কোরবানির হাটে বড় ধস
২২ লাখের বেশি পশু অবিক্রীত, পথে বসার শঙ্কায় খামারিরা
বড় গরুর ক্রেতা কম
রাজধানীর বিভিন্ন হাটে শেষ পর্যন্ত গরু বিক্রির জন্য অপেক্ষায় ছিলেন ব্যবসায়ীরা। ক্রেতা না পেয়ে অনেকে গরু ফিরিয়ে নিয়ে যান। গত মঙ্গলবার শাহজাহানপুর মৈত্রী সংঘ ক্লাব মাঠে - ফোকাস বাংলা
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ | ০৮:০০ | আপডেট: ০২ জুন ২০২৬ | ১০:২৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
কোরবানি শেষে দেশের বিভিন্ন হাট থেকে এখনও ট্রাকে ট্রাকে ফিরছে অবিক্রীত গরু। রাজধানীর গাবতলী, কমলাপুর, দিয়াবাড়ীসহ বিভিন্ন অস্থায়ী পশুর হাটে বড় গরুর সারি পড়েছিল শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত। ক্রেতা না পেয়ে অনেকে লোকসান গুনে গরু বিক্রি করেছেন। আবার অনেকে গরু ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর কোরবানিযোগ্য পশু ছিল এক কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার। এর মধ্যে এক কোটির কিছু বেশি পশু কোরবানি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অর্থাৎ অবিক্রীত রয়ে গেছে ২২ থেকে ২৩ লাখ পশু।
মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া, বড় গরুর চাহিদা কম থাকা এবং সীমান্ত দিয়ে ভারত ও মিয়ানমার থেকে অবৈধভাবে গরু আসায় বাজারে এমন ধস নেমেছে বলে মনে করছেন খামারি ও ব্যবসায়ীরা। এর সঙ্গে কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি ও কাদাময় হাট পরিস্থিতি পশু বিক্রিকে আরও কঠিন করে তোলে।
এবার সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন বড় গরুর খামারিরা। রাজধানীর বাজারে বড় গরু নিয়ে আসা অনেকেরই ৫০ থেকে ৯০ শতাংশ অবিক্রীত থেকে গেছে। কেউ কেউ প্রতি গরুতে লাখ টাকার বেশি ক্ষতির কথা জানিয়েছেন।
বগুড়া সদর থেকে রাজধানীর গাবতলী হাটে ২৫টি গরু এনেছিলেন মাহবুব হোসেন। বিক্রি করতে পেরেছেন ১৭টি। তিনি বলেন, ‘সব গরুই বড় ছিল। সবই লোকসানে বিক্রি করেছি। যে গরুর পেছনে খরচ হয়েছে এক লাখ ৬৫ হাজার টাকা, সেটাই ঢাকায় এনে এক লাখ ২৫ হাজার টাকায় বিক্রি করতে হয়েছে।’
মানিকগঞ্জ থেকে গাবতলী হাটে আসা ব্যবসায়ী আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘৫০টা গরু এনেছিলাম; বিক্রি করতে পেরেছি ১৮টা। বাকিগুলো ফিরিয়ে নিতে হচ্ছে। এবার আমরা গরুর সঙ্গে নিজেরাও কোরবানি হয়ে গেছি।’ আরেক ব্যবসায়ী আবদুস সাত্তার বলেন, ৪০টি গরুর মধ্যে ২০টি বিক্রি হয়নি। ঈদের দুই দিন আগে যে গরুর দাম তিন লাখ ৮০ হাজার টাকা বলা হয়েছিল, সেটি শেষ পর্যন্ত দুই লাখ ৭০ হাজার টাকায় বিক্রি করতে হয়েছে। তিনি বলেন, ‘ঋণ করে গরু কিনেছি। টাকা পরিশোধ করতে হবে বলেই কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছি।’
দিনাজপুর থেকে ৮০টি গরু নিয়ে গাবতলী হাটে এসেছিলেন ব্যবসায়ী মামুন। চারটি ট্রাকে গরু আনার ভাড়া গুনতে হয়েছে ৮০ হাজার টাকা। সঙ্গে ছিলেন ১১ জন শ্রমিক। মামুন বলেন, ‘খাওয়া-দাওয়া, গোসল, টয়লেট– সবকিছুর জন্য টাকা লাগে। এখানে শুধু খরচই হয়েছে; লাভ হয়নি। ঈদের দিন সকাল পর্যন্ত কোনো গরু বিক্রি করতে পারিনি। বাধ্য হয়ে এখন গরু বাড়ি নিয়ে যাচ্ছি।’
কুষ্টিয়া থেকে ৩০টি গরু নিয়ে রাজধানীর কমলাপুর অস্থায়ী পশুর হাটে এসেছিলেন মো. সোহেল আলী। ১০ জন মিলে প্রায় ৫০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন তারা। সোহেল আলী বলেন, ‘৩০টা গরুর মধ্যে মাত্র দুটি বিক্রি করতে পেরেছি। বাকি ২৮টা আবার গ্রামে নিয়ে গেছি। গরু ফিরিয়ে নিতে শুধু ট্রাক ভাড়াই লেগেছে ৩৩ হাজার টাকা।’
