আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস আজ
যেখানে অতীত কথা বলে, আর ভবিষ্যৎ খুঁজে পায় নিজেকে
ছবি-সংগৃহীত
দ্রোহী তারা
প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬ | ০৬:২১
ব্যস্ত নগরজীবনে যখন মানুষ প্রতিদিন ছুটছে নতুনের পেছনে, তখন কিছু নিরিবিলি ভবন নিঃশব্দে আগলে রাখছে শত বছরের গল্প। কোথাও মুঘল আমলের মুদ্রা, কোথাও মুক্তিযুদ্ধের রক্তমাখা স্মারক, আবার কোথাও বিলুপ্তপ্রায় লোকজ সংস্কৃতির শেষ চিহ্ন। এই ঘরগুলোর নাম জাদুঘর।
আজ ১৮ মে, আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস। বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে ‘বিশ্বের ঐক্যে সেতুবন্ধনের জাদুঘর’ প্রতিপাদ্যে। কেবল পুরোনো জিনিসের প্রদর্শনী নয়; জাদুঘর এখন মানুষ, ইতিহাস, শিক্ষা ও ভবিষ্যতের মধ্যে এক জীবন্ত সেতুবন্ধন।
১৯৭৭ সালে ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অব মিউজিয়ামস (আইকম) আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৭৮ সালে দিবসটি প্রথমবার বিশ্বব্যাপী পালিত হয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে জাদুঘরের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাগত গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করে তোলা। সময়ের সঙ্গে সেই ধারণা আরও বিস্তৃত হয়েছে। এখন জাদুঘর কেবল অতীতের সংগ্রহশালা নয়, বরং এটি গবেষণা, শিক্ষা, সংস্কৃতি সংরক্ষণ এবং সভ্যতার ভেতরে পারস্পরিক সংযোগ তৈরিরও গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। কারণ যে জাতি তার স্মৃতি হারায়, সে ধীরে ধীরে নিজের পরিচয়ও হারিয়ে ফেলে।
জাদুঘরে প্রবেশ করলে মানুষ শুধু পুরোনো কিছু জড়বস্তু দেখে না। অনেক সময় সে নিজের অস্তিত্বকেও নতুনভাবে আবিষ্কার করে। একটি পুরোনো নকশিকাঁথা, মাটির হাঁড়ি কিংবা ভাষা আন্দোলনের পোস্টার মানুষকে মনে করিয়ে দেয়, তারও একটি ইতিহাস আছে, একটি শেকড় আছে। জীবনের যান্ত্রিকতার মধ্যে হারিয়ে যাওয়া মানুষ জাদুঘরে গিয়ে বুঝতে পারে, সে কেবল বর্তমানের বাসিন্দা নয়, সে একটি দীর্ঘ সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতার অংশ।
অনেকের কাছেই জাদুঘর এক ধরনের আত্মোপলব্ধির জায়গা। মুক্তিযুদ্ধের গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে কেউ অসমাপ্ত গল্প খুঁজে পায়, কেউ আবার লোকজ সংস্কৃতির নিদর্শন দেখে নিজের গ্রামের স্মৃতিতে ফিরে যায়। একটি পুরোনো হারমোনিয়াম, কৃষকের ব্যবহৃত লাঙল কিংবা কোনো নৃগোষ্ঠীর পোশাক মানুষকে মনে করিয়ে দেয়– সভ্যতা শুধু রাজনীতি বা যুদ্ধের ইতিহাসে গড়ে ওঠেনি, গড়ে উঠেছে সাধারণ মানুষের জীবন, শ্রম, গান ও স্বপ্ন দিয়ে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রযুক্তিনির্ভর বর্তমান সময়ে মানুষ যত ভার্চুয়াল হয়ে উঠছে, জাদুঘর তত বেশি বাস্তব স্মৃতি ও মানবিক সংযোগের প্রয়োজনীয়তা মনে করিয়ে দিচ্ছে। শিশুদের জন্য জাদুঘর হতে পারে জীবন্ত শ্রেণিকক্ষ, যেখানে ইতিহাস বইয়ের পাতার বাইরে এসে চোখের সামনে দাঁড়ায়। আবার গবেষকদের জন্য এটি তথ্য ও প্রমাণের নির্ভরযোগ্য ভান্ডার।
বাংলাদেশেও জাদুঘরের গুরুত্ব ধীরে ধীরে বাড়ছে। রাজধানীর বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, আহসান মঞ্জিল জাদুঘর কিংবা লালবাগ কেল্লা শুধু দর্শনীয় স্থান নয়, এগুলো বাংলাদেশের ইতিহাস, সমাজ ও সংস্কৃতির জীবন্ত দলিল। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে ওঠা লোকজ জাদুঘরগুলোও হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য, বাদ্যযন্ত্র, কৃষিজ সংস্কৃতি ও গ্রামীণ জীবনকে সংরক্ষণ করে চলেছে।
বিশ্বের অনেক জাদুঘর ইতোমধ্যে ভার্চুয়াল প্রদর্শনীর দিকে ঝুঁকেছে। অনলাইনে ঘরে বসেই মানুষ দেখতে পারছে শিল্পকর্ম, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন কিংবা ঐতিহাসিক দলিল। বাংলাদেশের জাদুঘরগুলোও ধীরে ধীরে সেই পথেই এগোচ্ছে।
আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস ২০২৬ উপলক্ষে এবারের প্রতিপাদ্য ‘বিশ্বের ঐক্যে সেতুবন্ধনের জাদুঘর’কে সময়োপযোগী ও তাৎপর্যপূর্ণ উল্লেখ করে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ইবনে ওয়াহাব সমকালকে বলেন, জাতীয় জাদুঘরকে ধীরে ধীরে একটি শিশুবান্ধব জাদুঘরে রূপান্তরের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রতি সপ্তাহে একটি দিন শিশুদের জন্য নির্ধারিত থাকবে। ওই দিন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ গাইডেড ট্যুরের আয়োজন করা হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস উপলক্ষে শিশুদের জন্য বিভিন্ন শিল্পকর্ম প্রদর্শনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। শিশুদের কেন্দ্র করে জাদুঘরের ভেতরে বিশ্বমানবতা ও সভ্যতার ঐক্যের গল্প তুলে ধরতে চায় জাতীয় জাদুঘর।
তানজিম ইবনে ওয়াহাব আরও বলেন, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাস ও ঐতিহ্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং দেশের জাদুঘরগুলোর সংগ্রহও অসাধারণ। তবে দীর্ঘদিন ধরে গ্যালারি ও প্রদর্শন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন না হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে দর্শনার্থীদের কাছে সেগুলো আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে না। এ পরিস্থিতি বদলে দিতে জাদুঘরগুলোকে ডিজিটাল রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, ভার্চুয়াল ট্যুর ও ইমারসিভ এক্সপেরিয়েন্স চালুর কাজ শুরু হয়েছে।
এদিকে দিবসটি উপলক্ষে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের উদ্যোগে আজ সোমবার দিনব্যাপী নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সকাল ১০টায় জাতীয় জাদুঘর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি পর্যন্ত শোভাযাত্রা, ১১টায় জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী প্রদর্শনী গ্যালারিতে বিশেষ প্রদর্শনীর উদ্বোধন, সাড়ে ১১টায় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে আলোচনা সভা এবং বিকেল ৪টায় একই স্থানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
- বিষয় :
- দিবস
- জাতীয় জাদুঘর
