বনায়নের সাফল্যগাথা
'গাছ কখনও বেইমানি করে না'
হাসনাইন ইমতিয়াজ, নাইক্ষ্যংছড়ি থেকে ফিরে
প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০১৯ | ১৩:০৯ | আপডেট: ০৪ অক্টোবর ২০১৯ | ১৩:১০
'আঁরার পোরাছাড়ে পড়ার লাই অ্যাঁই গাছ আরার সম্বল,' আঞ্চলিকতা থেকে খাঁটি
বাংলায় এর মানে দাঁড়ায়, 'আমার সন্তানদের পড়াশোনার জন্য এই গাছই আমাদের
সম্বল।' নাইক্ষ্যংছড়ি কেন্দ্রীয় মহাশ্মশানে দাঁড়িয়ে নিজের গড়া বাগান দেখিয়ে
কথাগুলো বলছিলেন ৪৮ বছর বয়সী নাসরিন আক্তার। এই গাছ বিক্রির অর্থ থেকেই
নিজের ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার খরচ জুগিয়েছেন তিনি এবং তার স্বামী ৫৫ বছর বয়সী
ফারুক আহমেদ।
নাইক্ষ্যংছড়ি কেন্দ্রীয় মহাশ্মশান এখন অনেক বেশি সবুজ। এই শ্মশানের তিন একর
জমিতে গড়ে উঠেছে নাসরিনের বাগান । রয়েছে আকাশমণি, একাশিয়া। চারাগুলো বেড়ে
ওঠার সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে উঠেছে নাসরিন আক্তারের স্বপ্নও।
ফারুক আহমেদের জীবিকা মূলত কৃষি। নিজের স্বল্প আয়ে সংসার চালাতে হিমশিম
খাচ্ছিলেন তিনি। বিয়ের পর কক্সবাজার থেকে পাশের উপজেলা রামুতে স্বামীর বাড়ি
চলে আসেন নাসরিন আক্তার। এরপর থেকেই নিজেকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার
সংগ্রামে লিপ্ত হন তিনি। তবে কিছু উদ্যোগ শুরুতেই ভেস্তে যায়। এক সময় বনায়ন
তাকে নতুন পথ দেখায়। ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো (বিএটি) বাংলাদেশের
বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির কথা শুনেছিলেন প্রতিবেশীর কাছে।
তাদের কাছ থেকে দুই হাজার চারা নিয়ে বুনলেন নতুন স্বপ্ন।
গত সেপ্টেম্বরের এক রোদেলা দুপুরে নাইক্ষ্যংছড়িতে নিজের বাগান ঘুরে
দেখাচ্ছিলেন নাসরিন আক্তার। তিনি বলেন, '২০০৬ সালে বিএটির কাছ থেকে
বিনামূল্যে গাছের চারা পাই। তাদের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা বনায়নের বিষয়ে
প্রাথমিক ধারণা দেন। সেই থেকে শুরু। এরপর আমার সন্তানদের সঙ্গে সঙ্গে
গাছগুলো বড় হতে লাগল। এই বনায়নই আমাকে দরিদ্রতার জাঁতাকল থেকে মুক্তি
দিয়েছে। এ কাজে সবসময় স্বামীর সহযোগিতা পেয়েছি।'
তিনি বলেন, 'কখনও ভাবিনি সন্তানদের সুশিক্ষিত হিসেবে গড়ে তুলতে পারব। এখানে
জীবিকা হিসেবে সাধারণ মানুষ একসময় সংরক্ষিত বনের গাছ কাটত। এখন ধীরে ধীরে
সেটা বন্ধ হচ্ছে। আর ব্যক্তিগত বনের যে গাছ কাটা হয়, তার কয়েকগুণ বেশি
গাছের চারা লাগানো হয়।' নাসরিন আক্তার জানান, তার বড় ছেলে ইসলামী
বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকে পড়ছেন। দুই মেয়ের একজন উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি
পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য লড়ছেন এবং আরেকজন দশম শ্রেণিতে।
আঙুলের কড়ের হিসাব গুণে আর কিছুক্ষণ ভেবে নাসরিন জানালেন, এখন তার তিনটি
বাগান। যার মধ্যে জারুলিয়াছড়িতে রয়েছে ১০ একর এবং নাইক্ষ্যংছড়িতে ২টি প্লটে
মোট ৫ একর। এসব বাগানে প্রায় তিন হাজার সেগুন গাছ রয়েছে। এ ছাড়া কলা, আদা,
লেবু, আকাশমণি, একাশিয়া গাছও আছে। কাঠ গাছগুলো সাত বছরের পর থেকে বিক্রির
উপযুক্ত হয়। এগুলো থেকে আসবাব তৈরির মূল্যবান কাঠ পাওয়া যায়। আর প্রতিবছর
গাছ ছাঁটা ও অতিরিক্ত গাছ কাটার ফলে পাওয়া যায় লাকড়ি। এই লাকড়ি পরিবারের
জ্বালানি চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বিক্রি করে অর্থ পাওয়া যায়।
গত দুই বছরেই এই গাছ থেকে আড়াই লাখ টাকা এসেছে নাসরিনের। তিনি বলেন,
'একবারে তো সব গাছ কাটা যায় না। যখন প্রয়োজন হয় এবং উপযুক্ত হয় তখনই বিক্রি
করি। আবার প্রতি বর্ষাতেই নতুন করে গাছ লাগাই।' এই গাছ শুধু যে নাসরিন
আক্তার এবং ফারুক আহমেদকে স্বাবলম্বী করেছে, তাই নয়। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য
(এসডিজি) অর্জনে দারিদ্র্য বিলোপ করতে বাংলাদেশ সরকারের যে অগ্রযাত্রা,
নাসরিনের বনায়ন ভূমিকা রাখছে সেখানেও।
দুপুর গড়িয়ে তখন বিকেল। বর্ষার পর গাছের পাতায় শরতের আনাগোনা। নাসরিন
আক্তারের হাসিমাখা মুখে জড়িয়ে আছে গাছের সতেজ সবুজের মায়া। বিকেলের তেরছা
আলোতে সেই মায়া আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। বাগান ছেড়ে আসার সময় নাসরিন আক্তার
নিজ বাসায় আপ্যায়ন করলেন নিজের বাগানের ফল দিয়ে। বিদায় জানানোর সময় বললেন,
'ভাই, মানুষ বেইমানি করতে পারে, গাছ কখনও করে না'।
- বিষয় :
- বনায়নের সাফল্যগাথা