কুষ্টিয়ার মিরপুর থেকে চারটি গরু নিয়ে আসা আরেক ব্যবসায়ী বলেন, দুটি গরু বিক্রি করে ইতোমধ্যে এক লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। বাকি দুটি গরুর দাম ক্রেতারা বলছেন, এক লাখ টাকা করে। অথচ কেনা হয়েছে দেড় লাখ টাকা দিয়ে। তিনি বলেন, এভাবে বিক্রি করলে পুরো পুঁজি শেষ হয়ে যাবে। তাই গরু ফিরিয়ে নিচ্ছি।
মানিকগঞ্জ, পাবনা, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, যশোরসহ বিভিন্ন এলাকার খামারি ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবার ছোট ও মাঝারি গরুর চাহিদা ছিল তুলনামূলক বেশি। বাজারে বড় গরুর ক্রেতা কম থাকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত বড় খামারিরা। ঢাকায় এসে থাকা, খাওয়ানো, শ্রমিক খরচ, হাটের খরচ মিলিয়ে কয়েক লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে বলে জানাচ্ছেন অনেক খামারি। এখন অবিক্রীত গরু নিয়ে খামারে ফিরে যাওয়ায় খাদ্য ও রক্ষণাবেক্ষণের চাপ আরও বাড়বে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি গরু লালন-পালনে সাধারণত ছয় মাস থেকে এক বছর সময় লাগে। খাবার, আশ্রয়, ওষুধ, পরিচর্যাসহ ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়।
রংপুর নগরীর মাহিগঞ্জের খামারি মেহেরুল ইসলাম বলেন, আমি আটটি ষাঁড় এনে মাত্র চারটি বিক্রি করতে পেরেছি। বাকি চারটি নিয়ে এখন প্রতিদিন প্রায় এক হাজার টাকা খরচ করছি। আমার মতো অনেক খামারির একই দশা।
রংপুর সদর উপজেলার খাসবাগ গ্রামের ৫৫ বছর বয়সী কৃষক আনোয়ার আলীর কণ্ঠে এখন শুধুই হতাশা। তিনি বলেন, সারাবছর পাঁচটি ষাঁড় লালন করেছি। আশা ছিল, প্রতিটি দেড় লাখ টাকার বেশি দামে বিক্রি করব। কিন্তু হাটে পাঁচ দিন থেকে মাত্র তিনটি বিক্রি করতে পেরেছি; তাও কম দামে। বাকি দুটি বাড়ি ফিরিয়ে এনেছি। এখন প্রতিদিন প্রতিটি গরুর পেছনে ২৫০ টাকার খাবার খরচ হচ্ছে। কতদিন এভাবে চালাতে পারব, জানি না।
বাংলাদেশ ডেইরি ফারমার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহসভাপতি নিলয় হোসেন বলেন, মানুষের আর্থিক অবস্থা ভালো না। বড় গরুর বাজার প্রায় ভেঙে পড়েছে। দেশে কোরবানিতে ৯৮ শতাংশ ছোট গরুর চাহিদা। এগুলোর মূল উৎপাদক প্রান্তিক খামারি। বড় করপোরেট খামারগুলোর উৎপাদন ব্যয় অনেক বেশি হওয়ায় তারা ছোট গরু উৎপাদনে যায় না। তিনি বলেন, প্রান্তিক কৃষক নিজ বাড়িতে গরু পালন করেন। তাদের খরচ কম।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক এ.বি.এম. খালেদুজ্জামান বলেন, গত বছর ৯১ লাখ পশু কোরবানির তথ্য আমাদের কাছে ছিল। এবারও কাছাকাছি যাবে। তবে পরিসংখ্যান অনুযায়ী পুরোপুরি তথ্য আমাদের মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী এবং মহাপরিচালকের উপস্থিতিতে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জানানো হবে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. শাহজামান খান বলেন, এখনও কোরবানি হওয়া পশুর চূড়ান্ত হিসাব প্রস্তুত হয়নি। তিনি বলেন, মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর কোরবানি নির্ভর করে। মাঠ পর্যায় থেকে চূড়ান্ত হিসাব না আসা পর্যন্ত নির্দিষ্ট কিছু বলা যাচ্ছে না। অবিক্রীত পশু প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শুধু কোরবানির সময় পশু থাকবে, তারপর সারাবছর সংকট– এমন হওয়া উচিত নয়। কিছু উদ্বৃত্ত থাকলে সারাবছর বাজারে সরবরাহ বজায় থাকে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, খামারিদের পাশে সরকারকে দাঁড়াতে হবে। কোরবানি ছাড়াও সারাবছর মাংসের বাজার স্বাভাবিক রাখতে সরকারকে আলাদা পরিকল্পনা নিতে হবে।
