সমকাল এক্সপ্লেইনার
মহিষের নাম ট্রাম্প-মোদি রাখার রাজনীতি ও অর্থনীতি
নারায়ণগঞ্জের একটি খামারে এই মহিষটির নাম রাখা হয়েছে ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’। ছবি: এএফপি
সাদিকুর রহমান
প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬ | ১৮:১১ | আপডেট: ২২ মে ২০২৬ | ১৯:০১
ঠিক পাঁচ বছর আগে ২০২১ সালের মে মাসে ১২ দিনের সংঘাতে জড়িয়েছিল ফিলিস্তিনের সশস্ত্রগোষ্ঠী হামাস ও ইসরায়েল। সে বছরের জুলাইয়ে ঈদুল আজহা উপলক্ষে গাজীপুরের এক খামারে কোরবানির পশুর নাম রাখা হয়েছিল ‘হামাস’।
পাঁচ বছর পর ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নারায়ণগঞ্জের একটি খামারে মহিষের নাম রাখা হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্প। আরেকটিকে ডাকা হচ্ছে ‘নেতানিয়াহু’ নামে। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জেরই একটি খামারে মহিষের নাম রাখা হয়েছে ‘মোদি মহিষ’। আসন্ন ফুটবল বিশ্বকাপের উন্মাদনায় যশোরে একটি গরুর নাম রাখা হয়েছে ব্রাজিলিয়ান তারকা নেইমারের নামানুসারে।
২০২১ ও ২৬ এর মাঝের বছরগুলোতেও কোরবানির পশুর হাট কিংবা খামারে সমসাময়িক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গরু-মহিষের নামকরণের প্রবণতা দেখা গেছে। একটি ধর্মীয় আচারের জন্য নির্ধারিত পশুর গায়ে যখন কোনো বিশ্বনেতা বা বিতর্কিত ব্যক্তির নাম সেঁটে দেওয়া হয়, তখন সেটি আর কেবল একটি পশু থাকে না; পরিণত হয় শক্তিশালী প্রতীকী বার্তায়।
প্রশ্ন হলো- এই নামকরণের পেছনে ঠিক কী ধরনের মনস্তত্ত্ব কাজ করে, কেন সাধারণ মানুষ একজন ক্ষমতাধর নেতার নাম কোরবানির পশুর সঙ্গে যুক্ত করছে এবং ডিজিটাল যুগের অ্যাটেনশন ইকোনমি বা মনোযোগের অর্থনীতি কীভাবে এই ট্রেন্ডকে উসকে দিচ্ছে?
অ্যাটেনশন ইকোনমি
একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক বাজার ব্যবস্থায়, বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রসারের ফলে, কোরবানির পশুর হাটগুলো এখন আক্ষরিক অর্থেই একটি ‘অ্যাটেনশন ইকোনমি’ বা মনোযোগের অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে।

অ্যাটেনশন ইকোনমির তাত্ত্বিক ভিত্তি হলো- আধুনিক বিশ্বে তথ্যের কোনো অভাব নেই, বরং অভাব আছে মানুষের মনোযোগের। তাই যেখানে মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করা যায়, অর্থের প্রবাহ সেদিকেই যায়।
নারায়ণগঞ্জের একটি খামারে অ্যালবিনো (ধবল) জাতের যে মহিষটির নাম ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ রাখা হয়েছে, সেটি দেখতে বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ ভিড় করছেন। মহিষটি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমেও খবরের শিরোনাম হয়েছে। সুদূর ফ্রান্সের গণমাধ্যম টিএফওয়ান-এর ফেসবুক পেজে মহিষটি নিয়ে বানানো একটি রিল ৬২ লাখের বেশি দেখা হয়েছে।
সমকালের ১২ মের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৭০০ কেজি ওজনের মহিষটি লাইভ ওয়েট হিসেবে প্রতিকেজি ৫৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। সে হিসেবে মোট দাম পড়েছে ৩ লাখ ৮৫ হাজার টাকা।
সরকারের প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ঈদুল আজহায় ৯১ লাখ ৩৬ হাজার ৭৩৪টি পশু কোরবানি হয়। এমন পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, দেশে ঈদ ঘিরে গবাদিপশু লালন-পালন ও বিক্রি একটি বড় ধরনের ব্যবসা। একইসঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে নিজের খামারের পশুকে আলাদাভাবে উপস্থাপন করাটাও কৌশলে পরিণত হয়েছে।
যেমন- নারায়ণগঞ্জের মহিষটির ক্ষেত্রে বিক্রেতারা যুক্তি দিচ্ছেন, মাথায় একগুচ্ছ সোনালি চুলের মিল থাকায় এর নাম রাখা হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিজেও তাঁর হালকা সোনালি চুলের জন্য বেশ পরিচিত। এই নামের কারণে মহিষটি সাধারণ মানুষ ও গণমাধ্যমের যে বিপুল মনোযোগ আকর্ষণ করেছে, তা সাধারণ বিপণন কৌশলের মাধ্যমে অর্জন করা প্রায় অসম্ভব।

