ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

পুষ্প

শ্বেত রঙ্গনের শুভ্র শোভা

শ্বেত রঙ্গনের শুভ্র শোভা
×

ধানমন্ডির একটি সড়কের পাশে সম্প্রতি ফুটেছে শ্বেত রঙ্গন ফুল -লেখক

মৃত্যুঞ্জয় রায়

প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬ | ০৭:৩০

| প্রিন্ট সংস্করণ

একসময় সাদা রঙের সুরভি রঙ্গনের দেখা সহজে পাওয়া যেত না। এখন দেখছি সে ছড়িয়ে পড়েছে সারাদেশে। বিভিন্ন উদ্যান, ব্যক্তিগত বাগান, এমনকি রাস্তার ধারেও দেখা যাচ্ছে। খুলনা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও এ ফুল ফুটতে দেখছি। শুধু তাই নয়; বছরে কয়েক দফায় ও বিভিন্ন সময়ে ফুটছে। 

ধানমন্ডি ৯ নম্বর রোডে খেলার মাঠের পশ্চিম পাশে রাস্তার কোলে একটা গাছে দেখলাম জ্যৈষ্ঠ মাসে ফুল ফুটতে; আবার এ ফুলের দেখা পেলাম ভাদ্রের শেষে আবার সে গাছে দেখেছি আশ্বিনেও ফুল ফুটতে। এখন রমনা উদ্যানে যে কয়েকটি সুরভি রঙ্গনের গাছ আছে, সেগুলোতে দেখলাম থোকা ধরে ফুটেছে এ ফুল। গত বছর ভাদ্রের শেষে গিয়েছিলাম গুলশান এক নম্বরের ৩৩ নম্বর রোডে ক্লাব ৮৯ লিমিটেডে। সে গলির পাশে একটা গাছে থোকায় থোকায় খোঁপার মতো সাদা ফুলগুলো ভিজতে দেখেছিলাম বৃষ্টিতে। বলধা গার্ডেন ও জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানেও পেয়েছি শ্বেত রঙ্গনের দেখা। এমনকি সেন্ট্রাল রোড ধানমন্ডিতে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের ছাদবাগানেও গত বছর শরতে দেখেছিলাম প্রচুর সাদা সাদা ফুল ফুটতে।

শ্বেত রঙ্গন ফুলটিকে নিয়ে আমি বেশ দ্বন্দ্বে থাকি। এ ফুলকে কেউ কেউ বলেন সুরভি রঙ্গন, কেউবা বলেন সাদা রঙ্গন। এ দুটো নাম শুনে দ্বন্দ্বটা আরও বাড়ে। সারা বিশ্বে রঙ্গন তথা ইঙোরা গণের প্রায় ৫০০ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে, বাংলাদেশে আছে ১৮টি প্রজাতির, যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন প্রজাতিও। আমাদের দেশে রঙ্গনের যত প্রজাতি আছে সেগুলোর মধ্যে একটিতে ফোটে সাদা রঙের ফুল। সেটিকেও আমরা ডাকি সাদা রঙ্গন নামে। সাদা ও শ্বেত তো আলাদা কিছু না। শ্বেত শব্দের অর্থই তো সাদা। সেসব সাদা রঙের রঙ্গন ফুলে ঘ্রাণ বা সৌরভ নেই। কিন্তু রাতে ফোটা সুরভি রঙ্গনের সৌরভ আছে, তাই উদ্ভিদবিদেরা এ ফুলকে সাদা রঙ্গন (Ixora lutea) থেকে আলাদা করার জন্য সুরভি রঙ্গন (Ixora pavetta) নাম দিয়েছেন। 

সাদা রঙ্গনের সঙ্গে সুরভি রঙ্গনের আরও কিছু পার্থক্য আছে। সুরভি রঙ্গনের ফুলগুলো দুধের মতো ধবধবে সাদা। সাদা রঙ্গনের ফুলের রং জ্বাল দেওয়া দুধের মতো, গন্ধহীন। সাদা রঙ্গন ফুলের পাপড়ি সুরভি রঙ্গনের চেয়ে চওড়া, পাপড়ি সরু। কিন্তু উভয় ফুলেরই পাপড়ি চারটি। এ ছাড়া পাতা দেখেও বোঝা যায়। সুরভি রঙ্গনের পাতা রঙ্গনের চেয়ে বেশ বড়, পুরু চর্মবৎ, অগ্রভাগ চোখা। রঙ্গনের পাতাও পুরু, মসৃণ, তবে ছোট ও পাতার অগ্রভাগ সুরভি রঙ্গনের মতো চোখা নয়, ভোঁতা। অবশ্য চায়নিজ রঙ্গন (Ixora chinensis) নামে যে ছোট ছোট পাতার রঙ্গন গাছ আছে, সেগুলোর পাতার অগ্রভাগ তীক্ষ্ণ বা চোখা, সেসব গাছে সাধারণত গোলাপি বা লালচে গোলাপি ফুল ফোটে প্রচুর, ফুলগুলো খুব ছোট। 

এ দেশের জঙ্গলে ফোটে আরেক প্রজাতির রঙ্গন, তাকে আমরা বলি বিজু ফুল বা বেওফুল (Ixora cuneifolia), বসন্তে চৈত্র-বৈশাখে। রুবিয়েসি গোত্রের সুরভি রঙ্গন একটি চিরসবুজ গুল্ম বা ছোট বৃক্ষ প্রকৃতির গাছ। পাপড়ি নলাকার বা সরু সুতার মতো, লম্বা। সে পুষ্পনলের শীর্ষে ক্রুশ চিহ্নের মতো চারটি পাপড়ির ফুল ফোটে অসংখ্য, পুষ্পমঞ্জরি খোঁপার মতো গড়নের। ডালের আগায় থোকায় ফুল ফোটে। ফল মটরদানার মতো গোলাকার। বীজ থেকে ও গুটি কলম করে চারা তৈরি করা যায়। এ দেশে সুরভি রঙ্গনের গাছ বর্তমানে বেশ চোখে পড়লেও বিপন্নতার মূল্যায়নে সংকটাপন্ন বা অরক্ষিত অবস্থায় আছে। 
লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ 
 

আরও পড়ুন

×