ঢাকা সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬

ধর্ষণের অভিযোগ তোলা নারীর বাড়ি ফিরতে ভয়

ধর্ষণের অভিযোগ তোলা নারীর বাড়ি ফিরতে ভয়
×

প্রতীকী ছবি

সোনারগাঁ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬ | ১৩:৪৩

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলায় সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার গৃহবধূ আতঙ্কে নিজ বাড়িতে ফিরতে পারছেন না। বর্তমানে তিনি স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল (ভিক্টোরিয়া) হাসপাতালে অবস্থান করছেন। তবে পুলিশ জানিয়েছে, ভুক্তভোগী পরিবার চাইলে তাদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। 

ধর্ষণের ঘটনায় স্থানীয় এক যুবদল নেতাসহ দুইজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পলাতক রয়েছেন আরও একজন অভিযুক্ত। অভিযুক্তদের দ্রুত বিচার ও ভুক্তভোগী পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন, জামপুর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সাধারণ সম্পাদক শহীদ মিয়া এবং তাঁর সহযোগী একই এলাকার শাহিন মিয়া। পলাতক রয়েছেন শুভ মিয়া।

পুলিশ ও ভুক্তভোগী পরিবারের সূত্রে জানা যায়, উপজেলার একটি গ্রামে ভাড়া বাসায় দুই সন্তান ও স্বামীকে নিয়ে বসবাস করেন ওই নারী। বড় মেয়ের বয়স ৭ বছর, ছোট মেয়ের বয়স ৫ বছর। গত বুধবার বিকেলে রাজমিস্ত্রি স্বামী কর্মস্থলে থাকাকালে অভিযুক্তরা বাড়িতে প্রবেশ করে। দুই শিশু সন্তানকে অপহরণ করে গৃহবধূকে পাশের বাড়ির একটি কক্ষে নিয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করে তারা।

ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর স্থানীয় প্রভাবশালী কয়েকজন ব্যক্তি বিষয়টি সালিশের মাধ্যমে মীমাংসার চেষ্টা করেন। পরে শুক্রবার বিকেলে ভুক্তভোগী নারী সোনারগাঁ থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করেন। মামলার পরপরই পুলিশ অভিযান চালিয়ে দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করে। তবে থানায় মামলা দিতে গেলে বিএনপির এক প্রভাবশালী নেতা মামলা দিতে বাধা প্রদান করে। সেখানেও ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে বলে দাবি করেন ওই নারীর স্বামী। তবে তিনি নিরাপত্তার কারণে তাঁর নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি।

এদিকে গত শনিবার ভুক্তভোগীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষ হলেও নিরাপত্তাহীনতার কারণে তিনি বাড়ি ফিরতে সাহস পাচ্ছেন না। তাঁর স্বামীর দাবি, মামলা করার পর এলাকায় ফিরে গেলে নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হবেন। এ ছাড়া তাঁর  পরিবারের সদস্যদের কাছেও বিষয়টি এখনও জানানো হয়নি। ফলে কোথায় আশ্রয় নেবেন তা নিয়েও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। পুলিশ স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর তাদের হাসপাতালে রেখেই চলে যায়। 

ভুক্তভোগী নারীর স্বামী জানান, দুই কন্যা সন্তান নিয়ে তিনি পথেঘাটে অবস্থান করছেন। অভিযুক্তদের পরিবার ওই এলাকায় প্রভাবশালী। তারা সরকার দলীয় রাজনীতি করেন। ফলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তার করিয়ে আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। তিনি বলেন, পেটের ক্ষুধা আর স্ত্রীর অবস্থা দেখে তাঁর মাঝেমধ্যে মনে হয় দুই মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে বাসের নিচে ঝাঁপ দেই। আমার কাজ নেই। স্ত্রী সন্তান রেখে ভয়ে কাজে যেতে পারছি না।

গতকাল রাত সাড়ে ১১টার সময় মোবাইল ফোনে এ প্রতিবেদককে ভুক্তভোগীর স্বামী জানান, তাঁর স্ত্রীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ হয়েছে। কিন্তু বাড়ি ফিরতে তাঁর ভয় হয়। চিকিৎসক জহিরুল ইসলাম ও গোলাম মোস্তফা অসহায়ত্বের বিষয়টি জানতে পেরে একটি বেড দিয়ে তাঁর স্ত্রীকে চিকিৎসাধীন রেখেছেন। পরিবারের সদস্য সংখ্যা বেশি হওয়ায় হাসপাতালের ভেতরে জায়গা হয় না। ফলে তিনি দুই শিশুসন্তান নিয়ে হাসপাতালের বাইরে একটি একচালা ছাউনিতে রাত কাটান। এখনও তিনি সেখানেই অবস্থান করছেন।

নারায়ণগঞ্জ ভিক্টোরিয়া জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) মো. জহিরুল ইসলাম জানান, ভুক্তভোগী নারীর সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ হয়েছে। আজ সোমবার রিপোর্ট হাতে এলে বিস্তারিত বলা যাবে।

এ বিষয়ে সোনারগাঁ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন বলেন, মামলা দায়েরের পর দ্রুত দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পলাতক অন্য আসামিকেও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। ভুক্তভোগী পরিবার চাইলে তারা নিজ বাড়িতে নিরাপদে বসবাস করতে পারবেন। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় পুলিশ ফাঁড়িকেও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ভুক্তভোগী পরিবার যদি কোনো ধরনের হুমকি বা নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ জানায়, তাহলে পুলিশ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। পাশাপাশি পুলিশের কোনো সদস্যের আচরণে তারা বিব্রত হয়ে থাকলে সেটিও তদন্ত করে দেখা হবে।

সোনারগাঁ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, দলের নাম ভাঙিয়ে অপকর্ম করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। মাদক, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি ও জমি দখলসহ ৫টি বিষয়ে কাউকে ছাড়া হবে না। থানা পুলিশের কাছে এ বিষয়গুলো নিয়ে কেউ তদবির করলে তাঁকেও গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশকে বলা হয়েছে। যেহেতু ঘটনাটি এক যুবদল নেতা ঘটিয়েছেন। ইতোমধ্যে তাঁর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য যুবদলকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সোনারগাঁ উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আশরাফ ভূঁইয়া বলেন, ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার যুবদল নেতার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আশা করি আজকের মধ্যে বহিষ্কারের  চিঠি পাওয়া যাবে। অপকর্মে জড়িতদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না। ভুক্তভোগী পরিবারকে বাড়ি ফেরার বিষয়ে কেউ হুমকি দিলে যুবদলের পক্ষ থেকে প্রতিহত করবে। ভিকটিমকে সহযোগিতা করা হবে।

দলীয় শৃঙ্খলা পরিপন্থী কাজে লিপ্ত থাকার স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়ায় অভিযুক্ত শহীদুল ইসলাম শহীদকে রোববার রাতে বহিষ্কার করা হয়। জামপুর ইউনিয়ন যুবদলের সদস্য সচিব আবু মুছা ভূইয়া স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে তাকে বহিষ্কারের কথা জানানো হয়।

আরও পড়ুন

×