ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

দরপত্রের শর্তের বেড়াজালে আটকা অপারেটর নিয়োগ

দরপত্রের শর্তের বেড়াজালে আটকা অপারেটর নিয়োগ
×

ফাইল ছবি

 হাসনাইন ইমতিয়াজ

প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬ | ০৮:৪৩ | আপডেট: ১৯ মে ২০২৬ | ১১:০৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

নানা জটিলতায় চালু করা যাচ্ছে না জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য নির্মিত সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্প। প্রায় দেড় দশকের পরিকল্পনা এবং সাড়ে আট হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয় এতে। কিন্তু নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার প্রায় দুই বছর পরও পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ (ওঅ্যান্ডএম) কাজে ঠিকাদার নিয়োগ দিতে পারেনি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।

দুই দফা আন্তর্জাতিক দরপত্র ডেকেও ঠিকাদার নিয়োগে জট খোলেনি। এ ছাড়া দরপত্রের শর্তের বেড়াজালে দরদাতা সীমিত হয়ে গেছেন। একই সঙ্গে নির্মাণকারী চীনা প্রতিষ্ঠান চায়না পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানিকে (সিপিপিইসি) সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

জ্বালানি বিভাগ ও বিপিসির একাধিক কর্মকর্তা, দরপত্রে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এসপিএম প্রকল্পের ওঅ্যান্ডএম টেন্ডার এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে বাস্তবে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞ অপারেটরদের অংশগ্রহণ নিরুৎসাহিত হয়। অভিযোগ রয়েছে, শুরু থেকেই একটি প্রভাবশালী চক্র নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান সিপিপিইসিকেই দীর্ঘমেয়াদি অপারেটর হিসেবে বসাতে চেয়েছিল। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হওয়ায় এখন টেন্ডার প্রক্রিয়ায় নানা জটিলতা তৈরি করা হচ্ছে।

বিদেশ থেকে জ্বালানিবোঝাই বড় বড় জাহাজ (মাদার ভেসেল) সরাসরি চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়তে পারে না। সেগুলো গভীর সমুদ্রের কাছে নোঙর করে। সেখান থেকে ছোট ছোট জাহাজে (লাইটারেজ) চট্টগ্রাম বন্দরের সীমানায় অবস্থিত ইস্টার্ন রিফাইনারিতে নিয়ে যাওয়া হয়। এতে সময় লাগে ১০ থেকে ১১ দিন, খরচও হয় বেশি। এসব বিবেচনায় বড় জাহাজ থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল সরাসরি পরিশোধনাগারে সরবরাহের জন্য ২০০৯ সালের দিকে এসপিএম প্রকল্প হাতে নেয় বিপিসি। তবে কাজ শুরু হয় ২০১৮ সালে। এসপিএম চালু হলে মাদার ভেসেল থেকে তেল খালাসের কাজ ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হওয়ার কথা। এতে বছরে অন্তত ৮০০ কোটি টাকা সাশ্রয়ের সম্ভাবনার কথা অনেকবার জানিয়েছে সরকার। দুই বছর ধরে এসপিএম প্রকল্পটি ঝুলে থাকায় সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে এক হাজার ৬০০ কোটি টাকা।

প্রকল্প বাস্তবায়নে ২০১৭ সালের ৩ নভেম্বর চীনা এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে ঋণচুক্তি সই করে সরকার। চার দফা সংশোধনীতে প্রকল্পের খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে আট হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা শুরুতে ধরা হয়েছিল চার হাজার ৯৩৬ কোটি টাকা। 

প্রকল্পটির ইপিসি (ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রকিউরমেন্ট অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন) কাজ পায় চীনের সিপিপিইসি। তবে শুরু থেকেই প্রতিষ্ঠানটির অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল বলে জানিয়েছেন বিপিসির সাবেক দুজন কর্মকর্তা। তাদের মতে, সিপিপিইসির সাবসি পাইপলাইন ও এসপিএম স্থাপনের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা সীমিত ছিল। এ নিয়ে জ্বালানি বিভাগের প্রতিনিধি দল আফ্রিকার একটি দেশে সরেজমিন যাচাইয়েও গিয়েছিল। সেখানে কোম্পানিটির দাবি করা অভিজ্ঞতার সত্যতা না পাওয়ার কথা উল্লেখ করে নেতিবাচক প্রতিবেদন দেওয়া হয়। পরে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলের চাপে তা পরিবর্তন করা হয় বলে জানান সেই কমিটির একজন সদস্য।

২০২৪ সালের এপ্রিলে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর প্রকল্প পরিচালনার জন্য ওঅ্যান্ডএম ঠিকাদার নিয়োগের উদ্যোগ নেয় বিপিসি। প্রথম দফার আন্তর্জাতিক দরপত্রে কয়েকটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখালেও তাদের প্রস্তাবিত ব্যয় বিপিসির নির্ধারিত বাজেটের চেয়ে ৫১ শতাংশ বেশি হওয়ায় সেই দরপত্র বাতিল করা হয়। এরপর দ্বিতীয় দফা দরপত্র আহ্বান করা হয়।