গত কয়েক বছরের প্রবণতা দেখাচ্ছে, ডিজিটাল ইনফ্লুয়েন্সাররা মূলত পশুর হাটে ‘ভাইরাল মার্কেটিং’-এর প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করেন। এটি এমন এক বিপণন কৌশল যা মানুষের আবেগ, কৌতূহল ও বিনোদনের অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে কোনো কনটেন্টকে দ্রুত ডিজিটাল মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করে।
সামাজিক মাধ্যমের অ্যালগরিদমও অস্বাভাবিক বা কৌতূহলোদ্দীপক কনটেন্ট খুব দ্রুত মানুষের ফিডে ছড়িয়ে দেয়। যেমন- নারায়ণগঞ্জের খামারটিতে যাওয়া দর্শনার্থীরাই বলছেন, তারা সামাজিক মাধ্যমে তথ্য পেয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে আলোচিত ব্যক্তি ডোনাল্ড ট্রাম্পের নামে রাখা মহিষটি দেখতে গেছেন।
রাজনীতিও তাহলে যুক্ত?
নারায়ণগঞ্জের মহিষটি নিয়ে ব্রিটিশ দৈনিক টেলিগ্রাফ যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সেটির মন্তব্যের ঘরে এক ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, ‘মেক ক্যাটল গ্রেট অ্যাগেইন’। এই মন্তব্যটি অনেকটা ট্রাম্পের রাজনৈতিক ও নির্বাচনী প্রচার ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’-এর আদলে করা হয়েছে।
পাকিস্তানের গণমাধ্যম ডনের প্রকাশিত প্রতিবেদনে মন্তব্যের ঘরে আরেক ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, ‘ট্রাম্পের সঙ্গে পার্থক্য হলো, মহিষটির কথা এপস্টেইন ফাইলে নেই’। কুখ্যাত মার্কিন যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনের অপরাধের ঘটনা নিয়ে প্রকাশিত নথি এপস্টেইন ফাইল নামে পরিচিত। যেখানে ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ বিভিন্ন দেশের রাজনীতিবিদদের নাম আছে।

