নজরুল-উৎসব
সুরের জলসায় স্বদেশ বার্তা
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে গতকাল শুক্রবার ছায়ানট মিলনায়তনে নজরুল-উৎসবের প্রথম দিনে শিল্পীদের পরিবেশনা- সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬ | ০৯:০৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
‘বল ভাই মাভৈঃ মাভৈঃ, নবযুগ ঐ এলো ঐ’– দ্রোহ, প্রেম, সাম্য ও মানবতার কবি কাজী নজরুল ইসলামের কালজয়ী এই আহ্বান জ্যৈষ্ঠের সন্ধ্যায় এক পশলা বৃষ্টির মতো ছড়িয়ে পড়ল ছায়ানট মিলনায়তনে। তাঁর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে গতকাল শুক্রবার রাজধানীর ধানমন্ডির এই মিলনায়তনে শুরু হয়েছে দুই দিনব্যাপী ‘নজরুল-উৎসব ১৪৩৩’। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় গান, কবিতা, নৃত্য আর দ্রোহের এক অপূর্ব মেলবন্ধনে সাজানো হয় উৎসবের প্রথম দিনের এই বর্ণিল আয়োজন।
উদ্বোধনী পরিবেশনা হিসেবে শুরুতেই ছায়ানটের শিল্পীরা ‘স্নিগ্ধ শ্যাম কল্যাণ রূপে’ শিরোনামে একটি সমবেত নৃত্যগীত পরিবেশন করেন। শিল্পীদের সুনিপুণ কায়িক মুদ্রা আর সুরের সুধায় উৎসবের পর্দা ওঠে এক নান্দনিক আবহে। উদ্বোধনী এই নান্দনিকতার পরপরই মঞ্চে আসেন ছায়ানটের সহসভাপতি ও নজরুল সংগীতশিল্পী খায়রুল আনাম শাকিল। স্বাগত কথনে তিনি জাতীয় কবির সৃষ্টিশীল জীবন, অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং বাঙালি সংস্কৃতিতে তাঁর কালজয়ী অবদানের কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।
বক্তব্যে খায়রুল আনাম উল্লেখ করেন, বাংলা সংগীতে রবীন্দ্রনাথ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে হেঁটে শাস্ত্রীয় সংগীতের খেয়াল, ঠুমরি, গজলসহ নানা ধারার সুর একত্রে সন্নিবেশ ঘটিয়েছেন কাজী নজরুল।
উৎসবের মূল আয়োজনে কবির ১৯২৪ সাল থেকে শুরু হওয়া রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক পরিক্রমা, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন এবং মানুষের অধিকার আদায়ের কণ্ঠস্বরকে দেশাত্মবোধক গান, কবিতা ও পাঠের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়। এই অংশে নেপথ্য কণ্ঠে বিশিষ্ট আবৃত্তিশিল্পী ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় কবির ‘বাংলাদেশের জাতীয় কবি ... সুবর্ণ সমাবেশে’র বাণী পাঠ করে শোনান।
কবির ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ও সাম্যের বাণী নিয়ে একের পর এক চমৎকার পাঠ ও আবৃত্তিতে দর্শকদের মুগ্ধ করেন বাচিকশিল্পী ডালিয়া আহমেদ এবং আশরাফুল হাসান বাবু। বিশেষ করে, ‘Arise ye prisoners ... মানবজাতি সমুদ্ধত’ শীর্ষক পাঠে খায়রুল আনাম শাকিল ও ডালিয়া আহমেদের পরিবেশনা মিলনায়তনে এক গভীর আবেশ সৃষ্টি করে।
দেশাত্মবোধের এই আবহে ছায়ানটের শিল্পীরা দলগতভাবে পরিবেশন করেন সম্মেলক নৃত্যগীত ‘বল ভাই মাভৈঃ মাভৈঃ’ এবং ‘জাগো অনশন-বন্দী, ওঠ রে যত’। এরপর সমবেত কণ্ঠে আরও পরিবেশিত হয় ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’র মতো জাগরণী গান। একক সংগীতে শ্রোতাদের মুগ্ধ করেন শ্রাবন্তী ধর, প্রমিতা দে, মিরাজুল জান্নাত সোনিয়া ও প্রিয়ন্তু দেব।
সংগীতশিল্পী ফেরদৌস আরার একক পরিবেশনায় শোনা যায় ‘কে বিদেশি বন-উদাসী’, ছন্দা চক্রবর্তীর ‘ভীরু এ মনের কলি’, ঐশ্বর্য সমাদ্দারের কণ্ঠে ‘শ্যামা-তন্বী আমি মেঘ-বরণা’, হবিগঞ্জের শিল্পী নন্দিতা দাশ দিশার কণ্ঠে ‘হে নামাজী আমার ঘরে নামাজ পড়’, শরিফুর রহমানের ‘সেদিন ছিল কি গোধূলি’, শর্মিষ্ঠা দাশের ‘ঐ ঘর ভোলানো সুরে’ এবং ইয়াকুব আলী খানের ‘রহি রহি কেন সে-মুখ পড়ে মনে’ গানগুলো দর্শকদের স্মৃতিকাতর করে তোলে। আনজুমান আরা পর্ণা জাতীয় কবির ‘ফাল্গুনী’ কবিতা আবৃত্তি করেন।
প্রথম দিনে সরকারি সংগীত মহাবিদ্যালয়ের অংশগ্রহণ। এর পর মঞ্চে একে একে একক গান ও কবিতা আবৃত্তি নিয়ে হাজির হন অন্য শিল্পীরা। একক গান গেয়ে শোনান রুদ্র দাস (বরিশাল), ছন্দা চক্রবর্তী, সুমন মজুমদার, নাসিমা শাহীন ফ্যান্সী, ইয়াসমীন মুশতারী এবং প্রিয়াঙ্কা গোপ। দেওয়ান সাইদুল হাসান ‘তোমারে পড়িছে মনে’ কবিতা আবৃত্তি করে শোনান।
- বিষয় :
- নজরুল উৎসব
