গোলটেবিল বৈঠক
শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাতীয় টাস্কফোর্সের দাবি
অনলাইনে শিশু নির্যাতনের ঝুঁকিও বাড়ছে
গোলটেবিল বৈঠকে বক্তব্য দেন সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন -সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬ | ০৮:৩২ | আপডেট: ০৭ জুন ২০২৬ | ১১:৩১
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশে শিশু নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। আইন প্রয়োগ ও বিচারিক ব্যবস্থার পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্রের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এ সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাতীয় পর্যায়ে একটি সমন্বিত শিশু নিরাপত্তা টাস্কফোর্স গঠনের দাবি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ ও অধিকারকর্মীরা।
গতকাল শনিবার শহীদ আবু সাঈদ কনভেনশন সেন্টারে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান শিশু নির্যাতন মোকাবিলা: প্রতিবন্ধকতা, দায়িত্ব ও করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন।
বিএনপির উদ্যোগে পরিচালিত ‘নিপীড়িত নারী ও শিশুদের আইনি ও স্বাস্থ্য সহায়তা সেল’ এ বৈঠকের আয়োজন করে। বক্তারা বলেন, শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সচেতনতা বৃদ্ধি, সামাজিক দায়বদ্ধতা জোরদার এবং সব অংশীজনের সমন্বিত পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।
বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, শিশু নির্যাতন একটি গুরুতর সামাজিক ব্যাধি; কেবল আইন প্রয়োগের মাধ্যমে এ সমস্যা নির্মূল করা সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন, গণমাধ্যম ও রাষ্ট্রের সব অংশীজনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
ডেপুটি স্পিকার বলেন, শিশু নির্যাতনের মূল কারণগুলো চিহ্নিত করে বিদ্যমান আইন, নীতি ও সুরক্ষা ব্যবস্থার ঘাটতি মূল্যায়ন জরুরি। শিশুদের জন্য নিরাপদ, মানবিক ও সহিংসতামুক্ত সমাজ গঠনে কার্যকর ও টেকসই কৌশল প্রণয়নের ওপরেও তিনি গুরুত্ব আরোপ করেন। তাঁর ভাষায়, শিশুদের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক বিকাশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব।
ডেপুটি স্পিকার আরও বলেন, বর্তমান সময়ে শিশুদের প্রতি শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের পাশাপাশি অনলাইনভিত্তিক নির্যাতনের ঝুঁকিও উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার, প্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং শিশু অধিকার বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুদের আইনি, চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো গুরুত্বপূর্ণ মানবিক দায়িত্ব পালন করছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার প্রাপ্তি এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সম্প্রতি পল্লবীতে ৮ বছরের মেয়ে শিশুকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার আলোচিত ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে কায়সার কামাল বলেন, দ্রুততম সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ আদালতের মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে। কথার চেয়ে কাজে বিশ্বাসী হতে হবে।
‘আমার খণ্ড-বিখণ্ড সন্তানের দায় কে নেবে?’
পল্লবীতে ধর্ষণের পর নৃশংস হত্যার শিকার সেই শিশুটির বাবা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমি একজন ধর্ষিতার বাবা, একজন খণ্ডিত লাশের বাবা। কিন্তু আমি তো এভাবে পরিচিত হতে চাইনি। আমি গর্বিত পিতা হয়ে থাকতে চেয়েছিলাম।’ তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘এই দায় কে নেবে? এটা কি আমার অবহেলা, সমাজের অবহেলা, নাকি রাষ্ট্রের অবহেলা? আমার খণ্ড-বিখণ্ড সন্তানের দায় কে নেবে?’
হাতজোড় করে উপস্থিত সবার কাছে আবেদন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাকে সেই নাম ফিরিয়ে দেন, সেই সম্মান ফিরিয়ে দেন। যদি তা না পারেন, অন্তত এমন একটি সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলুন, যেখানে আর কোনো বাবা-মায়ের বুক খালি হবে না, কেউ জিন্দা লাশ হয়ে বেঁচে থাকবে না।’
সমন্বিত উদ্যোগের ওপর জোর
গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নেন সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নিপুণ রায় চৌধুরী, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক কাজী গোলাম মোখলেছুর রহমান প্রমুখ।
বক্তারা শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে কার্যকর আইন প্রয়োগ, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, ভুক্তভোগীবান্ধব সেবা সম্প্রসারণ এবং শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
- বিষয় :
- গোলটেবিল আলোচনা
- শিশু নির্যাতন