এই দুটি মন্তব্য দেখাচ্ছে, কোরবানির পশুর নাম দেখেই পাঠকের রাজনৈতিক মনোভাব প্রকাশ পাচ্ছে। অর্থ্যাৎ, তারা ক্ষমতাশালী ব্যক্তিকে পরোক্ষভাবে ব্যঙ্গ করার সুযোগ পেয়েছেন। বিষয়টির আরো ভালো ব্যাখ্যা পাওয়া যায় রাশিয়ান দার্শনিক মিখাইল বাখতিনের ‘কার্নিভালেস্ক’ তত্ত্বে।
বাখতিনের মতে, কার্নিভাল বা মেলা হলো এমন একটি স্থান যেখানে সমাজের প্রতিষ্ঠিত সমস্ত নিয়মকানুন, আনুষ্ঠানিকতা, শ্রেণিবিন্যাস এবং ক্ষমতার দম্ভ সাময়িকভাবে স্থগিত হয়ে যায়। কার্নিভালের সময় সমাজে একটি উল্টো পৃথিবী তৈরি হয়। যেখানে রাজা সাময়িকভাবে পরিণত হয় ভিখারিতে, আর ভিখারি বা বোকা ব্যক্তি রাজার বেশ ধারণ করেন। যেটিকে বাখতিন ক্ষমতার উল্টোপাল্টা রূপ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
নামকরণের ট্রেন্ড বিবেচনায় ধরলে বাংলাদেশের কোরবানির পশুর হাটগুলো সেই কার্নিভালেস্ক তত্ত্বের একটি নিখুঁত উদাহরণ। একজন সাধারণ কৃষক ও গরুর ব্যাপারী যখন তার গবাদিপশুর নাম ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ বা ‘নেতানিয়াহু’ রাখেন, তখন তিনি মূলত বাখতিনের সেই ‘উল্টানো পৃথিবীর’ জন্ম দেন। যেখানে বিশ্ব রাজনীতির পরাক্রমশালী ব্যক্তিরা নগণ্য ও ব্যঙ্গাত্মক চরিত্রে পরিণত হন।
বিষয়টিকে আরেকভাবেও দেখা যায়। তথাকথিত তৃতীয় বিশ্বের সাধারণ মানুষের পক্ষে ট্রাম্প কিংবা নেতানিয়াহুর মতো ব্যক্তিদের প্রত্যক্ষ সমালোচনা কিংবা তাদের ক্ষমতার ওপর আঘাত করা অসম্ভব। কিন্তু কার্নিভালের পরিবেশে (কোরবানির পশুর হাট) ক্ষমতাধর ব্যক্তির নাম এমন এক প্রাণীর সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে, যেটিকে দড়ি দিয়ে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়। এ দৃশ্য দেখাটাও একজন সাধারণ দর্শকের কাছে প্রতীকী বিজয়।

যেমন- টেলিগ্রাফে প্রকাশিত প্রতিবেদনের মন্তব্যের ঘরে আজহার ইসলাম রাসেল নামে একজন লিখেছেন, ‘মহিষ ও ট্রাম্পের মধ্যে একমাত্র পার্থক্য হলো- মহিষটি সহিংস নয়।’ ফারিস্তা আন্দালিব নামে আরেক ফেসবুক ব্যবহারকারীর মতে, ‘মহিষটিকে ট্রাম্পের চেয়ে বরং মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের মতো লাগছে।’ হুসাইনি উসমান নামে আরেকজন লিখেছেন, ‘ক্রেতার উচিত মহিষটিকে চিড়িয়াখানায় রাখা, যাতে আরো দর্শনার্থী দেখতে পারে।’
এটি এক ধরনের লুকায়িত প্রতিরোধ, যা সরাসরি রাজনৈতিক বিক্ষোভের পরিবর্তে ব্যঙ্গ ও হাস্যরসের মোড়কে প্রকাশ পায়।
বিশ্বে পশুকেন্দ্রিক যত ব্যঙ্গ
ফরাসি বিপ্লবের সময় রানি মেরি অ্যান্টোয়েনেটের চিতাবাঘের ক্যারিকেচার প্রকাশ করা হতো। এর মনস্তাত্ত্বিক উদ্দেশ্য ছিল রানিকে অমানবিক হিসেবে জনতার সামনে উপস্থাপন করা। একইভাবে, রাজা ষোড়শ লুইসহ সম্পূর্ণ রাজপরিবারকে শুকরের পাল হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছিল। যা তাদের লোভ ও সম্পদ গিলে খাওয়ার প্রতীক ছিল।

সাহিত্যের জগতে আরেকটি উদাহরণ হলো জর্জ অরওয়েলের কালজয়ী উপন্যাস ‘অ্যানিমেল ফার্ম’। সেখানে সোভিয়েত ইউনিয়নের স্তালিনপন্থী সমাজতন্ত্রের পতন এবং স্বৈরাচারী শাসনকে রূপকভাবে তুলে ধরতে খামারের পশুদের ব্যবহার করা হয়েছে। স্তালিনকে চিত্রিত করা হয় স্বৈরাচারী শুকর হিসেবে।
সম্প্রতি জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অজ্ঞতাকে ব্যঙ্গ করতে পরিবেশবাদীরা একটি উভচর প্রাণীর বৈজ্ঞানিক নাম রেখেছেন ‘ডেরমোফিস ডোনাল্ড ট্রাম্পি’।
