোধন হলো। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও ময়মনসিংহ কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহের জন্য ধনুয়া থেকে ময়মনসিংহ পর্যন্ত গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণ প্রকল্প (১ম সংশোধন) প্রকল্প। এ ছাড়া পরিকল্পনামন্ত্রী কর্তৃক ইতোমধ্যে অনুমোদিত ৫০ কোটি টাকার কম ব্যয় সংবলিত ২টি প্রকল্প সম্পর্কে একনেক সভায় অবহিত করা হয়।
পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প পাস হওয়ায় আনন্দ মিছিল
রাজবাড়ী প্রতিনিধি জানান, একনেক বৈঠকে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প পাস হওয়ায় রাজবাড়ী জেলা বিএনপির উদ্যোগে আনন্দ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল সন্ধ্যায় জেলা বিএনপির কার্যালয় থেকে মিছিলটি বের হয়ে শহর প্রদক্ষিণ করে ১ নম্বর রেলগেট শহীদ মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি চত্বরে গিয়ে শেষ হয়।
সেখানে এক সমাবেশে বক্তৃতা করেন রাজবাড়ী জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক নইম আনছারী, সাবেক সদস্য সচিব অধ্যক্ষ মঞ্জুরুল আলম দুলাল, জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক গাজী আহসান হাবীব, সদস্য এ মজিদ বিশ্বাস, জেলা শ্রমিক দলের সভাপতি আব্দুল গফুর মণ্ডল প্রমুখ।
বক্তারা বলেন, বিএনপি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার ছিল পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প। মানুষের দীর্ঘদিনের আশা-আকাঙ্ক্ষার পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প একনেকে অনুমোদন পাওয়ায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের উন্নয়ন ও কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নদীভাঙন রোধ, সেচ সুবিধা বৃদ্ধি, কৃষি উৎপাদন উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। অতি দ্রুত প্রকল্পের কাজ শুরু হবে বলে আশা করেন তারা।
- বিষয় :
- প্রধানমন্ত্রী
- পদ্মা ব্যারেজ