দ্বিতীয় দফার টেন্ডার নিয়েও নতুন বিতর্ক তৈরি হয়। মাত্র তিনটি প্রতিষ্ঠান চীনের সিপিপিইসি ও হিলং এবং ইন্দোনেশিয়ার পার্তামিনা দরপত্র জমা দেয়। নেদারল্যান্ডসের স্মিট ল্যামনালকো ও মিসরের মেরিডাইভের দরপত্রের সময় সীমাবদ্ধতা এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে দরপত্রে অংশ নিতে পারেনি। দরপত্রে আগ্রহী দুটি প্রতিষ্ঠানের অভিযোগ, অনশোর ও অফশোর অপারেশনকে একসঙ্গে বেঁধে দেওয়ায় বিশ্বমানের বিশেষায়িত এসপিএম অপারেটররা কার্যত বাদ পড়ে গেছে। কারণ, অফশোর এসপিএম পরিচালনা এক ধরনের বিশেষ দক্ষতার কাজ আর ট্যাঙ্ক টার্মিনাল ও অনশোর সুবিধা পরিচালনা ভিন্ন দক্ষতানির্ভর।

এক দরদাতা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি সমকালকে বলেন, বিশ্বের বড় এসপিএম অপারেটররা অফশোরে দক্ষ, কিন্তু তাদের সবার ট্যাঙ্ক টার্মিনাল পরিচালনার অভিজ্ঞতা নেই। আবার অনশোর অপারেটরদের অফশোর অভিজ্ঞতা সীমিত। দুটি কাজ একসঙ্গে বেঁধে দেওয়ায় প্রতিযোগিতা কমে গেছে।

দরপত্রের আরও কয়েকটি শর্ত নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, বিপিসি যে কোনো সময় পারফরম্যান্স গ্যারান্টির পরিমাণ বাড়াতে পারবে– এমন শর্ত রাখা হয়েছে। আবার কোনো কারণ ছাড়াই ২৮ দিনের নোটিশে চুক্তি বাতিলের ক্ষমতাও রাখা হয়েছে। চুক্তি স্বাক্ষরের আগেই সরঞ্জাম মোতায়েনের বাধ্যবাধকতা এবং প্রতিটি বিলের বিপরীতে ৫ শতাংশ অর্থ আটকে রাখার শর্তও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

প্রথম টেন্ডারে বিশ্বের শীর্ষ এসপিএম বয়া নির্মাতা ব্লু ওয়াটার এনার্জি এবং অভিজ্ঞ অপারেটর কুটুগ ইন্টারন্যাশনাল অংশ নিতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত তারা অযোগ্য ঘোষিত হয়। এর মধ্যে অন্য দেশে সিপিপিইসির কার্যক্রম নিয়ে বিতর্ক নতুন করে সামনে এসেছে। মালয়েশিয়ার বহুল আলোচিত ওয়ানএমডিবি কেলেঙ্কারিতে প্রতিষ্ঠানটির নাম উঠে আসে।  দুর্নীতির অভিযোগে মালয়েশিয়া সরকার প্রকল্প বাতিল করে এবং কয়েকশ মিলিয়ন ডলার জব্দ করে। সাইপ্রাসের এলএনজি টার্মিনাল প্রকল্পেও সিপিপিইসির বিরুদ্ধে বিলম্ব, ব্যয় বৃদ্ধি ও দুর্নীতির অভিযোগে তদন্ত চলছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেন, অপারেটর নিয়োগ নিয়ে দীর্ঘসূত্রতা প্রকল্পটিকেই ঝুঁকিতে ফেলছে। অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকায় যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও বাড়ছে। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে নতুন করে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র না ডাকা হলে এসপিএম প্রকল্প নিয়ে বিতর্ক আরও গভীর হবে।

এসপিএম প্রকল্পের সাবেক পরিচালক এবং রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শরীফ হাসনাত সমকালকে বলেন, সিপিপিইসি ট্রায়াল রান করে প্রকল্প নির্মাণ সম্পন্ন করেছে। দরপত্র নিয়ে বিতর্কের বিষয়ে তিনি বলেন, ওঅ্যান্ডএম ঠিকাদার নিয়োগে কাজ করছে বিপিসি, তারাই সব দেখছে।

জানতে চাইলে বিপিসির একজন পরিচালক বলেন, পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের পরামর্শ অনুসারে দরপত্র ডাকা হয়েছে। শর্তও সেভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। তাই কোনো কোম্পানিকে বাড়তি সুবিধার দেওয়ার অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই।

আরও পড়ুন

×